ঢাকা    মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সামান্য গলাব্যথাই ডেকে আনতে পারে স্থায়ী হৃদরোগ


নিজস্ব প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৬

সামান্য গলাব্যথাই ডেকে আনতে পারে স্থায়ী হৃদরোগ

শিশুর গলা ব্যথাকে তুচ্ছ ভেবে অবহেলা করলে তা একদিন স্থায়ী হৃদরোগে পরিণত হতে পারে। এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজের কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ। তিনি বলছেন, বাংলাদেশে শিশু ও কিশোরদের মধ্যে রিউম্যাটিক জ্বর এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে এবং যথাযথ সচেতনতার অভাবে এটি মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনছে।

চিকিৎসকদের মতে, সাধারণত গ্রুপ 'এ' বিটা-হেমোলাইটিক স্ট্রেপটোকক্কাস নামের একটি বিশেষ জীবাণু গলায় সংক্রমণ ঘটায়। এই সংক্রমণের দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধব্যবস্থা ভুলক্রমে নিজের শরীরের বিরুদ্ধেই কাজ করতে শুরু করে। হৃদপিণ্ড, জয়েন্ট, ত্বক বা স্নায়ুতন্ত্রে এই আক্রমণের ফলে দেখা দেয় রিউম্যাটিক জ্বর। সময়মতো চিকিৎসা না হলে এই জ্বর পরিণতিতে হৃদপিণ্ডের ভালভ নষ্ট করে দিতে পারে, যা রিউম্যাটিক হার্ট ডিজিজ নামে পরিচিত।

রোগের লক্ষণ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ জানান, এক জয়েন্ট থেকে অন্য জয়েন্টে ঘুরে বেড়ানো ব্যথা ও ফোলা, ক্রমাগত জ্বর এবং বুক ধড়ফড় বা শ্বাসকষ্ট প্রধান লক্ষণ হিসেবে দেখা দেয়। হাত-পা অস্বাভাবিকভাবে নড়ে ওঠার মতো উপসর্গও কখনো কখনো দেখা যায়, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে কোরিয়া বলা হয়। তবে সবচেয়ে ভয়ংকর পরিণতি হলো হৃদপিণ্ডের ভালভ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, যা একবার হলে সারাজীবন ভোগান্তি পোহাতে হতে পারে।

চিকিৎসার বিষয়ে অধ্যাপক ডা. সাইফুল্লাহ জানান, মূলত তিনটি ধাপে এই রোগের চিকিৎসা করা হয়। প্রথমত, রোগ শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইনজেকশন বেঞ্জাথিন পেনিসিলিন জি একবার গভীর পেশিতে দিতে হয়। ২৭ কেজির কম ওজনের শিশুর জন্য ৬ লাখ ইউনিট এবং বেশি ওজনের ক্ষেত্রে ১২ লাখ ইউনিট ডোজ প্রযোজ্য। পেনিসিলিনে অ্যালার্জি থাকলে বিকল্প অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়।

দ্বিতীয় ধাপে প্রদাহ কমাতে জয়েন্টের ব্যথার ক্ষেত্রে উচ্চমাত্রার অ্যাসপিরিন দেওয়া হয়। হৃদযন্ত্রে প্রদাহ বা হার্ট ফেইলিউরের মতো গুরুতর পরিস্থিতিতে কর্টিকোস্টেরয়েড প্রয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। সময়মতো এই চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উপসর্গ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে।

তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো রোগের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো। রিউম্যাটিক জ্বর একবার হলে বারবার হওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং প্রতিবার ঝুঁকিতে হৃদপিণ্ডের ক্ষতির সম্ভাবনা বাড়তে থাকে। তাই প্রতি তিন থেকে চার সপ্তাহ অন্তর বেঞ্জাথিন পেনিসিলিন ইনজেকশন নিতে হয়। হৃদযন্ত্রে কোনো প্রদাহ না থাকলে কমপক্ষে পাঁচ বছর বা ২১ বছর বয়স পর্যন্ত এই ইনজেকশন চালিয়ে যেতে হয়। হৃদযন্ত্রে প্রদাহ থাকলে মেয়াদ বেড়ে দাঁড়ায় ১০ বছর বা তারও বেশি। আর ভালভের স্থায়ী ক্ষতি হয়ে গেলে ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত বা কখনো আজীবন এই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বজায় রাখতে হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অধ্যাপক ডা. সাইফুল্লাহ বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এখনো দেশে অনেক শিশু সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে বড় হয়ে হৃদপিণ্ডের ভালভ বিকলের মতো জটিলতায় পড়ছে। অথচ শুরুতেই সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক নিলে এই পরিণতি সম্পূর্ণভাবে এড়ানো সম্ভব। তিনি অভিভাবকদের পরামর্শ দেন, শিশুর গলাব্যথা দুই থেকে তিন দিনের বেশি থাকলেই চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে এবং কোনো অবস্থাতেই নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স মাঝপথে বন্ধ করা যাবে না। রিউম্যাটিক জ্বর একবার হলে নিয়মিত প্রফাইল্যাক্সিস ইনজেকশন এবং চিকিৎসকের ফলোআপ মেনে চলা অপরিহার্য।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬


সামান্য গলাব্যথাই ডেকে আনতে পারে স্থায়ী হৃদরোগ

প্রকাশের তারিখ : ১১ মার্চ ২০২৬

featured Image

শিশুর গলা ব্যথাকে তুচ্ছ ভেবে অবহেলা করলে তা একদিন স্থায়ী হৃদরোগে পরিণত হতে পারে। এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজের কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ। তিনি বলছেন, বাংলাদেশে শিশু ও কিশোরদের মধ্যে রিউম্যাটিক জ্বর এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে এবং যথাযথ সচেতনতার অভাবে এটি মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনছে।

চিকিৎসকদের মতে, সাধারণত গ্রুপ 'এ' বিটা-হেমোলাইটিক স্ট্রেপটোকক্কাস নামের একটি বিশেষ জীবাণু গলায় সংক্রমণ ঘটায়। এই সংক্রমণের দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধব্যবস্থা ভুলক্রমে নিজের শরীরের বিরুদ্ধেই কাজ করতে শুরু করে। হৃদপিণ্ড, জয়েন্ট, ত্বক বা স্নায়ুতন্ত্রে এই আক্রমণের ফলে দেখা দেয় রিউম্যাটিক জ্বর। সময়মতো চিকিৎসা না হলে এই জ্বর পরিণতিতে হৃদপিণ্ডের ভালভ নষ্ট করে দিতে পারে, যা রিউম্যাটিক হার্ট ডিজিজ নামে পরিচিত।

রোগের লক্ষণ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ জানান, এক জয়েন্ট থেকে অন্য জয়েন্টে ঘুরে বেড়ানো ব্যথা ও ফোলা, ক্রমাগত জ্বর এবং বুক ধড়ফড় বা শ্বাসকষ্ট প্রধান লক্ষণ হিসেবে দেখা দেয়। হাত-পা অস্বাভাবিকভাবে নড়ে ওঠার মতো উপসর্গও কখনো কখনো দেখা যায়, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে কোরিয়া বলা হয়। তবে সবচেয়ে ভয়ংকর পরিণতি হলো হৃদপিণ্ডের ভালভ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, যা একবার হলে সারাজীবন ভোগান্তি পোহাতে হতে পারে।

চিকিৎসার বিষয়ে অধ্যাপক ডা. সাইফুল্লাহ জানান, মূলত তিনটি ধাপে এই রোগের চিকিৎসা করা হয়। প্রথমত, রোগ শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইনজেকশন বেঞ্জাথিন পেনিসিলিন জি একবার গভীর পেশিতে দিতে হয়। ২৭ কেজির কম ওজনের শিশুর জন্য ৬ লাখ ইউনিট এবং বেশি ওজনের ক্ষেত্রে ১২ লাখ ইউনিট ডোজ প্রযোজ্য। পেনিসিলিনে অ্যালার্জি থাকলে বিকল্প অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়।

দ্বিতীয় ধাপে প্রদাহ কমাতে জয়েন্টের ব্যথার ক্ষেত্রে উচ্চমাত্রার অ্যাসপিরিন দেওয়া হয়। হৃদযন্ত্রে প্রদাহ বা হার্ট ফেইলিউরের মতো গুরুতর পরিস্থিতিতে কর্টিকোস্টেরয়েড প্রয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। সময়মতো এই চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উপসর্গ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে।

তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো রোগের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো। রিউম্যাটিক জ্বর একবার হলে বারবার হওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং প্রতিবার ঝুঁকিতে হৃদপিণ্ডের ক্ষতির সম্ভাবনা বাড়তে থাকে। তাই প্রতি তিন থেকে চার সপ্তাহ অন্তর বেঞ্জাথিন পেনিসিলিন ইনজেকশন নিতে হয়। হৃদযন্ত্রে কোনো প্রদাহ না থাকলে কমপক্ষে পাঁচ বছর বা ২১ বছর বয়স পর্যন্ত এই ইনজেকশন চালিয়ে যেতে হয়। হৃদযন্ত্রে প্রদাহ থাকলে মেয়াদ বেড়ে দাঁড়ায় ১০ বছর বা তারও বেশি। আর ভালভের স্থায়ী ক্ষতি হয়ে গেলে ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত বা কখনো আজীবন এই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বজায় রাখতে হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অধ্যাপক ডা. সাইফুল্লাহ বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এখনো দেশে অনেক শিশু সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে বড় হয়ে হৃদপিণ্ডের ভালভ বিকলের মতো জটিলতায় পড়ছে। অথচ শুরুতেই সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক নিলে এই পরিণতি সম্পূর্ণভাবে এড়ানো সম্ভব। তিনি অভিভাবকদের পরামর্শ দেন, শিশুর গলাব্যথা দুই থেকে তিন দিনের বেশি থাকলেই চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে এবং কোনো অবস্থাতেই নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স মাঝপথে বন্ধ করা যাবে না। রিউম্যাটিক জ্বর একবার হলে নিয়মিত প্রফাইল্যাক্সিস ইনজেকশন এবং চিকিৎসকের ফলোআপ মেনে চলা অপরিহার্য।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০২৪১০৯১৭৩০
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: 01711-070054

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ