বাংলাদেশে ইসলামের আগমন কি কেবল সামরিক বিজয়ের পথেই হয়েছিল? মুন্সীগঞ্জের সুজানগরে প্রাপ্ত একটি সাড়ে আট শো বছরের পুরোনো শিলালিপি সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে। প্রত্নতাত্ত্বিক এই দলিল বলছে, ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দে তুর্কি বিজয়ের অনেক আগে, বর্তমান বাংলাদেশের বিক্রমপুর অঞ্চলে একটি ইসলামি প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান ছিল।
শিলালিপিটিতে একটি অদ্ভুত সংস্কৃত যৌগশব্দ রয়েছে: "আল্লাভট্টারকস্বামীজনসিতবিহার"। এখানে 'আল্লা' শব্দটি স্পষ্টতই 'আল্লাহ'-র সংস্কৃতীকৃত রূপ, আর 'ভট্টারক' ও 'স্বামী' হলো সংস্কৃত সম্মানসূচক উপাধি। অর্থাৎ হিন্দু রাজার সংস্কৃত দলিলে আল্লাহর নামকে সম্মানের সঙ্গে অভিহিত করা হয়েছে। শব্দটি একটি মসজিদ এবং সম্ভবত একটি মাদরাসাসদৃশ প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ করে বলে মনে করেন টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ রিওসুকে ফুরুই।
শিলালিপিটি বর্মণ রাজবংশের রাজা ভোজবর্মণের রাজত্বকালের (আনুমানিক ১১৩৭-১১৪৫ খ্রিষ্টাব্দ)। তৎকালীন বঙ্গের ঢাকা-বিক্রমপুর-ফরিদপুর অঞ্চলের এই শাসক ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ বৈষ্ণব। তবুও তার রাজত্বের সপ্তম বছরে তিনি ওই ইসলামি প্রতিষ্ঠানে কড়ি আকারে আর্থিক অনুদান অনুমোদন করেছিলেন। এই উদ্যোগটি এসেছিল তার অধস্তন শাসক অভুদেবের কাছ থেকে, যার নামের মূল 'অভু' শব্দটি আরবি 'আবু'-র সংস্কৃত রূপ বলে গবেষকরা মনে করেন।
১৯৬৪ সালে মুন্সীগঞ্জের সুজানগরে আবিষ্কৃত এই সাত লাইনের শিলালিপিটি বর্তমানে ঢাকার বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। ২০১০ সালে মরহুম শরিফুল ইসলাম প্রথম এটি অনুবাদ করেন। পরে ২০১৯ সালে ফুরুই আরও উন্নত ও বিস্তারিত পাঠ উপস্থাপন করেন।
গবেষকরা বলছেন, এই মুসলমানরা বিজয়ী হিসেবে নয়, বরং বণিক হিসেবে এই ভূখণ্ডে এসেছিলেন। আরবি ও ফারসি গ্রন্থে বারবার উল্লেখিত সমন্দর বন্দর, যা বর্তমান চট্টগ্রামের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেখান দিয়ে বিদেশি মুসলিম বণিকদের আনাগোনা ছিল। বৈষ্ণব ও বৌদ্ধ ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত বর্মণ সমাজ তাদের সানন্দে আশ্রয় দিয়েছিল।
একই ধরনের সহাবস্থানের প্রমাণ মেলে উপমহাদেশের অন্যত্রও। নবম শতাব্দীর কেরালায় চেরা রাজা একটি সিরীয় খ্রিষ্টান গির্জাকে ভূমি অনুদান দিয়েছিলেন। ১২৬৪ সালের গুজরাটের সোমনাথের শিলালিপিতে দেখা যায়, একজন মুসলিম জাহাজ মালিকের নির্মিত মসজিদের জন্য জমি অনুমোদন করেছিলেন স্থানীয় শৈব পরিষদ। সেই শিলালিপি আল্লাহকে "বিশ্বরূপ" ও "বিশ্বনাথ" বলে অভিহিত করেছিল।
লেখক রণবীর চক্রবর্তী, সেন্টার ফর হিস্টোরিক্যাল স্টাডিজের সাবেক অধ্যাপক এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ভিজিটিং স্কলার, তার বিশ্লেষণে বলেছেন, এই শিলালিপিগুলো প্রমাণ করে যে প্রাচীন ভারতীয় সমাজ কোনো বাইরের গোষ্ঠীকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেনি। সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ ছিল সেই সমাজের স্বাভাবিক জীবনযাপনের অংশ। তিনি সতর্ক করেছেন, এই ঐতিহ্যকে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের নামে মুছে ফেলার যেকোনো প্রয়াস ইতিহাসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার নামান্তর।

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ মার্চ ২০২৬
বাংলাদেশে ইসলামের আগমন কি কেবল সামরিক বিজয়ের পথেই হয়েছিল? মুন্সীগঞ্জের সুজানগরে প্রাপ্ত একটি সাড়ে আট শো বছরের পুরোনো শিলালিপি সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে। প্রত্নতাত্ত্বিক এই দলিল বলছে, ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দে তুর্কি বিজয়ের অনেক আগে, বর্তমান বাংলাদেশের বিক্রমপুর অঞ্চলে একটি ইসলামি প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান ছিল।
শিলালিপিটিতে একটি অদ্ভুত সংস্কৃত যৌগশব্দ রয়েছে: "আল্লাভট্টারকস্বামীজনসিতবিহার"। এখানে 'আল্লা' শব্দটি স্পষ্টতই 'আল্লাহ'-র সংস্কৃতীকৃত রূপ, আর 'ভট্টারক' ও 'স্বামী' হলো সংস্কৃত সম্মানসূচক উপাধি। অর্থাৎ হিন্দু রাজার সংস্কৃত দলিলে আল্লাহর নামকে সম্মানের সঙ্গে অভিহিত করা হয়েছে। শব্দটি একটি মসজিদ এবং সম্ভবত একটি মাদরাসাসদৃশ প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ করে বলে মনে করেন টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ রিওসুকে ফুরুই।
শিলালিপিটি বর্মণ রাজবংশের রাজা ভোজবর্মণের রাজত্বকালের (আনুমানিক ১১৩৭-১১৪৫ খ্রিষ্টাব্দ)। তৎকালীন বঙ্গের ঢাকা-বিক্রমপুর-ফরিদপুর অঞ্চলের এই শাসক ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ বৈষ্ণব। তবুও তার রাজত্বের সপ্তম বছরে তিনি ওই ইসলামি প্রতিষ্ঠানে কড়ি আকারে আর্থিক অনুদান অনুমোদন করেছিলেন। এই উদ্যোগটি এসেছিল তার অধস্তন শাসক অভুদেবের কাছ থেকে, যার নামের মূল 'অভু' শব্দটি আরবি 'আবু'-র সংস্কৃত রূপ বলে গবেষকরা মনে করেন।
১৯৬৪ সালে মুন্সীগঞ্জের সুজানগরে আবিষ্কৃত এই সাত লাইনের শিলালিপিটি বর্তমানে ঢাকার বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। ২০১০ সালে মরহুম শরিফুল ইসলাম প্রথম এটি অনুবাদ করেন। পরে ২০১৯ সালে ফুরুই আরও উন্নত ও বিস্তারিত পাঠ উপস্থাপন করেন।
গবেষকরা বলছেন, এই মুসলমানরা বিজয়ী হিসেবে নয়, বরং বণিক হিসেবে এই ভূখণ্ডে এসেছিলেন। আরবি ও ফারসি গ্রন্থে বারবার উল্লেখিত সমন্দর বন্দর, যা বর্তমান চট্টগ্রামের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেখান দিয়ে বিদেশি মুসলিম বণিকদের আনাগোনা ছিল। বৈষ্ণব ও বৌদ্ধ ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত বর্মণ সমাজ তাদের সানন্দে আশ্রয় দিয়েছিল।
একই ধরনের সহাবস্থানের প্রমাণ মেলে উপমহাদেশের অন্যত্রও। নবম শতাব্দীর কেরালায় চেরা রাজা একটি সিরীয় খ্রিষ্টান গির্জাকে ভূমি অনুদান দিয়েছিলেন। ১২৬৪ সালের গুজরাটের সোমনাথের শিলালিপিতে দেখা যায়, একজন মুসলিম জাহাজ মালিকের নির্মিত মসজিদের জন্য জমি অনুমোদন করেছিলেন স্থানীয় শৈব পরিষদ। সেই শিলালিপি আল্লাহকে "বিশ্বরূপ" ও "বিশ্বনাথ" বলে অভিহিত করেছিল।
লেখক রণবীর চক্রবর্তী, সেন্টার ফর হিস্টোরিক্যাল স্টাডিজের সাবেক অধ্যাপক এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ভিজিটিং স্কলার, তার বিশ্লেষণে বলেছেন, এই শিলালিপিগুলো প্রমাণ করে যে প্রাচীন ভারতীয় সমাজ কোনো বাইরের গোষ্ঠীকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেনি। সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ ছিল সেই সমাজের স্বাভাবিক জীবনযাপনের অংশ। তিনি সতর্ক করেছেন, এই ঐতিহ্যকে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের নামে মুছে ফেলার যেকোনো প্রয়াস ইতিহাসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার নামান্তর।

আপনার মতামত লিখুন