২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে।

সবুজ শক্তির নতুন দিগন্ত, ছাদজুড়ে সৌরবিদ্যুৎ, কিশোরগঞ্জের আকাশে সম্ভাবনার আলো।

সবুজ শক্তির নতুন দিগন্ত, ছাদজুড়ে সৌরবিদ্যুৎ, কিশোরগঞ্জের আকাশে সম্ভাবনার আলো।
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ছাদে ৩৬০ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে, জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন।
প্রিন্ট

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত আর বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের এই ক্রান্তিকালে টেকসই ভবিষ্যতের একমাত্র ভরসা নবায়নযোগ্য জ্বালানি। জীবাশ্ম জ্বালানির সীমাবদ্ধতা এবং পরিবেশগত ঝুঁকির বিপরীতে সূর্যরশ্মিকে শক্তিতে রূপান্তরিত করার কৌশল এখন কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ নেই, তা বাস্তবতার রূপ নিতে শুরু করেছে বাংলাদেশে। "প্রতি ইঞ্চি ছাদ কাজে লাগাই, সৌরবিদ্যুতে আয় বাড়াই"—এই দূরদর্শী ও সময়োপযোগী প্রতিপাদ্য নিয়ে গত ৩ নভেম্বর ২০২৬, মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাঁকজমকপূর্ণভাবে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ সোলার এক্সপো ২০২৬’। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী  তারেক রহমান এই এক্সপোর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।​উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পরিবেশবান্ধব আধুনিক প্রযুক্তি, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং এ খাতে স্থানীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর বিশেষ আলোকপাত করা হয়। জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা, জনগণের ভোগান্তি লাঘব এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার যে সুদূরপ্রসারী কৌশল গ্রহণ করেছে, এই এক্সপো তার অনন্য প্রতিফলন। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের যে জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে, তা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি সবুজ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের অঙ্গীকার।​জাতীয় এই রূপকল্প ও নীতির সাথে সুর মিলিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থাপনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসন। সরকারের জ্বালানি সাশ্রয় ও সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের নীতির বাস্তব প্রয়োগ ঘটিয়ে ‘জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, কিশোরগঞ্জ’-এর ছাদে স্থাপন করা হয়েছে ৩৬০ কিলোওয়াট (kW) ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিশালাকার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা। সরকারি ভবনের পতিত ছাদকে দক্ষভাবে কাজে লাগিয়ে গড়ে তোলা এই অন-গ্রিড সোলার সিস্টেম এখন স্থানীয় পরিমণ্ডলে এক বিপ্লবের নাম।কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন জানান, ​কিশোরগঞ্জের এই উদ্যোগ কেবল কারিগরি সাফল্যের নিদর্শন নয়, বরং সরকারি প্রশাসনিক পরিচালন ব্যয়ে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন এনেছে। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালুর পর থেকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মাসিক বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (৩৩ শতাংশ) হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে প্রতি মাসে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের একটি বিশাল অংকের অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে, যা অপরাপর উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে এত দ্রুত ও কার্যকরভাবে সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু করা কেবল প্রশংসনীয়ই নয়, বরং সারা দেশের অন্যান্য সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের জন্যও একটি অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত (Model Case)।তিনি আরো জানান,  ​একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ববাজারে জীবাশ্ম জ্বালানি অর্থাৎ কয়লা, খনিজ তেল ও গ্যাসের দামের চরম অস্থিরতা আমাদের শিক্ষা দিয়েছে—একক কোনো অনবায়নযোগ্য উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এই পরিস্থিতিতে সূর্যের অসীম শক্তিকে কাজে লাগানোই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত সমাধান। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, কিশোরগঞ্জের ছাদে স্থাপিত ৩৬০ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌর প্যানেলগুলো প্রতিদিন যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, তা কেবল ওই ভবনের দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদাই মেটাচ্ছে না, বরং সামগ্রিক জাতীয় গ্রিডের ওপর থেকে চাপের বোঝা অনেকটাই কমিয়ে দিচ্ছে।​অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি এই উদ্যোগের পরিবেশগত গুরুত্ব অপরিসীম। প্রথাগত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবহৃত কয়লা বা জ্বালানি তেল পোড়ানোর ফলে বাতাসের সাথে মিশে যায় ক্ষতিকারক কার্বন ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড এবং নানা ধরণের গ্রিনহাউস গ্যাস। কিশোরগঞ্জের ৩৬০ কিলোওয়াটের এই নবায়নযোগ্য শক্তি প্রকল্প প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ প্রতিরোধ করছে, যা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখছে। পরিষ্কার ও বিশুদ্ধ বাতাসে কিশোরগঞ্জের আকাশকে মুক্ত রাখতে এই সোলার প্যানেলগুলো নীরবে কাজ করে যাচ্ছে।​বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি এবং জলবায়ুগত অবস্থান সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। বছরের অধিকাংশ সময় এ দেশে পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যায়। বিশেষ করে সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বাণিজ্যিক ভবনের সুবিশাল ছাদগুলো এ ধরণের সবুজ শক্তি উৎপাদনের প্রাকৃতিক ক্ষেত্র হতে পারে। এক্সপো ২০২৬’-এ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, সরকার প্রতিটি ‘বাংলাদেশঅব্যবহৃসোলারত ছাদকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিদ্যুৎ কেন্দ্রে রূপান্তরিত করতে চায়। কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসনের কার্যালয় দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে সদিচ্ছা এবং সঠিক পরিকল্পনার সমন্বয়ে একটি সরকারি ভবন নিজের প্রয়োজনীয় শক্তি নিজেই উৎপাদন করতে পারে।​সৌরবিদ্যুতের এই মহতী যাত্রা কেবল বিদ্যুৎ বিল কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা, আত্মনির্ভরশীলতা এবং পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যৎ গড়ার এক মহাকাব্য। কিশোরগঞ্জের এই সফল উদ্ভাবনী পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে স্থানীয় পর্যায় থেকেই জাতীয় লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।​আজ কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ছাদে জ্বলজ্বল করা সোলার প্যানেলগুলো কেবল সূর্যের আলো শোষণ করছে না, বরং তা ছড়াচ্ছে স্বাবলম্বিতার দ্যুতি। আগামীর রূপকল্প ২০৩০ ও ২০৪০ অর্জনের পথে এই পথপ্রদর্শক উদ্যোগ নিশ্চিতভাবেই দেশের আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠা প্রতিটি প্রশাসনিক কেন্দ্র ও নাগরিক সমাজকে উৎসাহিত করবে। প্রতিটি ছাদ যদি হয়ে ওঠে এক একটি সবুজ শক্তির কেন্দ্রবিন্দু, তবেই গড়ে উঠবে কার্বনমুক্ত, অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ এবং টেকসই এক নতুন বাংলাদেশ।
শেয়ার করুন-