অর্থনীতি

শ্রমিক বিক্ষোভের জেরে ৩ শতাধিক পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা

⎙ প্রিন্ট
শ্রমিক বিক্ষোভের জেরে ৩ শতাধিক  পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা



বিশেষ প্রতিনিধি 
শ্রমিক অসন্তোষের জেরে  পাঁচটি শিল্পাঞ্চলে প্রায় ৩০০ পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে রবিবার রাজধানীর মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরে বিক্ষোভে নামেন পোশাকশ্রমিকেরা। বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং সরকারি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। 
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সাভার ও আশুলিয়ায় ১৭৭টি এবং গাজীপুরে শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার মো. মুমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, নিরাপত্তার স্বার্থে কারখানাগুলি বন্ধ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন আশা প্রকাশ করেন, সোমবার থেকে কারখানাগুলিতে উৎপাদন স্বাভাবিক হবে। মিরপুরে সংঘর্ষ ও সরকারি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ১১ জনকে গ্রেফতারের কথা জানিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।  ডিবির দাবি, গ্রেফতার ব্যক্তিরা নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত এবং বিভিন্ন জেলা থেকে এসে নাশকতার চেষ্টা করেছিলেন। 
এদিকে, শ্রমিক অসন্তোষ মোকাবিলায় রবিবার সন্ধ্যায় জরুরি বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অর্থ, স্বরাষ্ট্র ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীসহ ছয় থেকে সাতজন মন্ত্রী ও উপদেষ্টাকে বৈঠকে ডাকা হয়। এর আগে শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। শ্রমিকদের দাবিদাওয়া ও শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সরকার কী পদক্ষেপ করে, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্ট মহলের।

এদিন সকাল থেকেই শিল্পাঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং যান চলাচল ব্যাহত হয়। মিরপুরে শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নাশকতার অভিযোগ তুলেছে গোয়েন্দা পুলিশ। সাধারণ পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের আড়ালে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের প্রায় ১২০ থেকে ১৫০ জন নেতাকর্মী পেছন থেকে উসকানি দিচ্ছিলেন। 
শ্রমিকদের বিক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে তাঁরা সহিংসতা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ গোয়েন্দাদের। আন্দোলনের জেরে এসব এলাকার তিন শতাধিক পোশাক কারখানা ছুটি ছিল বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশ। শিল্প পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাভার ও আশুলিয়ায় ১৭৭টি পোশাক কালখানা ছুটি ছিল। এদিকে গাজীপুরে ছুটি ছিল শতাধিক কারখানা। শিল্প পুলিশ-১ এর আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. মুমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, পোশাক কারখানার শ্রমিকরা সকাল থেকেই কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ করছেন। 
শ্রমিকদের যৌক্তিক আন্দোলনে বাধা দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে সরকার মজুরি বোর্ড গঠনের পরও এ ধরনের বিক্ষোভের পেছনে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার কোনো চেষ্টা রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশের ওই কর্মকর্তা। তিনি জানান, অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কারখানাগুলোর সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। শিল্প পুলিশ-২ এর গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন বলেন, 'উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে চৌরাস্তা থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত শতাধিক কারখানা ছুটি ছিল আজ। অন্য কারখানাগুলোতে স্বাভাবিক উৎপাদক হয়েছে। সোমবার সব কারখানা খোলা থাকবে এবং উৎপাদন স্বাভাবিক থাকবে বলে আশা ব্যক্ত করেন শিল্প পুলিশ-২ এর গাজীপুরের পুলিশ সুপার।পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন চলাকালে এদিন দুপুরে মজুরি বোর্ড ঘোষণার পর পুলিশ আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে গেলে উভয়পক্ষের সংঘর্ষ হয়। এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৩ জনকে। পুলিশের দাবি, আন্দোলন থেকে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ রাকিব খান সংবাদমাধ্যমকে জানান, আন্দোলন সহিংস রূপ নেওয়ার পর পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের অভিযোগে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ১১ জন নেতাকর্মীকে ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। 
প্রাথমিক তদন্ত ও গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে, নিষিদ্ধ দলের নেতাকর্মীরা এই নাশকতা চালাচ্ছে। ডিবি পুলিশ আরো জানায়, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা মূলত স্থানীয় পোশাক কারখানার শ্রমিক নন, তারা বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার ও গাইবান্ধাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসে শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে নাশকতার উদ্দেশ্যে মিরপুরে জড়ো হয়েছিলেন। এই চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্য আসামিদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকের ছদ্মবেশে জনমনে আতঙ্ক ছড়ানো এবং দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির দুরভিসন্ধি ও সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা সাধারণ পোশাক শ্রমিকদের ছদ্মবেশ ধারণ করে বা তাদের অন্তরালে থেকে এই নাশকতা পরিচালনা করছে।তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বোর্ডে রয়েছেন বিজিএমইএর পরিচালক এ বি এম শামসুদ্দিন এবং শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার। শ্রমিকদের বিক্ষোভের মধ্যে তার সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর বাতিল করেছেন মন্ত্রী। 
এদিকে শ্রমিক অসন্তোষ মোকাবেলায় করণীয় নির্ধারণ করতে সন্ধ্যায় কয়েকজন মন্ত্রীকে নিজের কার্যালয়ে ডেকেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সূত্র জানায়, শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী দুপুর ১টার দিকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন।

সম্পর্কিত সংবাদ