জামাই ছাড়তে পারব, টিকটক ছাড়তে পারব না! বিনোদন নাকি আসক্তির নতুন ফাঁদ?

জামাই ছাড়তে পারব, টিকটক ছাড়তে পারব না! বিনোদন নাকি আসক্তির নতুন ফাঁদ?
প্রিন্ট
একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে ভাবনার জন্ম দিয়েছে। একজনকে বলতে শোনা যায়, “আমি টিকটক ছাড়তে পারব না, জামাই ছাড়তে পারব!” কথাটি হয়তো মজার ছলে বলা। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রশ্ন—মানুষের জীবনে টিকটক কি শুধুই বিনোদনের মাধ্যম, নাকি ধীরে ধীরে এটি মানুষের অভ্যাস, সময়, সম্পর্ক এবং মানসিকতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে?
বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন হাতে নিলেই সামনে আসে অসংখ্য ছোট ভিডিও। কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও থেকে আরেকটি ভিডিও, তারপর আরেকটি। কখন যে কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টা পার হয়ে যায়, অনেক ব্যবহারকারী তা বুঝতেও পারেন না।

প্রশ্ন হচ্ছে, যে প্ল্যাটফর্ম মানুষের বিনোদন, কর্মসংস্থান ও প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ তৈরি করছে, সেই প্ল্যাটফর্মই কি আবার মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে?
টিকটক: বিনোদনের আড়ালে নতুন বাস্তবতা
টিকটক বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও প্ল্যাটফর্ম। এখানে গান, নাচ, অভিনয়, রান্না, শিক্ষা, সংবাদ, প্রযুক্তি, ভ্রমণসহ নানা ধরনের ভিডিও তৈরি ও প্রকাশ করা যায়।
অনেক তরুণ-তরুণী নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন। কেউ অভিনয় করে পরিচিতি পাচ্ছেন, কেউ রান্নার ভিডিও দিয়ে ব্যবসা করছেন, কেউ আবার শিক্ষামূলক ভিডিও তৈরি করে মানুষের উপকার করছেন।
এমনকি ছোট উদ্যোক্তারাও টিকটক ব্যবহার করে নিজেদের পণ্য ও সেবা প্রচার করছেন। অনেকের জন্য এটি আয়ের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করেছে।
কিন্তু এখানেই প্রশ্ন—সবাই কি সঠিকভাবে এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন?
ভালো দিক: টিকটক কি বদলে দিতে পারে জীবন?
টিকটকের ইতিবাচক দিকগুলো অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
প্রথমত, প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ। আগে একজন সাধারণ মানুষের অভিনয়, গান কিংবা অন্য কোনো প্রতিভা লাখো মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন ছিল। এখন একটি ভালো ভিডিও মুহূর্তেই ব্যাপক দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ব্যবসায়িক প্রচারণা। ছোট ব্যবসায়ী, অনলাইন উদ্যোক্তা ও নতুন ব্র্যান্ডগুলো ভিডিওর মাধ্যমে নিজেদের পণ্য পরিচিত করতে পারেন।
তৃতীয়ত, শিক্ষামূলক কনটেন্ট। ভাষা শিক্ষা, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য সচেতনতা, রান্না, সাধারণ জ্ঞান এবং বিভিন্ন দক্ষতা শেখার জন্য টিকটকে উপকারী ভিডিও রয়েছে।
চতুর্থত, সামাজিক সচেতনতা। কোনো দুর্ঘটনা, দুর্যোগ, মানবিক সহায়তা কিংবা সামাজিক সমস্যার ভিডিও দ্রুত মানুষের নজরে আনা সম্ভব।
অর্থাৎ টিকটক নিজে শুধু খারাপ কোনো প্ল্যাটফর্ম নয়। এর ব্যবহার নির্ভর করছে ব্যবহারকারীর উদ্দেশ্য, কনটেন্টের মান এবং ব্যবহারের সময়সীমার ওপর।
খারাপ দিক: কখন বিনোদন পরিণত হয় আসক্তিতে?
টিকটকের সবচেয়ে আলোচিত সমস্যাগুলোর একটি হলো অতিরিক্ত ব্যবহার।
একজন ব্যবহারকারী হয়তো পাঁচ মিনিটের জন্য অ্যাপ খুললেন। কিন্তু ভিডিওর পর ভিডিও দেখতে গিয়ে এক ঘণ্টা পার করে দিলেন। অনেক সময় ঘুমানোর আগেও ব্যবহার বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এর পেছনে রয়েছে প্ল্যাটফর্মটির ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী ভিডিও দেখানোর ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরবর্তী ভিডিও চালু হওয়া এবং অবিরাম স্ক্রল করার সুবিধা।
২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ইউরোপীয় কমিশন টিকটকের এই ধরনের নকশা নিয়ে প্রাথমিক উদ্বেগ প্রকাশ করে। তাদের তদন্তে বলা হয়, ইনফিনিট স্ক্রল, অটোপ্লে, নোটিফিকেশন এবং ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী কনটেন্ট দেখানোর ব্যবস্থা ব্যবহারকারীদের বাধ্যতামূলকভাবে দীর্ঘ সময় ধরে অ্যাপ ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তবে এটি ছিল তদন্তের প্রাথমিক মূল্যায়ন, চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত নয়।
মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কতটা প্রভাব পড়ছে?
টিকটকে অতিরিক্ত সময় কাটানোর সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের বিভিন্ন সমস্যার সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হয়েছে।
২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ১৬টি গবেষণার ১৫ হাজার ৮২১ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে সমস্যাজনক টিকটক ব্যবহারের সঙ্গে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে গবেষণাগুলোর অধিকাংশই পর্যবেক্ষণমূলক। তাই শুধু টিকটক ব্যবহারই এসব সমস্যার একমাত্র কারণ—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।
তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়, একজন মানুষ যদি প্রতিদিন নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় ভিডিও দেখেই কাটিয়ে দেন, তাহলে তার পড়াশোনা, কাজ, ঘুম ও ব্যক্তিগত জীবনের কী অবস্থা হবে?
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম কি ঝুঁকিতে?
বাংলাদেশেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত একটি গবেষণায় কুড়িগ্রাম জেলার ১ হাজার ১৮৩ জন কিশোর-কিশোরীর ওপর জরিপ পরিচালনা করা হয়। গবেষণায় সমস্যাজনক টিকটক ব্যবহারের সঙ্গে পারিবারিক যোগাযোগের দুর্বলতা, বন্ধুর কাছ থেকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা না পাওয়া এবং স্কুলে অনুপস্থিতির মতো কয়েকটি বিষয়ের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
এটি পুরো বাংলাদেশের সব কিশোর-কিশোরীর প্রতিনিধিত্ব করে না। তবে গবেষণাটি আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা তুলে ধরে।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত ইউনিসেফ বাংলাদেশের একটি জরিপে প্রায় ২৯ হাজার তরুণ অংশ নেন। জরিপে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি উত্তরদাতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ভুয়া খবর ও ভুল তথ্যকে মানসিক চাপের বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের সন্তানরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে কী শিখছে? তারা কি জ্ঞান অর্জন করছে, নাকি শুধু জনপ্রিয় হওয়ার প্রতিযোগিতায় সময় ব্যয় করছে?
পারিবারিক সম্পর্কেও কি তৈরি হচ্ছে দূরত্ব?
একটি পরিবারের সদস্যরা একই ঘরে বসে আছেন। বাবা মোবাইল দেখছেন, মা মোবাইল দেখছেন, সন্তানও নিজের ফোনে ব্যস্ত।
কিন্তু কেউ কারও সঙ্গে কথা বলছেন না।
এটি এখন অনেক পরিবারের পরিচিত দৃশ্য।
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের যোগাযোগ কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক—সব ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
যখন একজন মানুষ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর পরিবর্তে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও দেখেন, তখন সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, টিকটক ব্যবহার করলেই পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট হয় না। সমস্যা তৈরি হয় যখন ভার্চুয়াল জগৎ বাস্তব জীবনের দায়িত্ব ও সম্পর্কের জায়গা দখল করে নেয়।
ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতা: কোথায় যাচ্ছে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ?
টিকটকে জনপ্রিয় হওয়ার জন্য অনেকেই নিয়মিত ভিডিও তৈরি করছেন। কেউ অভিনয় করছেন, কেউ নাচছেন, কেউ হাস্যরসাত্মক ভিডিও তৈরি করছেন।
কিন্তু কিছু কনটেন্টে দেখা যায়, আলোচনায় আসার জন্য ব্যক্তিগত জীবনকে অতিরঞ্জিতভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। কখনো অশালীনতা, কখনো অপমানজনক আচরণ, আবার কখনো বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জকে বিনোদন হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
সব কনটেন্ট নির্মাতাকে একইভাবে বিচার করা ঠিক নয়। তবে ভিউ, লাইক ও ফলোয়ারের প্রতিযোগিতা যখন নৈতিকতা ও নিরাপত্তাকে পেছনে ফেলে দেয়, তখন তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের জন্য বয়স-অনুপযোগী কনটেন্ট, সাইবার বুলিং এবং ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে।
টিকটক কি অর্থ উপার্জনের মাধ্যম, নাকি সময় নষ্টের জায়গা?
এখানে রয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা।
একদল মানুষ টিকটক ব্যবহার করে ব্যবসা করছেন, পণ্য বিক্রি করছেন, বিজ্ঞাপন পাচ্ছেন এবং নিজেদের পেশাগত পরিচিতি তৈরি করছেন।
অন্যদিকে, আরেকদল মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্যের ভিডিও দেখে সময় পার করছেন।
দুই পক্ষের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
পার্থক্য হলো উদ্দেশ্য এবং ব্যবহার পদ্ধতিতে।
যে ব্যক্তি পরিকল্পনা করে ভিডিও তৈরি করেন, নিজের দক্ষতা বাড়ান কিংবা ব্যবসার প্রচার করেন, তিনি টিকটককে একটি কাজের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন।
কিন্তু যিনি কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল করছেন, তার ক্ষেত্রে সময়ের অপচয় এবং নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাহলে সমাধান কী?
টিকটক বন্ধ করে দেওয়াই কি সব সমস্যার সমাধান? বাস্তবতা হলো, শুধু একটি অ্যাপ বন্ধ করলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সমস্যার সমাধান হবে না।
প্রয়োজন সচেতন ব্যবহার।
১. প্রতিদিন টিকটক ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করতে হবে।
২. পড়াশোনা, অফিসের কাজ ও ঘুমের সময় মোবাইল ব্যবহার কমাতে হবে।
৩. শিশু-কিশোরদের বয়স অনুযায়ী নিরাপদ কনটেন্ট ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. অশালীন, বিভ্রান্তিকর ও সহিংস কনটেন্ট এড়িয়ে চলতে হবে।
৫. অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি শেয়ার করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে।
৬. পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বাস্তব জীবনে সময় কাটাতে হবে।
৭. কোনো ভিডিওতে দেখা তথ্য সত্য ধরে নেওয়ার আগে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে যাচাই করতে হবে।
শেষ প্রশ্ন: টিকটক আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে, নাকি আমরা টিকটককে নিয়ন্ত্রণ করছি?
“জামাই ছাড়তে পারব, কিন্তু টিকটক ছাড়তে পারব না”—কথাটি হয়তো একটি ভাইরাল বক্তব্য। কিন্তু এর মাধ্যমে যে বাস্তব প্রশ্ন সামনে এসেছে, সেটিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।
একটি অ্যাপ আমাদের বিনোদন দিতে পারে, পরিচিতি এনে দিতে পারে, ব্যবসার সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই অ্যাপের কারণে যদি পরিবারকে সময় দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়, পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ঘুম নষ্ট হয় কিংবা নিজের দায়িত্ব ভুলে যেতে হয়, তাহলে আমাদের থেমে ভাবতে হবে।
প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করার জন্য, মানুষকে প্রযুক্তির কাছে বন্দি করার জন্য নয়।
টিকটক ভালো না খারাপ—তার চূড়ান্ত উত্তর শুধু প্ল্যাটফর্মের মধ্যে নেই। উত্তর রয়েছে আমরা কী দেখছি, কেন দেখছি এবং কতক্ষণ দেখছি তার মধ্যে।
কারণ দিন শেষে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—আমরা কি টিকটক ব্যবহার করছি, নাকি টিকটকই আমাদের ব্যবহার করছে?

শেয়ার করুন-