"মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি"—মরমি সাধনা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং পরম মানবতার এই অমর বাণীতে আজ ফের জাগ্রত হলো লোকসংস্কৃতির অবিনাশী ঐতিহ্য। অদ্য ১৭ অক্টোবর ২০২৬, বাংলা লোকসংস্কৃতির প্রবাদপুরুষ, মানবতাবাদী ভাবসাধক ও বাউলসম্রাট লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে কিশোরগঞ্জে আয়োজিত হয় এক বর্ণাঢ্য লোকউৎসব। জেলা প্রশাসন, কিশোরগঞ্জের সর্বাত্মক উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে ছিল শোভাযাত্রা, স্মারক আলোচনা সভা, হৃদয়গ্রাহী সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং মেধা বিকাশের বিভিন্ন প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান।
শরতের আলো-ছায়ায় ঘেরা সকালে কিশোরগঞ্জ কালেক্টরেট প্রাঙ্গণ থেকে এক বর্ণাঢ্য ও দৃষ্টিনন্দন র্যালির মধ্য দিয়ে দিবসের সূচনা ঘটে। ব্যানার, ফেস্টুন আর লোকজ বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে বের হওয়া এই শোভাযাত্রাটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনশ্চ নির্ধারিত অনুষ্ঠানস্থলে এসে সমাপ্ত হয়। র্যালিতে সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, সাংস্কৃতিক কর্মী, তরুণ শিক্ষার্থী এবং সাধারণ সুধীজনের স্বতঃস্ফূর্ত পদচারণায় পুরো শহর যেন লোকজ সংস্কৃতির এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।
শোভাযাত্রা পরবর্তী স্মারক আলোচনা সভায় লালন সাঁইয়ের সার্বজনীন জীবনদর্শন ও মানবিক চেতনাকে নতুন প্রজন্যের কাছে তুলে ধরার অঙ্গীকার নিয়ে প্রধান অতিথির বক্তৃতা প্রদান করেন কিশোরগঞ্জ-১ আসনের মহামান্য সংসদ সদস্য মোঃ মাজহারুল ইসলাম। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, "লালন সাঁই কেবল একজন সাধক বা কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন জাত-পাত ও ধর্মীয় বিভেদের ঊর্ধ্বে ওঠা এক মহান মানবতাবাদী দার্শনিক। আজকের এই অস্থির ও প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে লালনের সাম্য ও সহমর্মিতার দর্শন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি তাঁর কালজয়ী গান ও ভাবের মাধ্যমে যে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা রক্ষা করা এবং লোকসংস্কৃতির সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্যের হৃদয়ে সঞ্চারিত করা আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব।"
অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন-এর সুযোগ্য ও দীপ্তিময় সভাপতিত্বে পুরো সভাটি গম্ভীর অথচ প্রানোচ্ছ্বল আবহে রূপ নেয়। সমাপনী ও সভাপতি বক্তব্যে জেলা প্রশাসক বলেন, "বাংলা সংস্কৃতির শেকড় প্রোথিত আছে আমাদের লোকজ সাহিত্যের গহীনে, যার মূল কাণ্ডারী সাঁইজি লালন। জেলা প্রশাসন সব সময়ই আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বিকাশ ও সংরক্ষণে বদ্ধপরিকর। তরুণ সমাজকে লালনের অসাম্প্রদায়িক শিক্ষা ও মানবপ্রেমের ধারায় উদ্বুদ্ধ করতে প্রতি বছরই এমন নান্দনিক উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।"
অনুষ্ঠানে বিশেষ ও সম্মানীয় অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে গুরুদয়াল সরকারি কলেজের স্বনামধন্য অধ্যক্ষ প্রফেসর মোঃ সিদ্দিক উল্লাহ লালনের গান ও ভাবাদর্শের দার্শনিক বিস্তার নিয়ে আলোকপাত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, "লালনের পদাবলী কেবল গীত নয়, তা গভীর জ্ঞানের আধার। সেখানে আত্মার অনুসন্ধানের পাশাপাশি সমাজ সংস্কারের মহৎ বার্তা লুকিয়ে আছে।"
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে অন্যান্য বিশিষ্ট অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ও উপস্থিতি জ্ঞাপন করেন জেলা পুলিশ সুপারের যোগ্য প্রতিনিধি, জেলা সিভিল সার্জনের প্রতিনিধি এবং জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ। লোকসংস্কৃতিপ্রেমী স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পী, গণমাধ্যমের সাংবাদিকবৃন্দ এবং সুধীজনের উপস্থিতিতে পুরো মিলনায়তন কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে।
আলোচনা পর্বের পর শুরু হয় লোকসংস্কৃতির মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। স্থানীয় ও আমন্ত্রিত বাউল শিল্পীদের দরদী কণ্ঠে যখন লালনের একটার পর একটা কালজয়ী গান—'খাঁচার ভেতর অচিন পাখি', 'সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে', কিংবা 'জাতে মাতাল তালে ঠিক' ধ্বনিত হচ্ছিল, তখন উপস্থিত প্রতিটি মানুষের অন্তরে ছড়িয়ে পড়ে মরমি ব্যাকুলতা ও এক অদ্ভুত আত্মিক প্রশান্তি। দোতারা, একতারা ও মন্দিরার ঝংকারে চারপাশের বাতাসে সুরের যে মোহনীয় জাদু ছড়িয়ে পড়ে, তা উপস্থিত শ্রোতাদের ভাবাবেগে আপ্লুত করে তোলে।
অনুষ্ঠানের শেষভাগে লালন সাঁইয়ের জীবন, দর্শন ও গান নিয়ে আয়োজিত রচনা, আবৃত্তি ও সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিক্ষার্থীদের মাঝে মেধা ও কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্মারক ও মূল্যবান পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। লালন সাঁইয়ের জীবনদর্শন থেকে শিক্ষা নিয়ে বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক এক সোনার বাংলা গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় প্রকাশের মধ্য দিয়েই সমাপ্তি ঘটে এ দিনব্যাপী মহতী লোকউৎসবের।
বাউলসম্রাট লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে কিশোরগঞ্জে লোকউৎসব।
সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে’—মানবতার মরমি সুর ও কালজয়ী চেতনায় মুখরিত কিশোরগঞ্জ; জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বর্ণাঢ্য র্যালি, স্মারক আলোচনা ও লোকসঙ্গীতের সুরঝংকার।








