ভোরের প্রথম আলো যখন সবেমাত্র উঁকি দেয় কুয়াশাচ্ছন্ন দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার শ্রীচন্দ্রপুর গ্রামে, তখন থেকেই শুরু হয় এক বয়োবৃদ্ধ মানুষের ক্লান্তিহীন প্রস্তুতি। ৮ বছরের বার্ধক্যে পৌঁছানো শরীর, অথচ চোখেমুখে বেঁচে থাকার তীব্র অদম্য এক জেদ। হাতে বাঁশ, হাতুড়ি, বাটাল আর রশি নিয়ে কাজের জন্য প্রস্তুত হয়ে যান ৮০ বছরের মকবুল হোসেন।
বয়সের ভারে কুঁজো হয়ে যাওয়া এই মানুষটির কাছে বিশ্রাম নেওয়ার কোনো বিলাসিতা নেই। কারণ, তাঁর ঘামে ভেজা এই শ্রমের ওপরই নির্ভর করছে তাঁর ছোট্ট সংসারটির বেঁচে থাকা।
প্রায় এক দশক ধরে দড়ির খাট তৈরি করে তা বিভিন্ন হাটবাজারে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করাই মকবুল হোসেনের পেশা। বাঁশ, হাতুড়ি, বাটাল আর দড়ি—এই সামান্য কিছু উপকরণই তাঁর বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন।
গ্রামের মেঠোপথ, কাঁচা-পাকা রাস্তা পেরিয়ে তিনি পৌঁছে যান স্থানীয় হাটগুলোতে। রাস্তার ধারে খাটগুলো সাজিয়ে বসে পড়েন ক্রেতার অপেক্ষায়। ছোট-বড় সবার প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে বিভিন্ন সাইজের খাট তৈরি করেন তিনি। এভাবেই গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে গ্রামবাংলার মানুষের কাছে তিনি এক পরিচিত মুখ।
কথা হয় মকবুল হোসেনের সঙ্গে। তাঁর মুখে ফুটিয়ে ওঠে দীর্ঘজীবনের হিসাব-নিকাশ। তিনি জানান, একেকটি খাট তৈরি করতে সময় লাগে তিন থেকে চার দিন। বাঁশ ও রশিসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ কিনতে খরচ পড়ে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা। আর সেই খাট হাটে বিক্রি হয় ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকায়।
তবে সব দিন কি আর সমান যায়? "কোনো দিন বিক্রি ভালো হয়, আবার কোনো দিন আশানুরূপ ক্রেতা মেলে না,"—দীর্ঘশ্বাস ফেলেন মকবুল। রোদ, বৃষ্টি কিংবা বার্ধক্যের শারীরিক ক্লান্তি—কোনো কিছুই তাঁকে ঘরে আটকে রাখতে পারে না। প্রতিবার কম লাভ নিয়ে বাড়ি ফিরলেও, পরদিন সকালে আবার নতুন উদ্যমে পথে নামেন তিনি।
মকবুল হোসেনের পরিবারে রয়েছে দুই ছেলে ও এক মেয়ে। একসময় সামান্য কিছু জমিতে চাষবাস করে এবং এই কায়িক পরিশ্রমের টাকায় ছেলে-মেয়েদের বড় করেছেন, বিয়েও দিয়েছেন। বর্তমানে বৃদ্ধ বয়সে স্ত্রী আর তিনি নিজেই নিজের সংসার সামলান।
সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাতে এবং পরিবারের ভরণপোষণ জোগাতে জীবনের দীর্ঘ সময় ধরে তিনি কেবল লড়েই গেছেন। তাঁর এই সংগ্রাম কেবল জীবিকার তাগিদ নয়, এটি দায়িত্ববোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
আমাদের গ্রামবাংলার অর্থনীতিতে মকবুল হোসেনের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অবদান নীরব, অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা নিজেরা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনের জিনিসপত্র তৈরি করেন এবং নিজেদের ঘামে সংসার চালান।
মকবুল হোসেনের জীবন যেন গ্রামবাংলার হাজারো পরিশ্রমী মানুষের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। বড় কোনো স্বপ্ন তাঁর নেই; তাঁর চাওয়া কেবল কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের মুখে একটু হাসি ফোটানো এবং মাথা উঁচু করে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকা।
হাট-বাজারের ধুলোবালি মাখা এই দীর্ঘ পথচলাই তাঁর জীবন। এটি নিছক কোনো ব্যবসার গল্প নয়—এটি বেঁচে থাকার, লড়াই করার এবং হার না মানার এক অন্তহীন উপাখ্যান।
বাঁশের কাঠামোয় বুনে চলা এক জীবন: ৮০ বছরের মকবুল হোসেনের অদম্য সংগ্রাম








