সাংবাদিকের প্রথম পরিচয় হোক সত্যনিষ্ঠা
সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়, এটি সমাজের প্রতি একটি বড় দায়িত্ব। মানুষের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া, অন্যায়-অনিয়ম তুলে ধরা এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলো সামনে আনা সাংবাদিকতার অন্যতম কাজ। একটি সংবাদ মানুষের চিন্তা, সিদ্ধান্ত ও মতামতকে প্রভাবিত করতে পারে। একটি সত্য সংবাদ যেমন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারে, তেমনি ভুল, অসম্পূর্ণ কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ একজন ব্যক্তি, একটি প্রতিষ্ঠান এমনকি পুরো সমাজের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই সাংবাদিকের হাতে থাকা কলমের ব্যবহার হতে হবে অত্যন্ত দায়িত্বশীল।একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত তার সততা ও সত্যনিষ্ঠা। কোনো ব্যক্তি, দল, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর প্রতি ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ যেন সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রভাব না ফেলে। একটি খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা প্রকাশ করে দেওয়ার চেয়ে তথ্যটি কতটা সত্য, সেটি যাচাই করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একাধিক সূত্র থেকে তথ্য নিশ্চিত করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো তথ্য যাচাই ছাড়া প্রকাশ না করাই একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের কাজ।সাংবাদিককে হতে হবে নিরপেক্ষ ও সাহসী। ক্ষমতাবানদের প্রশ্ন করার যেমন সাহস থাকতে হবে, তেমনি সাধারণ মানুষের কথাও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরতে হবে। সাংবাদিক কারও পক্ষের মানুষ নন, তিনি সত্য ও জনস্বার্থের পক্ষের মানুষ। ক্ষমতাবানের অন্যায় হলে সেটিও তুলে ধরতে হবে, আবার সাধারণ মানুষের অপরাধ বা অনিয়ম থাকলেও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তা প্রকাশ করতে হবে। ব্যক্তিগত সম্পর্ক, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা সামাজিক অবস্থান যেন সত্য প্রকাশের পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।একজন ভালো সাংবাদিকের মধ্যে প্রশ্ন করার অভ্যাস থাকতে হবে। একটি ঘটনা ঘটেছে, কেন ঘটেছে? এর পেছনে কারা রয়েছে? এর সঙ্গে আর কারা জড়িত? সাধারণ মানুষের ওপর এর প্রভাব কী? এমন নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। শুধু প্রেস বিজ্ঞপ্তি, ফেসবুক পোস্ট কিংবা কারও বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে সাংবাদিকতা করলে সংবাদ হয়তো দ্রুত প্রকাশ করা যায়, কিন্তু সেখানে সাংবাদিকতার গভীরতা থাকে না। খবরের ভেতরের খবর খুঁজে বের করার আগ্রহই একজন সাংবাদিককে অন্যদের থেকে আলাদা করে।সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভাষা ও লেখার দক্ষতাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। একজন সাংবাদিককে সহজ, সাবলীল ও নির্ভুল ভাষায় পাঠকের কাছে তথ্য তুলে ধরতে জানতে হবে। অপ্রয়োজনীয় শব্দ, অতিরঞ্জন কিংবা চটকদার ভাষা দিয়ে সংবাদকে আকর্ষণীয় করার চেষ্টা অনেক সময় মূল ঘটনাকেই আড়াল করে ফেলে। শিরোনাম অবশ্যই পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে, তবে সেই শিরোনাম যেন কোনোভাবেই বিভ্রান্তিকর না হয়। পাঠককে আকৃষ্ট করা এবং পাঠককে বিভ্রান্ত করা এক বিষয় নয়।বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতা। কে আগে খবর দেবে, সেই প্রতিযোগিতায় অনেক সময় তথ্য যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্ব হারায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি তথ্য ছড়িয়ে পড়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেটি সংবাদমাধ্যমেও চলে আসে। কিন্তু সাংবাদিকতার মূল কথা হওয়া উচিত, ‘সবার আগে’ নয়, ‘সবার আগে সঠিক’। একটি ভুল সংবাদ মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। পরে সংশোধনী দেওয়া হলেও সেই ভুলের প্রভাব অনেক সময় পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয় না।সাংবাদিককে মানবিকও হতে হবে। দুর্ঘটনা, মৃত্যু, নির্যাতন, আত্মহত্যা কিংবা পারিবারিক সংকটের সংবাদ সংগ্রহের সময় ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের মর্যাদার বিষয়টি মনে রাখতে হবে। একটি ছবি বা একটি তথ্য পাঠকের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে, কিন্তু সেটি প্রকাশের কারণে কোনো পরিবার আরও বেশি সামাজিক বা মানসিক সংকটে পড়ছে কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি। মানুষের দুঃখ-কষ্টকে শুধু পাঠকের কৌতূহল মেটানোর উপকরণ বানানো সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য হতে পারে না।একজন সাংবাদিককে অর্থ, উপহার, ব্যক্তিগত সুবিধা কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে থাকতে হবে। সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। কোনো সুবিধার বিনিময়ে সংবাদকে প্রভাবিত করলে হয়তো সাময়িকভাবে লাভবান হওয়া যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে হারাতে হয় পাঠকের আস্থা। একজন সাংবাদিকের কাছে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতার চেয়ে বড় সম্পদ আর কিছু হতে পারে না।সাংবাদিকতাকে সময়ের সঙ্গে এগিয়ে নিতে হলে সাংবাদিককে হতে হবে জ্ঞানপিপাসু। প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করতে হবে। রাজনীতি, অর্থনীতি, আইন, প্রযুক্তি, পরিবেশ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা কিংবা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তথ্য যাচাই, তথ্যের উৎস শনাক্ত করা এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার জানাও এখন সাংবাদিকতার অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একজন সাংবাদিককে মনে রাখতে হবে, তিনি শুধু একটি সংবাদ প্রতিষ্ঠানের কর্মী নন। তিনি সমাজের মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে থাকা একজন পেশাজীবী। তার একটি প্রতিবেদন কোনো নির্যাতিত মানুষের কথা সমাজের সামনে তুলে ধরতে পারে, কোনো দুর্নীতি প্রকাশ্যে আনতে পারে, কোনো অনিয়ম বন্ধে ভূমিকা রাখতে পারে। আবার একটি ভুল প্রতিবেদনের কারণে একজন নির্দোষ মানুষও সামাজিকভাবে হেয় হতে পারেন।তাই সাংবাদিকের পরিচয় শুধু তার পদবি দিয়ে নয়, তার সততা, দায়িত্ববোধ, সাহস, নিরপেক্ষতা ও পেশাগত দক্ষতা দিয়ে নির্ধারিত হওয়া উচিত। সাংবাদিকতা যেন ব্যক্তিগত স্বার্থ, রাজনৈতিক আনুগত্য, অর্থের প্রলোভন কিংবা প্রতিষ্ঠানের চাপের কাছে হার না মানে। সংবাদমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা ধরে রাখতে হলে সাংবাদিককে সবার আগে দায়বদ্ধ থাকতে হবে সত্যের কাছে এবং মানুষের কাছে।আজকের সময়ে যখন গুজব খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, তখন দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার প্রয়োজন আরও বেড়েছে। একজন প্রকৃত সাংবাদিক খবরের পেছনে ছুটবেন, কিন্তু সত্যকে পেছনে ফেলবেন না। চাপ আসবে, সমালোচনা হবে, নানা ধরনের প্রলোভনও থাকবে। তারপরও যিনি নীতির জায়গা থেকে সরে যাবেন না, তিনিই প্রকৃত অর্থে সাংবাদিক।শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি তার গতি নয়, তার বিশ্বাসযোগ্যতা। কলমের শক্তি তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই কলম সত্যের পক্ষে দাঁড়ায় এবং মানুষের স্বার্থকে সবার আগে রাখে।লেখক- মোঃ সোহেল রানা প্রধান