ফিচার

লালনের আখড়ায় ফরাসি জান্নাত, অচিন পাখির খোঁজে ঘর বাঁধলেন বাংলায়

⎙ প্রিন্ট
লালনের আখড়ায় ফরাসি জান্নাত, অচিন পাখির খোঁজে ঘর বাঁধলেন বাংলায়
ছবিঃ ইফতেখার আহমেদ জুলহাস
⌖ সোনারগাঁ

"খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়..." লালন সাঁইজির এই আধ্যাত্মিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হয়তো সুদূর ফ্রান্সের প্যারিস থেকে কুষ্টিয়ার আখড়াবাড়িতে ছুটে এসেছিলেন ফরাসি কন্যা দেবোরাহ জান্নাত। আধুনিক জীবনের সব বিলাসিতা ছেড়ে যিনি আজ পুরোদস্তুর বাংলার এক বাউল সাধিকা। মানুষের আসল ঠিকানা যে কাঁটাতারে নয়, বরং আত্মিক শান্তিতে—তিনিই তার জীবন্ত প্রমাণ!

একতারা-দোতারার সুরে মুখর কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়া। ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) ভোরে ‘অধিবাস সেবা’র মধ্য দিয়ে আখড়াবাড়িতে শুরু হয়েছে তিন দিনের স্মরণোৎসব। দুপুরের পর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। সোমবার পর্যন্ত চলবে সাধুসঙ্গ, আলোচনা সভা, লালনসংগীত ও গ্রামীণ মেলা। দেশ-বিদেশ থেকে এসেছেন সাধু, বাউল ও ভক্ত-অনুরাগীরা। সেই ভক্তদের ভিড়েই আছেন ফরাসি নাগরিক ‘লালনকন্যা’ খ্যাত দেবোরাহ কিউকারম্যান, যিনি কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলার এক গ্রামে এখন দেবোরাহ জান্নাত নামে পরিচিত।

জানা গেছে, দেবোরাহ জান্নাত ফ্রান্সে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। ২০১৮ সালে লালনের ১২৮তম তিরোধান দিবসের অনুষ্ঠানে তিনি নিজেই জানান, কয়েক বছর আগে ইউটিউবে একটি লালনগান শুনে তিনি মুগ্ধ হন। সেই আগ্রহ থেকে লালনের জীবন ও দর্শন নিয়ে গবেষণার উদ্দেশ্যে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে আসেন। প্রথমবার এসে ফ্রান্সে ফিরে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে মন টেকেনি, আবার ফিরে আসেন। গণমাধ্যমকে তিনি জানিয়েছেন, এখানেই তিনি মনের প্রশান্তি খুঁজে পেয়েছেন।

২০১৮ সালে ছেঁউড়িয়ার স্মরণোৎসবে হাজারো ভক্তের ভিড়ে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। সেখানে এক আলোচনায় তিনি বলেন, মানবতা, প্রেম ও ঐক্যের যে বার্তা লালনের দর্শনে আছে, তা কোনো দেশ-কালে আটকে থাকার নয়, সর্বজনীন। আরেক আলাপে তিনি জানান, তাঁর কাছে সবকিছুর শুরু ‘শূন্যতা’র ধারণা থেকে, আর লালনের গান তাঁকে টেনে এনেছে নিঃস্বার্থ সেবার নীতির কাছে।

বাড়ির কাছে আরশিনগর
সেথা এক পড়শি বসত করে।
আমি একদিনও না দেখিলাম তাঁরে।

হয়তো না দেখার এই আফসোস নিয়েই ভারতীয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত মরমি বাউল সাধক ফকির লালন শাহ ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর ছেঁউড়িয়ার নিজ আখড়ায় প্রয়াত হন। ১৩৬ বছর পরেও তাঁর গান ও দর্শন যে দূর দেশের মানুষকেও টানে, দেবোরাহ জান্নাতের জীবন তারই এক উদাহরণ। খাঁচার ভেতরের সেই অচিন পাখির খোঁজ তিনি পেয়েছেন কি না, সে উত্তর হয়তো তাঁর একতারার সুরেই লুকিয়ে আছে।

সম্পর্কিত সংবাদ