ফিচার

সংকটে বেতশিল্প, বাপ-দাদার পেশা আঁকড়ে টিকে শচীন্দ্র পরিবার

⎙ প্রিন্ট
সংকটে বেতশিল্প, বাপ-দাদার পেশা আঁকড়ে টিকে শচীন্দ্র পরিবার
গভীর মনোযোগ দিয়ে কাজ করছেন বেতশিল্পী শচীন্দ্র ও তার পরিবার
# ঐতিহ্যবাহি বেতশিল্প

একসময় গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই বেতের তৈরি মোড়া, ঝুড়ি, ডালা, কুলা, চেয়ারসহ নানা ধরনের নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য পণ্য অহরহ চোখে পড়তো। আধুনিকতার ছোঁয়া আর সময়ের বাহারি হাওয়ায় বদলে গেছে মানুষের জীবনযাত্রা। বর্তমানে বেতের বিকল্প পণ্য হিসেবে বাজার দখল করে আছে প্লাস্টিক, স্টিল, কাঠ আর নানা কৃত্রিম উপকরণের তৈরি সস্তা ও সহজলভ্য পণ্য। কিছুকাল আগেও গ্রামবাংলার মানুষের কাছে বেতের তৈরি জিনিসপত্রের ব্যাপক চাহিদা ছিল। বেতশিল্পীদের জীবনমানও ছিল বেশ সচ্ছল। কিন্তু বর্তমানে বাজারে বিকল্প পণ্যের সহজলভ্যতায় ঐতিহ্যবাহি এই শিল্পটি আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে।

বেতশিল্পের চলমান এই সংকটের বাস্তব চিত্র দেখা যায় নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলার সোনারগাঁও পৌরসভার ঋষিপাড়ার বাসিন্দা বেতশিল্পী শচীন্দ্র দাস ও তার পরিবারের জীবনে। বংশপরম্পরায় পাওয়া এই পেশাকে আঁকড়ে ধরে এখনও বেতের বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করে চলেছেন তিনি ও তার পরিবার। কিন্তু আগের মতো নেই কাজের ব্যস্ততা, নেই পর্যাপ্ত আয়ও। কাঁচামালের সংকট, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বিকল্প পণ্যের দাপটে দিন যতো যাচ্ছে জীবন-জীবিকা ততো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

শচীন্দ্র জানান, বেতশিল্পীদের প্রধান সমস্যাগুলোর একটি হলো কাঁচামালের পর্যাপ্ত যোগান না থাকা। এছাড়া বেত সংগ্রহ করতে আগের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। কাঁচামালের দাম বাড়লেও তৈরি পণ্যের দাম সে তুলনায় বাড়ানো যাচ্ছে না। ফলে শ্রম ও সময়ের তুলনায় লাভ থাকে খুবই কম। সাংসারিক খরচ যোগাতে অনেক সময় উৎপাদন খরচেও বিক্রি করে দিতে হয়। তিনি আক্ষেপ করে বলেন- সোনারগাঁও জাদুঘরে প্রতি বছর মেলা উপলক্ষ্যে দূরদূরান্ত থেকে আগত হস্তশিল্পীদের সম্মাননাসহ প্রনোদনা দিলেও জাদুঘর থেকে মাত্র তিনশ মিটারের দূরত্বে বসবাস করা আমাদের মতো হস্তশিল্পীদের খোঁজ রাখেনি জাদুঘর কর্তৃপক্ষ।

বেতশিল্পী শচীন্দ্রের ছোট ভাই যতীন্দ্র জানান, বেতের একটি পণ্য তৈরিতে একজন কারিগরের ঘণ্টার পর ঘণ্টা শ্রম দিতে হয়। বেত কাটা, পরিষ্কার করা, প্রয়োজন অনুযায়ী আকার দেওয়া এবং নিখুঁতভাবে বুননের পর তৈরি হয় একটি পণ্য। অথচ বাজারে একই ধরনের দেখতে অনেক পণ্য মেশিনে তৈরি হয়ে কম দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে হাতে তৈরি বেতপণ্যের সঙ্গে এসব পণ্যের দামের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা আমাদের মতো বেতশিল্পীদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

শচীন্দ্র পরিবারের জন্য বিষয়টি শুধু একটি পেশার সংকট নয়; এটি একটি পারিবারিক ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও। বাপ-দাদার কাছ থেকে শেখা এই কাজকে তারা এখনও ভালোবাসেন। কিন্তু আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে নতুন প্রজন্মকে এই পেশায় ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। উন্নত জীবনমানের নিশ্চয়তা না থাকায় অনেকেই বিকল্প পেশার দিকে ঝুঁকছেন।

তবে সম্ভাবনার জায়গাটিও একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। সামর্থের ঘাটতি থাকলেও পরিবেশবান্ধব ও প্রাকৃতিক উপকরণের তৈরি পণ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ কিছুটা বেড়েছে। ঘর সাজানো, রেস্টুরেন্ট, রিসোর্ট, ফ্যাশন ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনে বেতের তৈরি সামগ্রীর ব্যবহার বাড়ানো গেলে এ শিল্প নতুন বাজার পেতে পারে। আধুনিক নকশা ও রুচিশীল ডিজাইনের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী বেতশিল্পের সমন্বয় ঘটাতে পারলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারেও এর বিশাল চাহিদা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বেতশিল্পীদের মতে, কাঁচামাল সহজলভ্য করা, স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা, আধুনিক নকশা ও প্রশিক্ষণ প্রদান, কারিগরদের সরাসরি বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা এবং সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বেতপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে এ শিল্পকে আবারও লাভজনক করে তোলা সম্ভব।

সোনারগাঁয়ের শচীন্দ্র পরিবারের গল্প শুধুমাত্র একজন বেতশিল্পীর জীবনসংগ্রামের গল্প নয়; এটি হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ কারুশিল্পের একটি নির্মম প্রতিচ্ছবি। একদিকে আধুনিক বাজারের তীব্র প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে বংশপরম্পরায় পাওয়া পেশার প্রতি টান—এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন শচীন্দ্র ও তার পরিবার।

সব কথার শেষ কথা হলো- প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও বাজার সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে হয়তো বেতশিল্পকে শুধু স্মৃতির পাতায় নয়, নতুন প্রজন্মের জীবিকার একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবেও ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। অন্যথায় প্লাস্টিক ও কৃত্রিম পণ্যের ভিড়ে একদিন হারিয়ে যেতে পারে গ্রামবাংলার এই ঐতিহ্যবাহী বেতশিল্প। সেই সাথে হারিয়ে যেতে পারে শচীন্দ্র’র মতো অসংখ্য বেতশিল্পীর বাপ-দাদার পেশা।

সম্পর্কিত সংবাদ