বিশ্বকাপ ফুটবল অনেকের কাছে শুধু একটি টুর্নামেন্ট। কিন্তু কিছু মানুষের কাছে এটি পৃথিবীকে নতুন করে দেখার উপলক্ষ, জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান মুহূর্তগুলোকে স্মৃতির পাতায় ধরে রাখার এক অনন্য যাত্রা। বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তা ও ক্রীড়া সংগঠক তপন চৌধুরীর গল্প ঠিক তেমনই।
স্কয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে ব্যবসায়িক পরিচিতি থাকলেও ফুটবলের প্রতি তার ভালোবাসা তাকে দিয়েছে ভিন্ন এক পরিচয়। ব্রাদার্স ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তপন চৌধুরী এবার যাচ্ছেন তার জীবনের দশম বিশ্বকাপ দেখতে।
তার বিশ্বকাপ অভিযাত্রার শুরু ১৯৮৬ সালে, মেক্সিকো বিশ্বকাপ দিয়ে। সে সময় মেক্সিকোকে ঘিরে নিরাপত্তা নিয়ে নানা আতঙ্ক থাকলেও বন্ধু ফকির মাহবুব আনামকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হয়েছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল আসর দেখতে। সেই সময় থাকা, খাওয়া ও সাতটি ম্যাচের টিকিট মিলিয়ে একজনের খরচ হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ৮০০ মার্কিন ডলার।
সেই বিশ্বকাপের সবচেয়ে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা ছিল আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচ। মাঠে বসে খেলা দেখলেও দিয়েগো ম্যারাডোনার বিখ্যাত 'হ্যান্ড অব গড' গোলটি তখন বুঝতে পারেননি। পরে হোটেলে ফিরে টেলিভিশনে দেখে বুঝেছিলেন ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছেন তারা। ম্যাচ শেষে পুরো মেক্সিকো শহরের উৎসবমুখর পরিবেশ আজও স্পষ্ট মনে আছে তার।
এরপর একে একে প্রতিটি বিশ্বকাপ যেন তার জীবনের নতুন একটি অধ্যায় হয়ে উঠেছে।
১৯৯০ সালে রোমে দেখেছেন ম্যারাডোনার অশ্রু আর জার্মানির শিরোপা জয়।
১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যক্ষ করেছেন ইতালির স্বপ্নভঙ্গ।
১৯৯৮ সালে প্যারিসে দেখেছেন জিনেদিন জিদানের নেতৃত্বে ফ্রান্সের বিশ্বজয়।
২০০২ সালে এশিয়ার মাটিতে দেখেছেন রোনালদোর অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন এবং ব্রাজিলের পুনর্জন্ম।
২০০৬ সালে বার্লিনে দেখেছেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় ফাইনাল এবং জিনেদিন জিদানের বিদায়।
২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ভুভুজেলার শব্দের মধ্যে স্পেনের ধৈর্য আর সৌন্দর্যের ফুটবল তাকে মুগ্ধ করেছিল।
তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার একটি ছিল ২০১৪ সালের ব্রাজিল-জার্মানি সেমিফাইনাল। প্রথম গোলের পরই তার মনে হয়েছিল, ব্রাজিল সেদিন নিজেদের মতো খেলছে না। পাশে বসা দর্শকদের উদ্দেশে বলে ফেলেছিলেন, "আজ ব্রাজিল সাত গোল খাবে।"
কিছুক্ষণ পর সেই কথাই যেন বাস্তবে রূপ নেয়। স্কোরবোর্ড বদলাচ্ছিল, গ্যালারির আবহ বদলাচ্ছিল, আর ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের চোখে জমছিল অশ্রু। সপ্তম গোল হওয়ার পর পাশে বসা এক ইতালীয় দর্শক বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। হাসতে হাসতে তপন চৌধুরী বলেন, "আমি জ্যোতিষী ছিলাম না। শুধু মনে হয়েছিল, ব্রাজিল সেদিন মাঠেই ছিল না।"
২০১৮ সালে দেখেছেন নতুন প্রজন্মের উত্থান। আর ২০২২ সালে কাতারের ফাইনালে গ্যালারিতে বসে প্রত্যক্ষ করেছেন লিওনেল মেসির বহু প্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ জয়। তার ভাষায়, সেদিন মানুষ শুধু একটি ম্যাচ দেখেনি, দেখেছিল সময়কে পূর্ণতা পেতে।
এবারও বিশ্বকাপের পথে তপন চৌধুরী। তবে এবারের সফরে একটি গভীর শূন্যতা তাকে সঙ্গ দেবে।
একসময় প্রায় প্রতিটি বিশ্বকাপেই তার সঙ্গে থাকত ছেলে ড্যানি, কখনও মেয়ে, কখনও পরিবারের অন্য সদস্যরা। বিশ্বকাপ ছিল তাদের পারিবারিক উৎসব। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় ছেলেকে হারানোর পর সেই আনন্দে নেমে এসেছে নীরবতা।
ছেলের কথা বলতে গিয়ে কিছুক্ষণের জন্য থেমে যান তিনি। জানান, প্রতিটি বিশ্বকাপে ড্যানিকে ভীষণ মনে পড়ে। গ্যালারিতে পাশাপাশি বসে খেলা দেখা, গোল হলে উল্লাস, ছবি তোলা, খেলা শেষে গভীর রাত পর্যন্ত ফুটবল নিয়ে আলোচনা, সবই এখন স্মৃতি।
তবুও জীবন থেমে থাকে না। বিশ্বকাপও নয়।
দশম বিশ্বকাপের উদ্দেশে আবার যাত্রা শুরু করছেন তপন চৌধুরী। এবার তার ব্যাগে থাকবে শুধু টিকিট আর পাসপোর্ট নয়, থাকবে চার দশকের ফুটবল স্মৃতি, অসংখ্য স্টেডিয়ামের গর্জন, ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে ওঠা মুহূর্তগুলো, আর এক না-ফেরা সন্তানের জন্য বুকভরা নীরব ভালোবাসা।

মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ জুন ২০২৬
বিশ্বকাপ ফুটবল অনেকের কাছে শুধু একটি টুর্নামেন্ট। কিন্তু কিছু মানুষের কাছে এটি পৃথিবীকে নতুন করে দেখার উপলক্ষ, জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান মুহূর্তগুলোকে স্মৃতির পাতায় ধরে রাখার এক অনন্য যাত্রা। বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তা ও ক্রীড়া সংগঠক তপন চৌধুরীর গল্প ঠিক তেমনই।
স্কয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে ব্যবসায়িক পরিচিতি থাকলেও ফুটবলের প্রতি তার ভালোবাসা তাকে দিয়েছে ভিন্ন এক পরিচয়। ব্রাদার্স ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তপন চৌধুরী এবার যাচ্ছেন তার জীবনের দশম বিশ্বকাপ দেখতে।
তার বিশ্বকাপ অভিযাত্রার শুরু ১৯৮৬ সালে, মেক্সিকো বিশ্বকাপ দিয়ে। সে সময় মেক্সিকোকে ঘিরে নিরাপত্তা নিয়ে নানা আতঙ্ক থাকলেও বন্ধু ফকির মাহবুব আনামকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হয়েছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল আসর দেখতে। সেই সময় থাকা, খাওয়া ও সাতটি ম্যাচের টিকিট মিলিয়ে একজনের খরচ হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ৮০০ মার্কিন ডলার।
সেই বিশ্বকাপের সবচেয়ে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা ছিল আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচ। মাঠে বসে খেলা দেখলেও দিয়েগো ম্যারাডোনার বিখ্যাত 'হ্যান্ড অব গড' গোলটি তখন বুঝতে পারেননি। পরে হোটেলে ফিরে টেলিভিশনে দেখে বুঝেছিলেন ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছেন তারা। ম্যাচ শেষে পুরো মেক্সিকো শহরের উৎসবমুখর পরিবেশ আজও স্পষ্ট মনে আছে তার।
এরপর একে একে প্রতিটি বিশ্বকাপ যেন তার জীবনের নতুন একটি অধ্যায় হয়ে উঠেছে।
১৯৯০ সালে রোমে দেখেছেন ম্যারাডোনার অশ্রু আর জার্মানির শিরোপা জয়।
১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যক্ষ করেছেন ইতালির স্বপ্নভঙ্গ।
১৯৯৮ সালে প্যারিসে দেখেছেন জিনেদিন জিদানের নেতৃত্বে ফ্রান্সের বিশ্বজয়।
২০০২ সালে এশিয়ার মাটিতে দেখেছেন রোনালদোর অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন এবং ব্রাজিলের পুনর্জন্ম।
২০০৬ সালে বার্লিনে দেখেছেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় ফাইনাল এবং জিনেদিন জিদানের বিদায়।
২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ভুভুজেলার শব্দের মধ্যে স্পেনের ধৈর্য আর সৌন্দর্যের ফুটবল তাকে মুগ্ধ করেছিল।
তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার একটি ছিল ২০১৪ সালের ব্রাজিল-জার্মানি সেমিফাইনাল। প্রথম গোলের পরই তার মনে হয়েছিল, ব্রাজিল সেদিন নিজেদের মতো খেলছে না। পাশে বসা দর্শকদের উদ্দেশে বলে ফেলেছিলেন, "আজ ব্রাজিল সাত গোল খাবে।"
কিছুক্ষণ পর সেই কথাই যেন বাস্তবে রূপ নেয়। স্কোরবোর্ড বদলাচ্ছিল, গ্যালারির আবহ বদলাচ্ছিল, আর ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের চোখে জমছিল অশ্রু। সপ্তম গোল হওয়ার পর পাশে বসা এক ইতালীয় দর্শক বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। হাসতে হাসতে তপন চৌধুরী বলেন, "আমি জ্যোতিষী ছিলাম না। শুধু মনে হয়েছিল, ব্রাজিল সেদিন মাঠেই ছিল না।"
২০১৮ সালে দেখেছেন নতুন প্রজন্মের উত্থান। আর ২০২২ সালে কাতারের ফাইনালে গ্যালারিতে বসে প্রত্যক্ষ করেছেন লিওনেল মেসির বহু প্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ জয়। তার ভাষায়, সেদিন মানুষ শুধু একটি ম্যাচ দেখেনি, দেখেছিল সময়কে পূর্ণতা পেতে।
এবারও বিশ্বকাপের পথে তপন চৌধুরী। তবে এবারের সফরে একটি গভীর শূন্যতা তাকে সঙ্গ দেবে।
একসময় প্রায় প্রতিটি বিশ্বকাপেই তার সঙ্গে থাকত ছেলে ড্যানি, কখনও মেয়ে, কখনও পরিবারের অন্য সদস্যরা। বিশ্বকাপ ছিল তাদের পারিবারিক উৎসব। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় ছেলেকে হারানোর পর সেই আনন্দে নেমে এসেছে নীরবতা।
ছেলের কথা বলতে গিয়ে কিছুক্ষণের জন্য থেমে যান তিনি। জানান, প্রতিটি বিশ্বকাপে ড্যানিকে ভীষণ মনে পড়ে। গ্যালারিতে পাশাপাশি বসে খেলা দেখা, গোল হলে উল্লাস, ছবি তোলা, খেলা শেষে গভীর রাত পর্যন্ত ফুটবল নিয়ে আলোচনা, সবই এখন স্মৃতি।
তবুও জীবন থেমে থাকে না। বিশ্বকাপও নয়।
দশম বিশ্বকাপের উদ্দেশে আবার যাত্রা শুরু করছেন তপন চৌধুরী। এবার তার ব্যাগে থাকবে শুধু টিকিট আর পাসপোর্ট নয়, থাকবে চার দশকের ফুটবল স্মৃতি, অসংখ্য স্টেডিয়ামের গর্জন, ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে ওঠা মুহূর্তগুলো, আর এক না-ফেরা সন্তানের জন্য বুকভরা নীরব ভালোবাসা।

আপনার মতামত লিখুন