প্রকৃতির নিয়মেই হেমন্তের সোনালী রোদের পর কুয়াশাচ্ছন্ন চাদর গায়ে জড়াতে প্রস্তুত বাংলার জনপদ। কিন্তু এই অপরূপ ঋতু পরিবর্তনের ঠিক প্রাক্কালেই কিশোরগঞ্জ জেলার আকাশ-বাতাস এক অদৃশ্য ও বিষাক্ত ধূসর জালে বন্দি হয়ে পড়ছে। নদীমাতৃক ভাটি অঞ্চলের এই জনপদের বুকে—যেখানে নরসুন্দা নদী বয়ে গেছে ক্লান্তিহীন ছন্দে, কিংবা হাওরের বুক চিরে উঁকি দেয় মিঠামইন বা ইটনা—সেখানের নির্মল বাতাসে এখন যেন বার্ধক্যের ছাপ। শীত আসার বহু আগেই কেন কিশোরগঞ্জের বায়ুদূষণ আশঙ্কাজনক হারে ঊর্ধ্বমুখী? এটি কেবল কোনো আকস্মিক meteorological বা আবহাওয়াগত অস্বাভাবিকতা নয়, বরং মানবসৃষ্ট অপকর্ম ও ভৌগোলিক বাস্তবতার এক দীর্ঘশ্বাস ফেলার মতো করুণ রসায়ন।
কিশোরগঞ্জের বায়ুমণ্ডলে এই দূষণের মাত্রা বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে এক গভীর ঋতুকালীন ও প্রাকৃতিক ষড়যন্ত্র। শরতের শেষাংশে যখন বায়ুপ্রবাহ বা উইন্ড স্পিড অস্বাভাবিকভাবে কমে যায় এবং বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কমতে থাকে, তখন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা যাকে বলেন 'থার্মাল ইনভার্শন' বা তাপীয় বিপরীতায়ন, তা সক্রিয় হয়ে ওঠে। শীতের আগমনে ভূপৃষ্ঠের কাছের ঠান্ডা বাতাস একটি ভারী কম্বলের মতো চেপে বসে। ফলে কলকারখানা, যানবাহন ও ধূলিকণার বিষাক্ত কণাগুলো মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়তে না পেরে এই সমতল ভূমির মাত্র কয়েক মিটার উচ্চতার মধ্যেই চক্রাকারে ঘুরপাক খেতে থাকে। কিশোরগঞ্জের শহরাঞ্চল—বিশেষ করে বড় বাজার, পুরান থানা, ঐতিহাসিক শোলাকিয়া মাঠের আশপাশ কিংবা ভৈরব ও কুলিয়ারচরের মতো ব্যস্ত জনপদে এই অদৃশ্য ধোঁয়ার স্তর সাধারণ মানুষের ফুসফুসে হাণ্ট করছে প্রতিদিন।
এই প্রাকৃতিক স্থবিরতার সুযোগ নিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একশ্রেণির পরিবেশবিরোধী চক্র। শীত মৌসুমের পদধ্বনির সাথে সাথেই কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা—যেমন হোসেনপুর, পাকুন্দিয়া, তাড়াইল বা কটিয়াদীর গ্রামীণ জনপদে অবৈধ ইটভাটাগুলোর চিমনি থেকে কালো ধোঁয়া উদ্গীরণ শুরু হয়ে যায়। আইনের তোয়াক্কা না করে এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বহু ইটভাটায় কাঠ ও নিম্নমানের কয়লা পোড়ানো হচ্ছে। ভাটাগুলোর কাঁচা ইট প্রস্তুতের জন্য ফসলি জমির উর্বর 'টপ সয়েল' বা উপরিভাগের মাটি কাটার মহোৎসব চলে, যা পরবর্তীতে শুষ্ক বাতাসে মিহি ধূলিকণা বা পার্টিকুলেট ম্যাটার (PM2.5 ও PM10) হিসেবে বাতাসে ভেসে বেড়ায়। শীতের আমেজ উপভোগ করার বদলে কিশোরগঞ্জের সাধারণ মানুষ বাধ্য হচ্ছেন এই বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড আর সালফার ডাই অক্সাইডের দীর্ঘশ্বাস গ্রহণ করতে।
পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ ও যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত ধোঁয়া। জেলাজুড়ে বিভিন্ন সড়ক সংস্কার, নতুন দালানকোঠা নির্মাণ এবং খোঁড়াখুঁড়ির কাজ শীতের শুষ্ক আবহাওয়ায় বাতাসে ভাসমান ধুলোর পরিমাণ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এর সঙ্গে পুরনো ফিটনেসবিহীন ট্রাক, মাহিন্দ্রা ও থ্রি-হুইলার থেকে নির্গত গ্যাসে ভারী হচ্ছে চারপাশ। গ্রামাঞ্চলেও ফসল কাটার পরবর্তী সময়ে খড় বা অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর প্রবণতা এই দূষণের মাত্রাকে চরম সীমায় পৌঁছে দিচ্ছে। নরসুন্দা নদীর দুপারের বর্ধিত জনবসতি এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ যেন প্রকৃতির বুক থেকে কেড়ে নিচ্ছে তার চিরচেনা নিঃশ্বাসের স্বস্তি।
এই বায়ুদূষণের নির্মম শিকার হচ্ছে কিশোরগঞ্জের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, শিশু ও প্রবীণরা। হাসপাতালের বহির্বিভাগে এখন প্রতিনিয়ত ভিড় করছে শ্বাসকষ্ট, ব্রংকাইটিস, অ্যাজমা এবং চোখের প্রদাহে আক্রান্ত রোগীরা। চিকিৎসকদের মতে, শীতের এই প্রাথমিক বায়ুদূষণ মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগের বীজ বপন করছে। কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী সবুজ প্রকৃতি আজ এক ক্লান্ত পথিকের মতো খাঁচার বন্দিদশায় দিন কাটাচ্ছে। যদি সময়মতো এই অবৈধ ইটভাটার কালো থাবা রোধ করা না যায়, ধুলোবালু নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত পানি ছিটানো ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিশ্চিত করা না যায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে শীতের কুয়াশা নয়, কিশোরগঞ্জবাসীকে বরণ করতে হবে কেবল এক বিষাক্ত ধোঁয়ার কৃত্রিম নরক। এখনই সময় এই নীরব কান্না থামানোর, প্রকৃতি ও মানুষের প্রাণ বাঁচানোর।








