বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে যৌনাঙ্গ আক্রান্তকারী পরজীবী রোগ ‘স্নেইল ফিভার’। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, পরজীবীটির নতুন রূপ বা হাইব্রিড ধরন শনাক্তে জটিলতা বাড়াচ্ছে এবং এতে রোগ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে উঠছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, পরিস্থিতি এখন বৈশ্বিক উদ্বেগের পর্যায়ে পৌঁছেছে।
‘স্নেইল ফিভার’ নামে পরিচিত এই পরজীবী ত্বকের ভেতর দিয়ে মানবদেহে প্রবেশ করে রক্তে নীরবে অবস্থান নেয়। পরবর্তীতে এটি ডিম পাড়ে, যা লিভার, ফুসফুস ও যৌনাঙ্গসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে জমা হতে পারে। দীর্ঘদিন—এমনকি বছরের পর বছর—শরীরে অবস্থান করলেও অনেক ক্ষেত্রে রোগটি শনাক্ত হয় না। শামুকের মাধ্যমে ছড়ায় বলে রোগটির নামকরণ করা হয়েছে ‘স্নেইল ফিভার’।
বিশেষ এক ধরনের শামুক এই পরজীবী বহন করে। শামুক বসবাসকারী পানিতে পরজীবীর লার্ভা ছড়িয়ে পড়ে। কেউ ওই পানির সংস্পর্শে এলে বা গোসল করলে লার্ভাগুলো এনজাইম নিঃসরণ করে ত্বক ভেদ করে শরীরে প্রবেশ করে। পরে সেগুলো পূর্ণবয়স্ক কৃমিতে পরিণত হয়ে রক্তনালিতে বসবাস শুরু করে। স্ত্রী কৃমি ডিম পাড়ে; কিছু ডিম মল বা প্রস্রাবের সঙ্গে বের হলেও অনেক ডিম শরীরের টিস্যুতে আটকে যায়। এতে রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বিভিন্ন অঙ্গের মারাত্মক ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ে। তলপেট ও যৌনাঙ্গে ডিম জমে থাকলে তাকে বলা হয় ইউরোজেনিটাল স্কিস্টোসোমিয়াসিস—যার ফলে ক্যানসার ও মৃত্যুঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
শনাক্তে জটিলতা, বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি :
বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরজীবীটির গঠন ও বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তনের কারণে নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমন সময় এই সতর্কতা এলো, যখন ৩০ জানুয়ারি ‘ওয়ার্ল্ড নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিজ ডে’ পালন করছে ডব্লিউএইচও। দিবসটির লক্ষ্য—ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী ও ছত্রাকজনিত উপেক্ষিত রোগগুলোর দিকে বৈশ্বিক দৃষ্টি আকর্ষণ, যা সাধারণত দরিদ্র অঞ্চলের শত কোটিরও বেশি মানুষকে আক্রান্ত করে।
মালাউই লিভারপুল ওয়েলকাম ক্লিনিক্যাল রিসার্চ প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক অধ্যাপক জানেলিসা মুসায়া জানান, স্নেইল ফিভারের নতুন কিছু ধরন প্রচলিত পরীক্ষায় ধরা নাও পড়তে পারে। হাইব্রিড পরজীবীর ডিম মাইক্রোস্কোপে সাধারণ ডিমের মতো দেখায় না, ফলে উপসর্গ ভুলভাবে যৌনবাহিত রোগ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
হাইব্রিড পরজীবীর নতুন হুমকি :
গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের শরীরের পরজীবী ও প্রাণীর শরীরের পরজীবী একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়ে নতুন ‘হাইব্রিড’ ধরন তৈরি করছে। এসব হাইব্রিড মানুষ ও প্রাণী—উভয়কেই আক্রান্ত করতে পারে, ফলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ আরও জটিল হয়ে উঠছে। মালাউইর কয়েকটি এলাকায় মানুষ ও প্রাণী থেকে সংগৃহীত নমুনায় সাত শতাংশ পরজীবী হাইব্রিড হিসেবে শনাক্ত হয়েছে, যা প্রত্যাশার তুলনায় বেশি।
অধ্যাপক মুসায়া সতর্ক করে বলেন, গবেষণা সীমিত এলাকায় হলেও এটি ‘হিমশৈলের চূড়া’ হতে পারে। প্রকৃত সংক্রমণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, কারণ অনেক ক্ষেত্রেই রোগ শনাক্ত হচ্ছে না।
নারীদের জন্য ঝুঁকি বেশি :
গবেষণায় দেখা গেছে, হাইব্রিড পরজীবী নারীদের যৌনাঙ্গে সংক্রমণ ঘটালেও তা সহজে শনাক্ত করা যায় না। চিকিৎসা না হলে যৌনাঙ্গে ক্ষত, বন্ধ্যত্ব এবং এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে এর সামাজিক ও মানসিক প্রভাবও গভীর। সন্তান ধারণে ব্যর্থতা অনেক সমাজে নারীদের জন্য গুরুতর সামাজিক চাপ তৈরি করে।
বৈশ্বিক বিস্তার ও ডব্লিউএইচও’র প্রস্তুতি :
বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও অভিবাসনের ফলে হাইব্রিড পরজীবী নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। দক্ষিণ ইউরোপের কিছু এলাকায় ইতিমধ্যে এ ধরনের সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে।
ডব্লিউএইচও’র স্কিস্টোসোমিয়াসিস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির প্রধান ডা. আমাদু গারবা জিরমে বলেন, রোগটি এখন বৈশ্বিক উদ্বেগ এবং এর ফলে নির্মূল লক্ষ্যে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। কিছু দেশে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ কমলেও প্রাণীদের শরীরে পরজীবী রয়ে গেছে, যা ভবিষ্যতে মানুষের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই নতুন হুমকি মোকাবিলায় ডব্লিউএইচও কৌশল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চলতি বছর প্রাণীদের মধ্যে রোগ নিয়ন্ত্রণে নতুন নির্দেশনা দেওয়ার কথা রয়েছে। ২০০৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক ওষুধ বিতরণের ফলে সংক্রমণ ৬০ শতাংশ কমলেও সংস্থাটি সতর্ক করেছে—২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে উপেক্ষিত ট্রপিক্যাল রোগ খাতে সহায়তা ৪১ শতাংশ কমে যাওয়ায় অগ্রগতি হুমকির মুখে পড়েছে।

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে যৌনাঙ্গ আক্রান্তকারী পরজীবী রোগ ‘স্নেইল ফিভার’। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, পরজীবীটির নতুন রূপ বা হাইব্রিড ধরন শনাক্তে জটিলতা বাড়াচ্ছে এবং এতে রোগ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে উঠছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, পরিস্থিতি এখন বৈশ্বিক উদ্বেগের পর্যায়ে পৌঁছেছে।
‘স্নেইল ফিভার’ নামে পরিচিত এই পরজীবী ত্বকের ভেতর দিয়ে মানবদেহে প্রবেশ করে রক্তে নীরবে অবস্থান নেয়। পরবর্তীতে এটি ডিম পাড়ে, যা লিভার, ফুসফুস ও যৌনাঙ্গসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে জমা হতে পারে। দীর্ঘদিন—এমনকি বছরের পর বছর—শরীরে অবস্থান করলেও অনেক ক্ষেত্রে রোগটি শনাক্ত হয় না। শামুকের মাধ্যমে ছড়ায় বলে রোগটির নামকরণ করা হয়েছে ‘স্নেইল ফিভার’।
বিশেষ এক ধরনের শামুক এই পরজীবী বহন করে। শামুক বসবাসকারী পানিতে পরজীবীর লার্ভা ছড়িয়ে পড়ে। কেউ ওই পানির সংস্পর্শে এলে বা গোসল করলে লার্ভাগুলো এনজাইম নিঃসরণ করে ত্বক ভেদ করে শরীরে প্রবেশ করে। পরে সেগুলো পূর্ণবয়স্ক কৃমিতে পরিণত হয়ে রক্তনালিতে বসবাস শুরু করে। স্ত্রী কৃমি ডিম পাড়ে; কিছু ডিম মল বা প্রস্রাবের সঙ্গে বের হলেও অনেক ডিম শরীরের টিস্যুতে আটকে যায়। এতে রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বিভিন্ন অঙ্গের মারাত্মক ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ে। তলপেট ও যৌনাঙ্গে ডিম জমে থাকলে তাকে বলা হয় ইউরোজেনিটাল স্কিস্টোসোমিয়াসিস—যার ফলে ক্যানসার ও মৃত্যুঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
শনাক্তে জটিলতা, বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি :
বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরজীবীটির গঠন ও বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তনের কারণে নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমন সময় এই সতর্কতা এলো, যখন ৩০ জানুয়ারি ‘ওয়ার্ল্ড নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিজ ডে’ পালন করছে ডব্লিউএইচও। দিবসটির লক্ষ্য—ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী ও ছত্রাকজনিত উপেক্ষিত রোগগুলোর দিকে বৈশ্বিক দৃষ্টি আকর্ষণ, যা সাধারণত দরিদ্র অঞ্চলের শত কোটিরও বেশি মানুষকে আক্রান্ত করে।
মালাউই লিভারপুল ওয়েলকাম ক্লিনিক্যাল রিসার্চ প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক অধ্যাপক জানেলিসা মুসায়া জানান, স্নেইল ফিভারের নতুন কিছু ধরন প্রচলিত পরীক্ষায় ধরা নাও পড়তে পারে। হাইব্রিড পরজীবীর ডিম মাইক্রোস্কোপে সাধারণ ডিমের মতো দেখায় না, ফলে উপসর্গ ভুলভাবে যৌনবাহিত রোগ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
হাইব্রিড পরজীবীর নতুন হুমকি :
গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের শরীরের পরজীবী ও প্রাণীর শরীরের পরজীবী একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়ে নতুন ‘হাইব্রিড’ ধরন তৈরি করছে। এসব হাইব্রিড মানুষ ও প্রাণী—উভয়কেই আক্রান্ত করতে পারে, ফলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ আরও জটিল হয়ে উঠছে। মালাউইর কয়েকটি এলাকায় মানুষ ও প্রাণী থেকে সংগৃহীত নমুনায় সাত শতাংশ পরজীবী হাইব্রিড হিসেবে শনাক্ত হয়েছে, যা প্রত্যাশার তুলনায় বেশি।
অধ্যাপক মুসায়া সতর্ক করে বলেন, গবেষণা সীমিত এলাকায় হলেও এটি ‘হিমশৈলের চূড়া’ হতে পারে। প্রকৃত সংক্রমণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, কারণ অনেক ক্ষেত্রেই রোগ শনাক্ত হচ্ছে না।
নারীদের জন্য ঝুঁকি বেশি :
গবেষণায় দেখা গেছে, হাইব্রিড পরজীবী নারীদের যৌনাঙ্গে সংক্রমণ ঘটালেও তা সহজে শনাক্ত করা যায় না। চিকিৎসা না হলে যৌনাঙ্গে ক্ষত, বন্ধ্যত্ব এবং এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে এর সামাজিক ও মানসিক প্রভাবও গভীর। সন্তান ধারণে ব্যর্থতা অনেক সমাজে নারীদের জন্য গুরুতর সামাজিক চাপ তৈরি করে।
বৈশ্বিক বিস্তার ও ডব্লিউএইচও’র প্রস্তুতি :
বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও অভিবাসনের ফলে হাইব্রিড পরজীবী নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। দক্ষিণ ইউরোপের কিছু এলাকায় ইতিমধ্যে এ ধরনের সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে।
ডব্লিউএইচও’র স্কিস্টোসোমিয়াসিস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির প্রধান ডা. আমাদু গারবা জিরমে বলেন, রোগটি এখন বৈশ্বিক উদ্বেগ এবং এর ফলে নির্মূল লক্ষ্যে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। কিছু দেশে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ কমলেও প্রাণীদের শরীরে পরজীবী রয়ে গেছে, যা ভবিষ্যতে মানুষের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই নতুন হুমকি মোকাবিলায় ডব্লিউএইচও কৌশল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চলতি বছর প্রাণীদের মধ্যে রোগ নিয়ন্ত্রণে নতুন নির্দেশনা দেওয়ার কথা রয়েছে। ২০০৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক ওষুধ বিতরণের ফলে সংক্রমণ ৬০ শতাংশ কমলেও সংস্থাটি সতর্ক করেছে—২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে উপেক্ষিত ট্রপিক্যাল রোগ খাতে সহায়তা ৪১ শতাংশ কমে যাওয়ায় অগ্রগতি হুমকির মুখে পড়েছে।

আপনার মতামত লিখুন