ঢাকা    বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শামের দিকে খেলাফতের অগ্রযাত্রা: ইতিহাসের এক নির্ণায়ক মোড়


নিজস্ব প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০২৬

শামের দিকে খেলাফতের অগ্রযাত্রা: ইতিহাসের এক নির্ণায়ক মোড়

রিদ্দার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে খলিফা আবু বকর (রা.) যখন সপ্তম শতাব্দীর তৃতীয় দশকে আরবের একত্রিত শক্তিকে উত্তরমুখী করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাঁর সামনে লক্ষ্য ছিল বৃহত্তর শাম অঞ্চল, যেটি সেই যুগের ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে এক অসাধারণ কৌশলগত গুরুত্ব বহন করত।

বৃহত্তর শাম বলতে শুধু আজকের সিরিয়াকে বোঝানো হয় না। বর্তমান সিরিয়া, ফিলিস্তিন, জর্ডান এবং লেবাননকে একত্রে ধারণ করা এই বিশাল অঞ্চলটি ছিল এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের সংযোগস্থল। প্রাচীন রেশমপথ এবং ধূপপথ এই অঞ্চলের বুক চিরে পারস্য ও রোম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর এবং পূর্বে সিরীয় মরুভূমির মাঝে উর্বর এই করিডোরটি প্রতিটি সাম্রাজ্যের কাছেই ছিল অমূল্য সম্পদ।

প্রশাসনিক কাঠামোর দিক থেকে শাম চারটি জান্দে বিভক্ত ছিল। দামেস্ককেন্দ্রিক জান্দ দিমাশক, মধ্য সিরিয়ায় জান্দ হিমস, উত্তর জর্ডান ও উত্তর ফিলিস্তিন নিয়ে গঠিত জান্দ আল উরদুন এবং দক্ষিণ ফিলিস্তিন ও উপকূলীয় অঞ্চল নিয়ে জান্দ ফিলিস্তিন। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের জন্য শাম ছিল রুটির ঝুড়ি। জর্ডান ও ওরোন্টেস নদীর পানিতে সিক্ত এই শস্যশ্যামল ভূমি সাম্রাজ্যের বিশাল সেনাবাহিনীর রসদ জোগাত।

মুসলিমদের কাছে শামের ধর্মীয় মর্যাদাও কম ছিল না। কোরআন ও হাদিসে বারবার এই অঞ্চলকে বরকতময় ভূমি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইব্রাহিম, মুসা ও ঈসা (আ.)-সহ অনেক নবী এই মাটিতে তাঁদের দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন। মুসলিমদের প্রথম কিবলা এবং রাসুল (সা.)-এর মিরাজ ভ্রমণের প্রারম্ভিক স্থান মসজিদুল আকসাও এই শামেরই অংশ।

অপরদিকে সপ্তম শতাব্দীর শুরুতে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। ৬০২ থেকে ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সাসানীয় পারস্যের বিরুদ্ধে প্রায় ২৬ বছর ধরে চলা যুদ্ধকে আধুনিক ঐতিহাসিকরা প্রাচীনকালের বিশ্বযুদ্ধ বলে অভিহিত করেন। সম্রাট হেরাক্লিয়াস শেষ পর্যন্ত পারস্যের রাজধানী তিসফুন পর্যন্ত পৌঁছে বিজয় ছিনিয়ে নেন এবং হারানো শাম পুনরুদ্ধার করেন। কিন্তু এই বিজয়ের মূল্য ছিল অত্যন্ত চড়া।

সংঘর্ষের দীর্ঘ ক্লান্তিতে বাইজেন্টাইন কোষাগার তখন প্রায় শূন্য। সৈন্যদের নিয়মিত বেতন দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না। আরব সীমান্তে রক্ষক হিসেবে নিয়োজিত ঘাসানিদ মিত্রদের আর্থিক অনুদান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারাও বাইজেন্টাইনদের প্রতি আনুগত্য শিথিল করে দেয়। ফলে সীমান্তে এক বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়।

বাইজেন্টাইনদের দুর্বলতার আরও একটি কারণ ছিল অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় বিভাজন। কনস্টান্টিনোপলের রাষ্ট্রীয় গির্জার সঙ্গে শামের মনোফিজাইট খ্রিষ্টানদের বিশ্বাসগত বিরোধ ছিল প্রকট। সম্রাট হেরাক্লিয়াস জোর করে ধর্মীয় ঐক্য আরোপ করতে গিয়ে স্থানীয় সিরীয় ও মিসরীয় খ্রিষ্টানদের মনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করেন। ফ্রেড ডোনারসহ আধুনিক ঐতিহাসিকরা মনে করেন, এই ধর্মীয় ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতাই মুসলিম বাহিনীর দ্রুত অগ্রগতির পথকে সুগম করে দিয়েছিল।

শাম অভিযানের পেছনে আবু বকর (রা.)-এর নিরাপত্তা ভাবনাও সক্রিয় ছিল। বাইজেন্টাইনরা আরবের উত্তর সীমান্ত থেকে মদিনার ওপর আঘাত হানার পরিকল্পনা করত। মুতা ও তাবুক অভিযানের স্মৃতি তখনো জীবন্ত। মদিনাকে স্থায়ীভাবে নিরাপদ রাখতে উত্তরের এই হুমকিকে স্থায়ীভাবে নিষ্ক্রিয় করার বিকল্প ছিল না।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের আগে উসামা বিন জায়দ (রা.)-এর নেতৃত্বে শামের দিকে বাহিনী প্রেরণের যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তা পূর্ণ করাও আবু বকর (রা.)-এর কাছে বিশেষ দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। চারদিক থেকে বিদ্রোহের হুমকি সত্ত্বেও তিনি সেই বাহিনীকে রওনা করতে অটল ছিলেন।

শামের ওপর কুরাইশদের বাণিজ্যিক স্বার্থও ছিল গভীর। কুরাইশদের শীত ও গ্রীষ্মকালীন বাণিজ্য সফর শামের বাজারগুলোকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতো। তাই শামে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা মানে শুধু সামরিক নিরাপত্তা নয়, আরবের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎও নিশ্চিত করা। এই সামরিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলোর সমন্বয়ে শাম পরিণত হয়েছিল খেলাফতের প্রথম বড় অভিযানের অনিবার্য গন্তব্যে।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬


শামের দিকে খেলাফতের অগ্রযাত্রা: ইতিহাসের এক নির্ণায়ক মোড়

প্রকাশের তারিখ : ০৯ মার্চ ২০২৬

featured Image

রিদ্দার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে খলিফা আবু বকর (রা.) যখন সপ্তম শতাব্দীর তৃতীয় দশকে আরবের একত্রিত শক্তিকে উত্তরমুখী করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাঁর সামনে লক্ষ্য ছিল বৃহত্তর শাম অঞ্চল, যেটি সেই যুগের ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে এক অসাধারণ কৌশলগত গুরুত্ব বহন করত।

বৃহত্তর শাম বলতে শুধু আজকের সিরিয়াকে বোঝানো হয় না। বর্তমান সিরিয়া, ফিলিস্তিন, জর্ডান এবং লেবাননকে একত্রে ধারণ করা এই বিশাল অঞ্চলটি ছিল এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের সংযোগস্থল। প্রাচীন রেশমপথ এবং ধূপপথ এই অঞ্চলের বুক চিরে পারস্য ও রোম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর এবং পূর্বে সিরীয় মরুভূমির মাঝে উর্বর এই করিডোরটি প্রতিটি সাম্রাজ্যের কাছেই ছিল অমূল্য সম্পদ।

প্রশাসনিক কাঠামোর দিক থেকে শাম চারটি জান্দে বিভক্ত ছিল। দামেস্ককেন্দ্রিক জান্দ দিমাশক, মধ্য সিরিয়ায় জান্দ হিমস, উত্তর জর্ডান ও উত্তর ফিলিস্তিন নিয়ে গঠিত জান্দ আল উরদুন এবং দক্ষিণ ফিলিস্তিন ও উপকূলীয় অঞ্চল নিয়ে জান্দ ফিলিস্তিন। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের জন্য শাম ছিল রুটির ঝুড়ি। জর্ডান ও ওরোন্টেস নদীর পানিতে সিক্ত এই শস্যশ্যামল ভূমি সাম্রাজ্যের বিশাল সেনাবাহিনীর রসদ জোগাত।

মুসলিমদের কাছে শামের ধর্মীয় মর্যাদাও কম ছিল না। কোরআন ও হাদিসে বারবার এই অঞ্চলকে বরকতময় ভূমি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইব্রাহিম, মুসা ও ঈসা (আ.)-সহ অনেক নবী এই মাটিতে তাঁদের দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন। মুসলিমদের প্রথম কিবলা এবং রাসুল (সা.)-এর মিরাজ ভ্রমণের প্রারম্ভিক স্থান মসজিদুল আকসাও এই শামেরই অংশ।

অপরদিকে সপ্তম শতাব্দীর শুরুতে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। ৬০২ থেকে ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সাসানীয় পারস্যের বিরুদ্ধে প্রায় ২৬ বছর ধরে চলা যুদ্ধকে আধুনিক ঐতিহাসিকরা প্রাচীনকালের বিশ্বযুদ্ধ বলে অভিহিত করেন। সম্রাট হেরাক্লিয়াস শেষ পর্যন্ত পারস্যের রাজধানী তিসফুন পর্যন্ত পৌঁছে বিজয় ছিনিয়ে নেন এবং হারানো শাম পুনরুদ্ধার করেন। কিন্তু এই বিজয়ের মূল্য ছিল অত্যন্ত চড়া।

সংঘর্ষের দীর্ঘ ক্লান্তিতে বাইজেন্টাইন কোষাগার তখন প্রায় শূন্য। সৈন্যদের নিয়মিত বেতন দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না। আরব সীমান্তে রক্ষক হিসেবে নিয়োজিত ঘাসানিদ মিত্রদের আর্থিক অনুদান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারাও বাইজেন্টাইনদের প্রতি আনুগত্য শিথিল করে দেয়। ফলে সীমান্তে এক বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়।

বাইজেন্টাইনদের দুর্বলতার আরও একটি কারণ ছিল অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় বিভাজন। কনস্টান্টিনোপলের রাষ্ট্রীয় গির্জার সঙ্গে শামের মনোফিজাইট খ্রিষ্টানদের বিশ্বাসগত বিরোধ ছিল প্রকট। সম্রাট হেরাক্লিয়াস জোর করে ধর্মীয় ঐক্য আরোপ করতে গিয়ে স্থানীয় সিরীয় ও মিসরীয় খ্রিষ্টানদের মনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করেন। ফ্রেড ডোনারসহ আধুনিক ঐতিহাসিকরা মনে করেন, এই ধর্মীয় ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতাই মুসলিম বাহিনীর দ্রুত অগ্রগতির পথকে সুগম করে দিয়েছিল।

শাম অভিযানের পেছনে আবু বকর (রা.)-এর নিরাপত্তা ভাবনাও সক্রিয় ছিল। বাইজেন্টাইনরা আরবের উত্তর সীমান্ত থেকে মদিনার ওপর আঘাত হানার পরিকল্পনা করত। মুতা ও তাবুক অভিযানের স্মৃতি তখনো জীবন্ত। মদিনাকে স্থায়ীভাবে নিরাপদ রাখতে উত্তরের এই হুমকিকে স্থায়ীভাবে নিষ্ক্রিয় করার বিকল্প ছিল না।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের আগে উসামা বিন জায়দ (রা.)-এর নেতৃত্বে শামের দিকে বাহিনী প্রেরণের যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তা পূর্ণ করাও আবু বকর (রা.)-এর কাছে বিশেষ দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। চারদিক থেকে বিদ্রোহের হুমকি সত্ত্বেও তিনি সেই বাহিনীকে রওনা করতে অটল ছিলেন।

শামের ওপর কুরাইশদের বাণিজ্যিক স্বার্থও ছিল গভীর। কুরাইশদের শীত ও গ্রীষ্মকালীন বাণিজ্য সফর শামের বাজারগুলোকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতো। তাই শামে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা মানে শুধু সামরিক নিরাপত্তা নয়, আরবের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎও নিশ্চিত করা। এই সামরিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলোর সমন্বয়ে শাম পরিণত হয়েছিল খেলাফতের প্রথম বড় অভিযানের অনিবার্য গন্তব্যে।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০২৪১০৯১৭৩০
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: 01711-070054

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ