ফিচার

বন্যা ও মূল্যবৃদ্ধির দ্বিমুখী মার, আগাছার কচুরিপানাতেই বাঁচছে কিশোরগঞ্জের লাখ লাখ গবাদিপশু।

হাজারো প্রান্তিক কৃষকের কাছে গবাদিপশু বাঁচিয়ে রাখার অন্যতম আশ্রয় কচুরিপানা।

প্রিন্ট
বন্যা ও মূল্যবৃদ্ধির দ্বিমুখী মার, আগাছার কচুরিপানাতেই বাঁচছে কিশোরগঞ্জের লাখ লাখ গবাদিপশু।
গোখাদ্যের উর্ধ্বমুখীর কারনে কিশোরগঞ্জে কচুরিপানার উপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে কৃষকদের।
⌖ কিশোরগঞ্জ সদর
হাতে ধারালো দা, চোখেমুখে বেঁচে থাকার তীব্র আকুতি। ভোর না হতেই কোমড় পানিতে ডুবিয়ে রৌহা বিলে নেমে পড়েছেন বটকিলা গ্রামের বাচু মিয়া। লক্ষ্য কোনো মাছ শিকার নয়; বিলে জমে থাকা কচুরিপানা কুড়ানো। যে কচুরিপানা এতদিন জলাশয়ে নিছক আগাছা হিসেবে ভেসেছে, পচে নষ্ট হয়েছে, তা-ই এখন বাচু মিয়ার মতো হাজারো প্রান্তিক কৃষকের কাছে গবাদিপশু বাঁচিয়ে রাখার অন্যতম প্রধান আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে।  ​উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর আকস্মিক বন্যায় ফসল ডুবে একাকার হয়ে যাওয়া কিশোরগঞ্জ জেলায় এখন চারদিকে হাহাকার। গো-খাদ্যের চরম সংকট আর বাজারে দানাদার খাবারের আকাশছোঁয়া দামে নাভিশ্বাস উঠেছে হাওড়বেষ্টিত এই জনপদের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিদের। নিজেদের ঘাম ঝরিয়ে গড়ে তোলা ছোট খামার আর পরম স্নেহে লালন-পালন করা গবাদিপশুগুলোকে অনাহার থেকে বাঁচাতে বাধ্য হয়ে কৃষক ও খামারিরা বেছে নিয়েছেন এই বিকল্প পথ। প্রতিদিন ভোরে কাস্তে ও দা হাতে জলাশয়ে নেমে পড়ছেন তারা। কেউ ভ্যানে, কেউ রিকশায়, আবার কেউ নিজের মাথায় করে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন জলাশয়ের কচুরিপানা ও কলাগাছ।  ​চলতি বছরের এপ্রিলে টানা অতিবৃষ্টি এবং উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের ফলে তীব্র জলবদ্ধতা ও বন্যায় তছনছ হয়ে যায় কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ কৃষিক্ষেত্র। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে জানান, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কিশোরগঞ্জে প্রায় ১১ হাজার ৯ ৩৩ হেক্টর জমির ফসল পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে সরাসরি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন জেলার ৫২ হাজার ৯৮০ জন কৃষক। সার্বিকভাবে ফসল উৎপাদনে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৩ হাজার ৫৮০ মেট্রিক টন, যার আর্থিক মূল্য আনুমানিক ২৭২ কোটি ২৪ লাখ টাকা। ​কৃষি বিভাগের এই কর্মকর্তা আরো জানান, আকস্মিক এই বন্যায় ধানের ফসলের পাশাপাশি পানির নিচে তলিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে মাঠের পর মাঠ রাখা ধানের খড়। ফলে জেলাজুড়ে দেখা দিয়েছে গো-খাদ্যের সাময়িক অথচ তীব্র সংকট। এই পরিস্থিতিতে গবাদিপশুর খাদ্যের বাজারে অভাবনীয় চাপ তৈরি হয়েছে।  ​সংকটের সুযোগে স্থানীয় বাজারগুলোতেও পশুখাদ্যের দাম সাধারণ কৃষকের নাগালের বাইরে চলে গেছে। জেলার বিভিন্ন হাট-বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে প্রতি কেজি শুকনো খড় বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২৫ টাকা দরে। সেই হিসাবে এক মণ খড়ের দাম হাঁকা হচ্ছে প্রায় ১ হাজার টাকা। বাণিজ্যিক পশুখাদ্যের মধ্যে ৩৭ কেজির এক বস্তা গমের ভুসি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬ ৩০ টাকায় এবং ৪০ কেজির এক বস্তা ভুট্টার গুঁড়ার দাম গিয়ে ঠেকেছে ১ হাজার ৪৪০ টাকায়।  ​এই চরম মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত পরিবহন খরচ ও শ্রমিক মজুরি। এর বাইরে কাঁচা ঘাসেরও দেখা মিলছে না বললেই চলে। উঁচু কিছু জমি, বসতবাড়ির আশপাশ কিংবা রাস্তার কিনারায় অল্প কিছু ঘাস পাওয়া গেলেও তা কিনতে হচ্ছে চড়া দামে। সার্বিক এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন স্বল্প পুঁজির প্রান্তিক কৃষক ও ছোট ডেইরি খামারিরা।  ​​করিমগঞ্জ উপজেলার রৌহা গ্রামে অবস্থিত ‘জেসি এগ্রো ফার্ম’-এর ব্যবস্থাপক হোসেন মোহাম্মদ রিয়াদ তাঁর খামারের সংকট বর্ণনা করে বলেন, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক গরুর জন্য যে পরিমাণ পুষ্টিকর খাবারের প্রয়োজন হয়, বর্তমান বাজারে তা জোগাড় করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। আগে নিজেদের জমি থেকেই পর্যাপ্ত খড় ও কাঁচা ঘাস সংগ্রহ করা সম্ভব হতো, কিন্তু বন্যায় সব নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন সেই সুযোগ নেই। তাই বাধ্য হয়েই তারা আশপাশের কলাগাছ ছোট ছোট টুকরো করে গাভিগুলোকে খাওয়াচ্ছেন এবং তার সঙ্গে সামান্য পরিমাণে ভুসি ও অন্যান্য খাবার মিশিয়ে দিচ্ছেন। সরকারি কোনো সহায়তা কিংবা খাদ্যের দাম কমানোর ব্যবস্থা না করা হলে সাধারণ খামারিদের টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে।  ​কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার দরবারপুর গ্রামের কৃষক আলতাফ হোসেন জানান, উজান থেকে নেমে আসা ঢলে তাঁদের খেতের ফসল একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। ফসল ঘরে তুলতে না পারায় মানুষের খাদ্যের পাশাপাশি গবাদিপশুর খাবারেও বড় ধরনের সংকট দেখা দেয়। গ্রামের খাল-বিলে যদি কচুরিপানা না থাকত, তবে গরুগুলোকে বাঁচিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়ত। আগে যাকে আগাছা মনে করে জল থেকে তুলে ফেলে দেওয়া হতো, এখন বাজারের পশুখাদ্যের চড়া দামের কারণে সেটাই বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল হয়ে দাঁড়িয়েছে।  ​একই কথা প্রকাশ করেন বটকিলা গ্রামের বাচু মিয়া। প্রায় ছয় কিলোমিটার দূর থেকে রৌহা বিলে কচুরিপানা নিতে আসা এই কৃষক বলেন, বাজার থেকে ভুসি ও রেডি ফিড কিনে গরুকে পূর্ণমাত্রায় খাওয়ানোর সামর্থ্য তাঁর নেই। ৪৬ হাজার টাকা দিয়ে কেনা বাছুরটিকে প্রায় চার বছর ধরে পরম মমতায় লালন-পালন করেছেন তিনি। বর্তমানে গরুটি প্রতিদিন প্রায় ছয় লিটার করে দুধ দেয়, যা বিক্রি করে তাঁর পুরো সংসার চলে। পরিবারের এত বড় একটি সহায় সম্বলকে তো অনাহারে রাখা যায় না, তাই অনেক দূর কষ্ট করে গিয়ে হলেও জলাশয় থেকে প্রতিদিন কচুরিপানা তুলে আনছেন।  ​যশোদল ইউনিয়নের নোয়াপাড়া গ্রামের কৃষক রাকিব মিয়া জানান, অতীতে নিজেদের উৎপাদিত ধানের খড় দিয়ে অন্তত কয়েক মাসের গো-খাদ্যের ব্যবস্থা হয়ে যেত। কিন্তু এবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঘরে খড় ওঠেনি। বাজার থেকে উচ্চমূল্যে খড় ও ভুসি কিনে গরু পালন করা এখন চরম ব্যয়বহুল। তাই বিনামূল্যে পাওয়া কচুরিপানা কুড়িয়ে এনে খড় ও অল্প ভুসির সাথে মিশিয়ে দিচ্ছেন, যাতে অন্তত খরচের মাত্রা কিছুটা হলেও কমানো যায়।  ​তাড়াইল উপজেলার কাজলা গ্রামের খামারি নজরুল ইসলাম একই সংকট তুলে ধরে বলেন, একসঙ্গে কয়েকটি গরু পালন করলে প্রতিদিন প্রচুর খাবারের প্রয়োজন হয়। বাজার থেকে কিনে খাওয়ানো হলে খামারের লাভ তো দূরের কথা, মূলধন রক্ষা করাই অসম্ভব। অথচ বাজারে গরুর মাংস প্রতি কেজি ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হলেও খামারিরা যখন আস্ত গরু বিক্রি করতে যান, তখন সেই তুলনায় দাম পান না। খাদ্যের বাড়তি খরচ আর পশুর কম দাম—এই দ্বিমুখী চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।  ​​কিশোরগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনু্যায়ী, পুরো জেলায় বর্তমানে গবাদিপশুর সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার, যার মধ্যে গরুর সংখ্যা ৯ লাখ ২২ হাজার ৪৪৯টি এবং মহিষের সংখ্যা ৭ হাজার ৭৪৫টি। এছাড়া জেলায় বছরে প্রায় ৭৫ দশমিক ০৩ লাখ মেট্রিক টন দুধ উৎপাদিত হয়।  ​জেলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে এই বিপুলসংখ্যক গবাদিপশু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেকের কাছেই পশু পালন কেবল বাড়তি আয়ের মাধ্যম নয়, বরং এক ধরনের জরুরি সঞ্চয়। পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা, সন্তানকে স্কুলে পাঠানো কিংবা মেয়ের বিয়ের মতো বড় খরচের মুখোমুখি হলে কৃষকরা এই গবাদিপশু বিক্রি করেই অর্থসংস্থান করেন। ফলে খাবারের সংকট যদি খামারিদের পশু বিক্রি করে দিতে বাধ্য করে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।  ​পশুখাদ্য হিসেবে কচুরিপানার পুষ্টিমান ও স্বাস্থ্যগত দিক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিয়েছেন কিশোরগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আব্দুল মান্নান। তিনি জানান, একক খাবার হিসেবে কচুরিপানায় উচ্চমাত্রার পুষ্টিমান বা খাদ্যগুণ থাকে না। তবে সবুজ ঘাসের বিকল্প হিসেবে এক ধরনের ‘বাল্ক ফিড’ বা পাকস্থলী ভরিয়ে রাখার মাধ্যম হিসেবে এটি গবাদিপশুকে খাওয়ানো যেতে পারে।  প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আরো সতর্ক করে বলেন, পরিমিত পরিমাণে ও সঠিকভাবে পরিষ্কার করে খাওয়ালে কচুরিপানায় সাধারণত কোনো ক্ষতি হয় না। তবে অতিমাত্রায় যেকোনো একটি খাবার দেওয়া গবাদিপশুর শারীরিক পরিপাকতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই খামারিদের প্রতি পরামর্শ থাকবে, তারা যেন কেবল কচুরিপানার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে এর পাশাপাশি কিছুটা হলেও খড়, কাঁচা ঘাস, গমের ভুসি এবং অন্যান্য পুষ্টিকর উপাদান খাদ্যতালিকায় বজায় রাখেন।  ​কৃষি ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করছেন যে, বন্যা ও দুর্যোগের প্রভাবে সৃষ্টি হওয়া এই খাদ্যাভাব সাময়িক। নতুন ফসল মাঠে উঠলে এবং আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে ধীরে ধীরে খড় ও ঘাসের জোগান স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসবে। তবে তত দিন পর্যন্ত টিকে থাকতে কচুরিপানাই কিশোরগঞ্জের প্রান্তিক খামারিদের কাছে বাঁচা-মরার মূল চালিকাশক্তি হয়ে থাকবে।

সম্পর্কিত সংবাদ