নওগাঁর মান্দা উপজেলার প্রসাদপুর খেয়াঘাটে একটি সেতুর অভাবে প্রায় দুই লাখ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হলেও আত্রাই নদীর ওপর এখনো নির্মাণ হয়নি একটি স্থায়ী সেতু। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের এখনো নৌকা ও নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোর ওপর নির্ভর করেই চলাচল করতে হচ্ছে।
বর্ষা মৌসুমে নদী পারাপারের একমাত্র ভরসা নৌকা, আর শুষ্ক মৌসুমে বাঁশের সাঁকো। বছরের পর বছর ধরে এলাকাবাসী সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসলেও বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রসাদপুর খেয়াঘাটে একটি সেতু নির্মাণ হলে মাত্র ২০০ মিটার পথ অতিক্রম করেই উপজেলা সদরে পৌঁছানো সম্ভব হবে। অথচ বর্তমানে মানুষকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার ঘুরে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে যাতায়াত ব্যয়।
এলাকাবাসী জানান, প্রসাদপুর, গনেশপুর, মৈনম, কাঁশোপাড়া ও কশব ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন উপজেলা সদর, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস ও বাজারে যেতে এই খেয়াঘাট ব্যবহার করেন। কিন্তু নদী পারাপারের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে নৌকার জন্য অনেক সময় ৩০ থেকে ৪০ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এতে শিক্ষার্থীদের ক্লাস মিস হয়, চাকরিজীবীরা ভোগান্তিতে পড়েন এবং জরুরি রোগীদের দুর্দশা চরম আকার ধারণ করে।
প্রসাদপুর গ্রামের ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদীন বলেন, “উপজেলা সদরে স্কুল-কলেজ, সরকারি অফিস, হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থাকায় এই খেয়াঘাটটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম। কিন্তু একটি সেতুর অভাবে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।”
খুদিয়াডাঙ্গা গ্রামের কীটনাশক ব্যবসায়ী নুর বক্স মণ্ডল বলেন, “রাত ১০টার পর খেয়াঘাট বন্ধ হয়ে গেলে জরুরি প্রয়োজনে কয়েক কিলোমিটার ঘুরে উপজেলা সদরে যেতে হয়। এতে অনেক সময় রোগীর জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।”
গাড়ীক্ষেত্র গ্রামের কৃষক এরশাদ আলী জানান, “ব্রিজ না থাকায় কৃষকদের উৎপাদিত ধান, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য বাজারে নিতে অতিরিক্ত সময় ও পরিবহন খরচ গুনতে হচ্ছে। এতে কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।”
শিক্ষার্থী ইকবাল মাহমুদ তামিম বলেন, “বর্ষাকালে ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের নৌকায় পারাপার করতে হয়। এতে অভিভাবকেরা সবসময় আতঙ্কে থাকেন।”
প্রসাদপুর ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য শরিফ উদ্দিন বাচ্চু জানান, প্রতিদিন প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজার মানুষ এই খেয়াঘাট ব্যবহার করেন। বর্ষাকালে অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে নৌকায় ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রসাদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ আব্দুল মতিন মন্ডল বলেন, “বিশেষ করে সংকটাপন্ন রোগী ও সন্তানসম্ভবা নারীদের হাসপাতালে নিতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। অনেক সময় পথেই রোগীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে।”
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী আবু সায়েদ জানান, সেতু নির্মাণের জন্য এলজিইডির পক্ষ থেকে একাধিকবার জরিপ, মাটি পরীক্ষা ও স্থান নির্ধারণের কাজ করা হয়েছে। বড় প্রকল্প অনুমোদন পেলে এই সেতুকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় সংসদ সদস্য ইকরামুল বারী টিপু বলেন, “প্রসাদপুরের মানুষের দীর্ঘ ৫৫ বছরের দুর্ভোগ নিরসনে অতীতে কোনো সরকার কিংবা জনপ্রতিনিধি কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। ফলে স্বাধীনতার এত বছর পরও এলাকাবাসীকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকা ও বাঁশের সাঁকো দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। আমরা এই জনদুর্ভোগের স্থায়ী সমাধানে আন্তরিকভাবে কাজ করছি।”
তিনি আরও বলেন, “ইতোমধ্যে সেতু নির্মাণের জরিপ, মাটি পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় প্রাথমিক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে প্রকল্পটি অন্তর্ভুক্ত করে দ্রুত টেন্ডার আহ্বান ও নির্মাণকাজ শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রসাদপুরবাসীর স্বপ্নের সেতুর কাজ আগামী অর্থবছরেই শুরু করতে পারব বলে আশা করছি।”

বুধবার, ১৩ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ মে ২০২৬
নওগাঁর মান্দা উপজেলার প্রসাদপুর খেয়াঘাটে একটি সেতুর অভাবে প্রায় দুই লাখ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হলেও আত্রাই নদীর ওপর এখনো নির্মাণ হয়নি একটি স্থায়ী সেতু। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের এখনো নৌকা ও নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোর ওপর নির্ভর করেই চলাচল করতে হচ্ছে।
বর্ষা মৌসুমে নদী পারাপারের একমাত্র ভরসা নৌকা, আর শুষ্ক মৌসুমে বাঁশের সাঁকো। বছরের পর বছর ধরে এলাকাবাসী সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসলেও বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রসাদপুর খেয়াঘাটে একটি সেতু নির্মাণ হলে মাত্র ২০০ মিটার পথ অতিক্রম করেই উপজেলা সদরে পৌঁছানো সম্ভব হবে। অথচ বর্তমানে মানুষকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার ঘুরে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে যাতায়াত ব্যয়।
এলাকাবাসী জানান, প্রসাদপুর, গনেশপুর, মৈনম, কাঁশোপাড়া ও কশব ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন উপজেলা সদর, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস ও বাজারে যেতে এই খেয়াঘাট ব্যবহার করেন। কিন্তু নদী পারাপারের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে নৌকার জন্য অনেক সময় ৩০ থেকে ৪০ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এতে শিক্ষার্থীদের ক্লাস মিস হয়, চাকরিজীবীরা ভোগান্তিতে পড়েন এবং জরুরি রোগীদের দুর্দশা চরম আকার ধারণ করে।
প্রসাদপুর গ্রামের ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদীন বলেন, “উপজেলা সদরে স্কুল-কলেজ, সরকারি অফিস, হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থাকায় এই খেয়াঘাটটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম। কিন্তু একটি সেতুর অভাবে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।”
খুদিয়াডাঙ্গা গ্রামের কীটনাশক ব্যবসায়ী নুর বক্স মণ্ডল বলেন, “রাত ১০টার পর খেয়াঘাট বন্ধ হয়ে গেলে জরুরি প্রয়োজনে কয়েক কিলোমিটার ঘুরে উপজেলা সদরে যেতে হয়। এতে অনেক সময় রোগীর জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।”
গাড়ীক্ষেত্র গ্রামের কৃষক এরশাদ আলী জানান, “ব্রিজ না থাকায় কৃষকদের উৎপাদিত ধান, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য বাজারে নিতে অতিরিক্ত সময় ও পরিবহন খরচ গুনতে হচ্ছে। এতে কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।”
শিক্ষার্থী ইকবাল মাহমুদ তামিম বলেন, “বর্ষাকালে ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের নৌকায় পারাপার করতে হয়। এতে অভিভাবকেরা সবসময় আতঙ্কে থাকেন।”
প্রসাদপুর ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য শরিফ উদ্দিন বাচ্চু জানান, প্রতিদিন প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজার মানুষ এই খেয়াঘাট ব্যবহার করেন। বর্ষাকালে অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে নৌকায় ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রসাদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ আব্দুল মতিন মন্ডল বলেন, “বিশেষ করে সংকটাপন্ন রোগী ও সন্তানসম্ভবা নারীদের হাসপাতালে নিতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। অনেক সময় পথেই রোগীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে।”
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী আবু সায়েদ জানান, সেতু নির্মাণের জন্য এলজিইডির পক্ষ থেকে একাধিকবার জরিপ, মাটি পরীক্ষা ও স্থান নির্ধারণের কাজ করা হয়েছে। বড় প্রকল্প অনুমোদন পেলে এই সেতুকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় সংসদ সদস্য ইকরামুল বারী টিপু বলেন, “প্রসাদপুরের মানুষের দীর্ঘ ৫৫ বছরের দুর্ভোগ নিরসনে অতীতে কোনো সরকার কিংবা জনপ্রতিনিধি কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। ফলে স্বাধীনতার এত বছর পরও এলাকাবাসীকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকা ও বাঁশের সাঁকো দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। আমরা এই জনদুর্ভোগের স্থায়ী সমাধানে আন্তরিকভাবে কাজ করছি।”
তিনি আরও বলেন, “ইতোমধ্যে সেতু নির্মাণের জরিপ, মাটি পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় প্রাথমিক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে প্রকল্পটি অন্তর্ভুক্ত করে দ্রুত টেন্ডার আহ্বান ও নির্মাণকাজ শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রসাদপুরবাসীর স্বপ্নের সেতুর কাজ আগামী অর্থবছরেই শুরু করতে পারব বলে আশা করছি।”

আপনার মতামত লিখুন