বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আজ এক নতুন মানসিকতা গড়ে উঠেছে। তারা কেবল চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেদের আইডিয়াকে বাস্তবে রূপ দিতে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় কিংবা গ্রামের ছোট শহরে সর্বত্রই দেখা যাচ্ছে নতুন উদ্যোগ নিয়ে ভাবছে তরুণরা। কেউ কৃষকদের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে চায়, কেউ গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের শহরের মতো মানসম্মত পড়াশোনার সুযোগ দিতে চায়। এই প্রবণতা শুধু অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ইঙ্গিত নয় বরং এক সামাজিক রূপান্তরের ইশারা।
এই প্রেক্ষাপটে স্টার্টআপের ধারণা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্টার্টআপ মানে সীমিত সম্পদে নতুন সমাধান, যেখানে থাকে উদ্ভাবনী চিন্তা, ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা, দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এবং সীমিত পুঁজিতে বড় পরিসরে বিস্তৃত হওয়ার স্বপ্ন। বিশ্বব্যাপী সফল স্টার্টআপের এরকম কিছু সফল উদাহরণ হলো, জুম একটি ভিডিও কনফারেন্সিং প্ল্যাটফর্ম, যা কোভিড মহামারির সময় বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এছাড়া উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠিত টেসলা ও স্পেসএক্স যথাক্রমে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও মহাকাশ প্রযুক্তি খাতে বিপ্লব এনেছে। আরও আছে পরিবহন খাতে উবার রাইড-শেয়ারিং অ্যাপ, যেটি সারা বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ ব্যবহার করে থাকে। সংগীতের জগতে স্পটিফাই, মিলিয়ন মিলিয়ন গান অনলাইনে শোনার সুযোগ দিয়ে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এসব সফল স্টার্টআপ ছোট পরিসর থেকে শুরু করে আজ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠেছে।
এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার যৌথভাবে ৫০০ কোটি টাকার একটি স্টার্টআপ তহবিল গঠন করেছে। এতে যুক্ত হয়েছে ১৬টি তফসিলি ব্যাংক ও ৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান,। এর ফলে নতুন উদ্যোক্তারা প্রাথমিক মূলধন সংগ্রহে যে বড় বাধার সম্মুখীন হতেন তা অনেকটাই কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই তহবিল তরুণদের শুধু স্বপ্ন দেখতেই নয়, স্বপ্ন বাস্তবায়নেও সাহস যোগাবে। নিঃসন্দেহে এটি দেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে এক যুগান্তকারী অগ্রগতি।
এছাড়াও, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী জানান ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্টার্টআপ, নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন, নারী ক্ষমতায়ন এবং তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির জন্য মোট ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর বাইরে ৫০০ কোটি টাকার পৃথক স্টার্টআপ ফান্ড গঠন করা হয়েছে, যেখান থেকে তরুণরা ৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে পারবেন।
স্টার্টআপ খাতে ইক্যুইটি সহায়তা দেওয়ার জন্য ‘বাংলাদেশ স্টার্ট-আপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি পিএলসি’ গঠন করা হয়েছে। স্টার্টআপ উদ্যোগগুলো এ প্রতিষ্ঠান থেকেও ইক্যুইটি সহায়তা নিতে পারবে।
স্টার্টআপ খাতের পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের অনন্য জনমিতিক সুবিধা। কোটি কোটি জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ তরুণ, যারা প্রযুক্তি-অভ্যস্ত, ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত এবং উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবল আগ্রহ রাখে। এরা নতুন চিন্তা গ্রহণে দ্রুত, নতুন প্রযুক্তি শেখায় দক্ষ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তরুণদের এই শক্তি দেশের উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে, যা ভবিষ্যতের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।
প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার এই খাতের আরেকটি দৃঢ় ভিত্তি। বর্তমানে দেশে ১৩ কোটির বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী, সহজলভ্য স্মার্টফোন, সাশ্রয়ী ডাটা, ফোরজি ইন্টারনেট এবং বিকাশ, নগদ, উপায়-এর মতো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সেবার কারণে প্রযুক্তি এখন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষ এখন অনলাইনে কেনাকাটা, শিক্ষা, বিনোদন থেকে শুরু করে বিল পরিশোধ পর্যন্ত সব কিছু করছে। উদ্যোক্তাদের জন্য এটি নতুন বাজার তৈরির পথ খুলে দিচ্ছে এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর এই উন্নয়ন স্টার্টআপদের দ্রুত স্কেলিংয়ে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশের বিশাল ভোক্তা বাজার স্টার্টআপদের জন্য আরেকটি বড় সুযোগ। ১৭ কোটিরও বেশি মানুষের প্রয়োজন, ইচ্ছা ও জীবনধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিনিয়ত নতুন চাহিদা তৈরি হচ্ছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, খাদ্য, পরিবহন, বিনোদন—প্রতিটি খাতেই নতুন সমাধানের বিশাল চাহিদা রয়েছে। এই কারণে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশ এখন একটি উদীয়মান বাজার হিসেবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে, যেখানে নতুন উদ্যোগের জন্য সুযোগ সীমাহীন।
সরকারও এই খাতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। স্টার্টআপ বাংলাদেশ উদ্ভাবনী ব্যবসায় সরাসরি বিনিয়োগ করছে, আইডিয়া প্রজেক্ট নতুন ধারণাকে বাস্তবায়নের জন্য প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও অর্থায়ন দিচ্ছে, আর এলআইসিটি আইটি খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করছে। এসব উদ্যোগ তরুণ উদ্যোক্তাদের শুধু স্বপ্ন দেখতেই নয় বরং তা বাস্তবে রূপ দিতে কার্যকর সহায়তা দিচ্ছে, যা একটি টেকসই স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তুলছে। ফলস্বরূপ, নানা খাতে গড়ে উঠেছে সফল স্টার্টআপের অনুপ্রেরণামূলক গল্প। বিকাশ, নগদ ও উপায় দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির চেহারা পাল্টে দিয়েছে। টেন মিনিট স্কুল, শিখো ও বহুব্রীহি অনলাইন শিক্ষাকে সহজলভ্য করেছে। ডক্টরোলা ও জিয়ন, কোভিড-১৯ সময়ে ঘরে বসেই চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিয়েছে। আইফার্মার ও ফসলি, কৃষকদের সরাসরি বাজারের সঙ্গে যুক্ত করছে। পাঠাও, সহজ ও চালডাল অ্যাপসগুলো শহুরে জীবনের যাতায়াত ও বাজার ব্যবস্থাকে সহজ করেছে। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, স্টার্টআপ এখন দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং তরুণদের নতুন স্বপ্ন দেখাতে সাহস জোগাচ্ছে।
স্টার্টআপের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করে দ্রুত স্কেলিংয়ের ওপর। কিন্তু স্কেলিং পর্যায়ে হঠাৎ খরচ ও ঝুঁকি বেড়ে যাওয়াও বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। প্রযুক্তি, জনবল, অপারেশনাল খরচ সামলাতে না পারলে অনেক উদ্যোগ মাঝপথেই থেমে যেতে পারে। তাই অর্থ, প্রযুক্তি, জনবল ও অবকাঠামোগত সহায়তা না থাকলে উদ্ভাবনী ধারণাগুলো বাস্তবের মুখ দেখতে পায় না এবং উদ্যোক্তাদের মনোবলও ভেঙে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে জরুরি হয়ে পড়েছে একটি সমন্বিত ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা। নীতিগত প্রণোদনা, কর ছাড়, উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ, স্কেলিং সহায়তা এবং আঞ্চলিক স্টার্টআপ হাব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনাসহ ঢাকার বাইরের শহরগুলোতে স্থানীয় পরিকাঠামো, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং আধুনিক ইনকিউবেশন সেন্টার গড়ে তুলতে হবে। এতে সেখানকার তরুণরাও মূলধারার সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে। পাশাপাশি নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সহজ শর্তে ঋণ, ব্যবসায়িক পরামর্শ ও বাজার সংযোগ প্রদান করতে হবে। এর ফলে স্টার্টআপ সংস্কৃতি আরও বৈচিত্র্যময় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে।
একইসঙ্গে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের পথ সহজ করতে নীতিগত সহায়তা, রপ্তানি প্রণোদনা এবং গ্লোবাল পার্টনারশিপ গড়ে তোলার মাধ্যমে স্থানীয় উদ্যোগগুলোকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সক্ষমতা দিতে হবে। গ্লোবাল বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নেটওয়ার্ক তৈরি, আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তির মতো উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এর মাধ্যমে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগ কেবল পোশাকে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের প্রতীক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।
লেখা: আফছানা আক্তার আরিফা হক্কানি, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
#আরইউএস

বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আজ এক নতুন মানসিকতা গড়ে উঠেছে। তারা কেবল চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেদের আইডিয়াকে বাস্তবে রূপ দিতে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় কিংবা গ্রামের ছোট শহরে সর্বত্রই দেখা যাচ্ছে নতুন উদ্যোগ নিয়ে ভাবছে তরুণরা। কেউ কৃষকদের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে চায়, কেউ গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের শহরের মতো মানসম্মত পড়াশোনার সুযোগ দিতে চায়। এই প্রবণতা শুধু অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ইঙ্গিত নয় বরং এক সামাজিক রূপান্তরের ইশারা।
এই প্রেক্ষাপটে স্টার্টআপের ধারণা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্টার্টআপ মানে সীমিত সম্পদে নতুন সমাধান, যেখানে থাকে উদ্ভাবনী চিন্তা, ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা, দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এবং সীমিত পুঁজিতে বড় পরিসরে বিস্তৃত হওয়ার স্বপ্ন। বিশ্বব্যাপী সফল স্টার্টআপের এরকম কিছু সফল উদাহরণ হলো, জুম একটি ভিডিও কনফারেন্সিং প্ল্যাটফর্ম, যা কোভিড মহামারির সময় বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এছাড়া উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠিত টেসলা ও স্পেসএক্স যথাক্রমে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও মহাকাশ প্রযুক্তি খাতে বিপ্লব এনেছে। আরও আছে পরিবহন খাতে উবার রাইড-শেয়ারিং অ্যাপ, যেটি সারা বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ ব্যবহার করে থাকে। সংগীতের জগতে স্পটিফাই, মিলিয়ন মিলিয়ন গান অনলাইনে শোনার সুযোগ দিয়ে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এসব সফল স্টার্টআপ ছোট পরিসর থেকে শুরু করে আজ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠেছে।
এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার যৌথভাবে ৫০০ কোটি টাকার একটি স্টার্টআপ তহবিল গঠন করেছে। এতে যুক্ত হয়েছে ১৬টি তফসিলি ব্যাংক ও ৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান,। এর ফলে নতুন উদ্যোক্তারা প্রাথমিক মূলধন সংগ্রহে যে বড় বাধার সম্মুখীন হতেন তা অনেকটাই কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই তহবিল তরুণদের শুধু স্বপ্ন দেখতেই নয়, স্বপ্ন বাস্তবায়নেও সাহস যোগাবে। নিঃসন্দেহে এটি দেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে এক যুগান্তকারী অগ্রগতি।
এছাড়াও, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী জানান ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্টার্টআপ, নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন, নারী ক্ষমতায়ন এবং তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির জন্য মোট ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর বাইরে ৫০০ কোটি টাকার পৃথক স্টার্টআপ ফান্ড গঠন করা হয়েছে, যেখান থেকে তরুণরা ৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে পারবেন।
স্টার্টআপ খাতে ইক্যুইটি সহায়তা দেওয়ার জন্য ‘বাংলাদেশ স্টার্ট-আপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি পিএলসি’ গঠন করা হয়েছে। স্টার্টআপ উদ্যোগগুলো এ প্রতিষ্ঠান থেকেও ইক্যুইটি সহায়তা নিতে পারবে।
স্টার্টআপ খাতের পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের অনন্য জনমিতিক সুবিধা। কোটি কোটি জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ তরুণ, যারা প্রযুক্তি-অভ্যস্ত, ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত এবং উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবল আগ্রহ রাখে। এরা নতুন চিন্তা গ্রহণে দ্রুত, নতুন প্রযুক্তি শেখায় দক্ষ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তরুণদের এই শক্তি দেশের উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে, যা ভবিষ্যতের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।
প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার এই খাতের আরেকটি দৃঢ় ভিত্তি। বর্তমানে দেশে ১৩ কোটির বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী, সহজলভ্য স্মার্টফোন, সাশ্রয়ী ডাটা, ফোরজি ইন্টারনেট এবং বিকাশ, নগদ, উপায়-এর মতো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সেবার কারণে প্রযুক্তি এখন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষ এখন অনলাইনে কেনাকাটা, শিক্ষা, বিনোদন থেকে শুরু করে বিল পরিশোধ পর্যন্ত সব কিছু করছে। উদ্যোক্তাদের জন্য এটি নতুন বাজার তৈরির পথ খুলে দিচ্ছে এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর এই উন্নয়ন স্টার্টআপদের দ্রুত স্কেলিংয়ে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশের বিশাল ভোক্তা বাজার স্টার্টআপদের জন্য আরেকটি বড় সুযোগ। ১৭ কোটিরও বেশি মানুষের প্রয়োজন, ইচ্ছা ও জীবনধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিনিয়ত নতুন চাহিদা তৈরি হচ্ছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, খাদ্য, পরিবহন, বিনোদন—প্রতিটি খাতেই নতুন সমাধানের বিশাল চাহিদা রয়েছে। এই কারণে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশ এখন একটি উদীয়মান বাজার হিসেবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে, যেখানে নতুন উদ্যোগের জন্য সুযোগ সীমাহীন।
সরকারও এই খাতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। স্টার্টআপ বাংলাদেশ উদ্ভাবনী ব্যবসায় সরাসরি বিনিয়োগ করছে, আইডিয়া প্রজেক্ট নতুন ধারণাকে বাস্তবায়নের জন্য প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও অর্থায়ন দিচ্ছে, আর এলআইসিটি আইটি খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করছে। এসব উদ্যোগ তরুণ উদ্যোক্তাদের শুধু স্বপ্ন দেখতেই নয় বরং তা বাস্তবে রূপ দিতে কার্যকর সহায়তা দিচ্ছে, যা একটি টেকসই স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তুলছে। ফলস্বরূপ, নানা খাতে গড়ে উঠেছে সফল স্টার্টআপের অনুপ্রেরণামূলক গল্প। বিকাশ, নগদ ও উপায় দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির চেহারা পাল্টে দিয়েছে। টেন মিনিট স্কুল, শিখো ও বহুব্রীহি অনলাইন শিক্ষাকে সহজলভ্য করেছে। ডক্টরোলা ও জিয়ন, কোভিড-১৯ সময়ে ঘরে বসেই চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিয়েছে। আইফার্মার ও ফসলি, কৃষকদের সরাসরি বাজারের সঙ্গে যুক্ত করছে। পাঠাও, সহজ ও চালডাল অ্যাপসগুলো শহুরে জীবনের যাতায়াত ও বাজার ব্যবস্থাকে সহজ করেছে। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, স্টার্টআপ এখন দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং তরুণদের নতুন স্বপ্ন দেখাতে সাহস জোগাচ্ছে।
স্টার্টআপের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করে দ্রুত স্কেলিংয়ের ওপর। কিন্তু স্কেলিং পর্যায়ে হঠাৎ খরচ ও ঝুঁকি বেড়ে যাওয়াও বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। প্রযুক্তি, জনবল, অপারেশনাল খরচ সামলাতে না পারলে অনেক উদ্যোগ মাঝপথেই থেমে যেতে পারে। তাই অর্থ, প্রযুক্তি, জনবল ও অবকাঠামোগত সহায়তা না থাকলে উদ্ভাবনী ধারণাগুলো বাস্তবের মুখ দেখতে পায় না এবং উদ্যোক্তাদের মনোবলও ভেঙে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে জরুরি হয়ে পড়েছে একটি সমন্বিত ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা। নীতিগত প্রণোদনা, কর ছাড়, উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ, স্কেলিং সহায়তা এবং আঞ্চলিক স্টার্টআপ হাব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনাসহ ঢাকার বাইরের শহরগুলোতে স্থানীয় পরিকাঠামো, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং আধুনিক ইনকিউবেশন সেন্টার গড়ে তুলতে হবে। এতে সেখানকার তরুণরাও মূলধারার সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে। পাশাপাশি নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সহজ শর্তে ঋণ, ব্যবসায়িক পরামর্শ ও বাজার সংযোগ প্রদান করতে হবে। এর ফলে স্টার্টআপ সংস্কৃতি আরও বৈচিত্র্যময় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে।
একইসঙ্গে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের পথ সহজ করতে নীতিগত সহায়তা, রপ্তানি প্রণোদনা এবং গ্লোবাল পার্টনারশিপ গড়ে তোলার মাধ্যমে স্থানীয় উদ্যোগগুলোকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সক্ষমতা দিতে হবে। গ্লোবাল বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নেটওয়ার্ক তৈরি, আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তির মতো উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এর মাধ্যমে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগ কেবল পোশাকে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের প্রতীক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।
লেখা: আফছানা আক্তার আরিফা হক্কানি, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
#আরইউএস

আপনার মতামত লিখুন