সংস্কৃতি কেবল একগুচ্ছ আচার-অনুষ্ঠান বা উৎসবের সমষ্টি নয়, বরং এটি একটি জাতির হৃৎস্পন্দন এবং তার আত্মপরিচয়ের দর্পণ। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাকাইভারের ভাষায়, ‘Culture is what we are.’ অর্থাৎ আমরা যা, আমাদের বিশ্বাস ও যাপিত জীবনের প্রতিফলনই হলো সংস্কৃতি। কিন্তু বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে বাংলাদেশ এক ভয়াবহ ‘সাংস্কৃতিক আগ্রাসন’-এর মুখোমুখি, যা আমাদের জাতীয় স্বকীয়তাকে করে তুলছে অবরুদ্ধ। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘকালীন ঔপনিবেশিক ষড়যন্ত্র এবং সাম্রাজ্যবাদী চিন্তার এক বিষাক্ত ফসল।
খিলাফতের পতন ও বিশ্বজনীন সাংস্কৃতিক সংকট
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ১৯২৪ সালে উসমানীয় খিলাফতের পতনের পর মুসলিম বিশ্ব কেবল রাজনৈতিকভাবে এতিম হয়নি, বরং আত্মিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও চরম সংকটের মুখে পড়ে। খিলাফত ছিল মুসলিম উম্মাহর সাংস্কৃতিক ঢাল। এই ঢাল সরে যাওয়ার পর পশ্চিমা শক্তিগুলো ‘সাইকস-পিকট’ চুক্তির মাধ্যমে মুসলিম ভূখণ্ড ভাগ করে নেয় এবং আধুনিকতার নামে ভোগবাদ ও সেক্যুলার জীবনদর্শন চাপিয়ে দেয়। এটিই ছিল সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের প্রথম বিশ্বজনীন বিজয়।
কলোনিয়াল লিগ্যাসি: মেকলের প্রেতাত্মা ও হীনম্মন্যতা
১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর ব্রিটিশরা লর্ড মেকলের ১৮৩৫ সালের কুখ্যাত শিক্ষা প্রস্তাবের মাধ্যমে এক দীর্ঘস্থায়ী দাসত্বের বীজ বপন করে। মেকলের লক্ষ্য ছিল এমন এক শ্রেণি তৈরি করা, যারা ‘রক্তে ও বর্ণে ভারতীয় হলেও রুচি, মতবাদ, নৈতিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিতে হবে ইংরেজ’। আজও আমাদের শিক্ষিত সমাজের একটি বড় অংশ ইংরেজিতে কথা বলা বা পশ্চিমা পোশাক পরাকে শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক মনে করে, যা মূলত সেই কলোনিয়াল লিগ্যাসিরই প্রতিফলন।
সাহিত্যিক ও ভাষাগত আধিপত্য: কলকাতা-কেন্দ্রিক ‘শুদ্ধিকরণ’
বাংলার প্রেক্ষাপটে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের একটি সূক্ষ্ম রূপ হলো কলকাতা-কেন্দ্রিক সাহিত্যিক ও ভাষাগত মোড়লিপনা। দেশভাগের আগে ও পরে একটি বিশেষ বুদ্ধিজীবী শ্রেণি আমাদের জাতীয় স্বকীয়তাকে ভুলিয়ে দিতে চেয়েছে। ভাষার ক্ষেত্রে তারা ‘শুদ্ধিকরণ’-এর নামে শতাব্দীকাল ধরে ব্যবহৃত আরবি-ফারসি শব্দগুলোকে ‘অস্পৃশ্য’ ঘোষণা করেছে। বর্তমানে আমাদের গণমাধ্যমে ‘ইন্তেকাল’-এর বদলে ‘প্রয়াত’, ‘লাশ’-এর বদলে ‘মরদেহ’ বা ‘মুনাজাত’-এর বদলে ‘প্রার্থনা’ শব্দের ব্যবহার বাড়ছে। এই শব্দতাত্ত্বিক পরিবর্তন কেবল ব্যাকরণগত নয়, বরং এটি একটি জাতির ধর্মীয় বিশ্বাস ও হাজার বছরের ঐতিহ্যকে মগজ থেকে মুছে ফেলার গভীর ষড়যন্ত্র।
মিডিয়া ও পারিবারিক কাঠামোর বিনাশ
বর্তমান বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সবচেয়ে দৃশ্যমান ও ক্ষতিকর রূপ হলো বিদেশি স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর অবাধ বিচরণ। তথাকথিত ভারতীয় ‘সিরিয়াল’গুলোর মাধ্যমে পরকীয়া, পারিবারিক ষড়যন্ত্র এবং অহেতুক জাঁকজমকপূর্ণ উৎসবকে আধুনিকতা হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। ১৯৯৩ সালে আমেরিকান কংগ্রেসের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল—মুসলিম বিশ্বের সাফল্যের প্রধান অন্তরায় তাদের ‘পরিবার প্রথা’। আজ সেই পরিবার প্রথাকেই লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে, যার ফলে দেশে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদ ও পারিবারিক কলহ।

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
সংস্কৃতি কেবল একগুচ্ছ আচার-অনুষ্ঠান বা উৎসবের সমষ্টি নয়, বরং এটি একটি জাতির হৃৎস্পন্দন এবং তার আত্মপরিচয়ের দর্পণ। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাকাইভারের ভাষায়, ‘Culture is what we are.’ অর্থাৎ আমরা যা, আমাদের বিশ্বাস ও যাপিত জীবনের প্রতিফলনই হলো সংস্কৃতি। কিন্তু বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে বাংলাদেশ এক ভয়াবহ ‘সাংস্কৃতিক আগ্রাসন’-এর মুখোমুখি, যা আমাদের জাতীয় স্বকীয়তাকে করে তুলছে অবরুদ্ধ। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘকালীন ঔপনিবেশিক ষড়যন্ত্র এবং সাম্রাজ্যবাদী চিন্তার এক বিষাক্ত ফসল।
খিলাফতের পতন ও বিশ্বজনীন সাংস্কৃতিক সংকট
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ১৯২৪ সালে উসমানীয় খিলাফতের পতনের পর মুসলিম বিশ্ব কেবল রাজনৈতিকভাবে এতিম হয়নি, বরং আত্মিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও চরম সংকটের মুখে পড়ে। খিলাফত ছিল মুসলিম উম্মাহর সাংস্কৃতিক ঢাল। এই ঢাল সরে যাওয়ার পর পশ্চিমা শক্তিগুলো ‘সাইকস-পিকট’ চুক্তির মাধ্যমে মুসলিম ভূখণ্ড ভাগ করে নেয় এবং আধুনিকতার নামে ভোগবাদ ও সেক্যুলার জীবনদর্শন চাপিয়ে দেয়। এটিই ছিল সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের প্রথম বিশ্বজনীন বিজয়।
কলোনিয়াল লিগ্যাসি: মেকলের প্রেতাত্মা ও হীনম্মন্যতা
১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর ব্রিটিশরা লর্ড মেকলের ১৮৩৫ সালের কুখ্যাত শিক্ষা প্রস্তাবের মাধ্যমে এক দীর্ঘস্থায়ী দাসত্বের বীজ বপন করে। মেকলের লক্ষ্য ছিল এমন এক শ্রেণি তৈরি করা, যারা ‘রক্তে ও বর্ণে ভারতীয় হলেও রুচি, মতবাদ, নৈতিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিতে হবে ইংরেজ’। আজও আমাদের শিক্ষিত সমাজের একটি বড় অংশ ইংরেজিতে কথা বলা বা পশ্চিমা পোশাক পরাকে শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক মনে করে, যা মূলত সেই কলোনিয়াল লিগ্যাসিরই প্রতিফলন।
সাহিত্যিক ও ভাষাগত আধিপত্য: কলকাতা-কেন্দ্রিক ‘শুদ্ধিকরণ’
বাংলার প্রেক্ষাপটে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের একটি সূক্ষ্ম রূপ হলো কলকাতা-কেন্দ্রিক সাহিত্যিক ও ভাষাগত মোড়লিপনা। দেশভাগের আগে ও পরে একটি বিশেষ বুদ্ধিজীবী শ্রেণি আমাদের জাতীয় স্বকীয়তাকে ভুলিয়ে দিতে চেয়েছে। ভাষার ক্ষেত্রে তারা ‘শুদ্ধিকরণ’-এর নামে শতাব্দীকাল ধরে ব্যবহৃত আরবি-ফারসি শব্দগুলোকে ‘অস্পৃশ্য’ ঘোষণা করেছে। বর্তমানে আমাদের গণমাধ্যমে ‘ইন্তেকাল’-এর বদলে ‘প্রয়াত’, ‘লাশ’-এর বদলে ‘মরদেহ’ বা ‘মুনাজাত’-এর বদলে ‘প্রার্থনা’ শব্দের ব্যবহার বাড়ছে। এই শব্দতাত্ত্বিক পরিবর্তন কেবল ব্যাকরণগত নয়, বরং এটি একটি জাতির ধর্মীয় বিশ্বাস ও হাজার বছরের ঐতিহ্যকে মগজ থেকে মুছে ফেলার গভীর ষড়যন্ত্র।
মিডিয়া ও পারিবারিক কাঠামোর বিনাশ
বর্তমান বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সবচেয়ে দৃশ্যমান ও ক্ষতিকর রূপ হলো বিদেশি স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর অবাধ বিচরণ। তথাকথিত ভারতীয় ‘সিরিয়াল’গুলোর মাধ্যমে পরকীয়া, পারিবারিক ষড়যন্ত্র এবং অহেতুক জাঁকজমকপূর্ণ উৎসবকে আধুনিকতা হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। ১৯৯৩ সালে আমেরিকান কংগ্রেসের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল—মুসলিম বিশ্বের সাফল্যের প্রধান অন্তরায় তাদের ‘পরিবার প্রথা’। আজ সেই পরিবার প্রথাকেই লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে, যার ফলে দেশে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদ ও পারিবারিক কলহ।

আপনার মতামত লিখুন