ঢাকা    বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

এআইয়ের জলপদচিহ্ন ও ভবিষ্যতের পানিসংকট


চৈতি ঘোষ
চৈতি ঘোষ
প্রকাশ : ১৩ জুন ২০২৬

এআইয়ের জলপদচিহ্ন ও ভবিষ্যতের পানিসংকট

একটি প্রশ্ন। “আগামীকাল বৃষ্টি হবে কি?”

মোবাইল ফোনের পর্দায় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই উত্তর হাজির। উত্তরটি এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছ থেকে। ব্যবহারকারী হয়তো ভাবছেন, এটি কেবল একটি ডিজিটাল প্রক্রিয়া। কয়েকটি অ্যালগরিদম কাজ করেছে, তথ্য বিশ্লেষণ হয়েছে, তারপর উত্তর এসেছে।

কিন্তু বাস্তবে এই কয়েক সেকেন্ডের উত্তরের পেছনে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে চলেছে হাজারো কম্পিউটারের নিরবচ্ছিন্ন কাজ। উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে সার্ভার। সেই তাপ কমাতে প্রবাহিত হয়েছে বিশুদ্ধ পানি। ব্যয় হয়েছে বিদ্যুৎ। ব্যবহার হয়েছে বিরল খনিজ ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো।

প্রযুক্তির এই যুগে আমরা যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ভবিষ্যতের প্রতীক হিসেবে দেখছি, তখন আরেকটি প্রশ্নও ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে এই ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে গিয়ে আমরা কি অদৃশ্যভাবে খরচ করে ফেলছি পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি, অর্থাৎ পানি?

মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাগার থেকে বেরিয়ে এসেছে সাধারণ মানুষের হাতে। শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক, সাংবাদিক থেকে চিকিৎসক, ব্যবসায়ী থেকে কৃষক প্রায় সব পেশার মানুষ এখন কোনো না কোনোভাবে এআই ব্যবহার করছেন।

কেউ লেখালেখির সহায়তা নিচ্ছেন, কেউ তথ্য বিশ্লেষণ করছেন, কেউ ছবি তৈরি করছেন, কেউ সফটওয়্যার কোড লিখছেন।

প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, ইন্টারনেট আবিষ্কারের পর মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তনগুলোর একটি হতে পারে এআই। কিন্তু প্রতিটি প্রযুক্তিগত বিপ্লবেরই একটি মূল্য থাকে। শিল্পবিপ্লবের মূল্য ছিল কয়লা ও কার্বন নিঃসরণ। ডিজিটাল যুগের মূল্য ছিল বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবহার। এখন প্রশ্ন উঠছে, এআই বিপ্লবের মূল্য কি হতে যাচ্ছে পানি?

আমরা যখন কোনো চ্যাটবটকে প্রশ্ন করি, তখন মনে হয় কাজটি সম্পূর্ণ ভার্চুয়াল। যেন কোনো বাস্তব সম্পদের প্রয়োজনই নেই। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

চ্যাটজিপিটি, জেমিনাই, ক্লড কিংবা অন্যান্য বৃহৎ ভাষা মডেলের উত্তর তৈরির পেছনে কাজ করে বিশাল ডেটা সেন্টার। এসব ডেটা সেন্টারে হাজার হাজার শক্তিশালী প্রসেসর দিন-রাত কাজ করে। এই প্রসেসরগুলো প্রচণ্ড তাপ উৎপন্ন করে। আর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে প্রয়োজন হয় উন্নত কুলিং সিস্টেম। সেখানেই প্রবেশ করে পানি। বিশুদ্ধ পানি ছাড়া অধিকাংশ উন্নত কুলিং ব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায় না। কারণ খনিজসমৃদ্ধ বা দূষিত পানি ব্যবহারে যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

গবেষকদের মতে, বড় আকারের একটি ডেটা সেন্টার প্রতিদিন এমন পরিমাণ পানি ব্যবহার করতে পারে, যা একটি ছোট শহরের দৈনন্দিন পানির চাহিদার সমান।

সংখ্যাগুলো কেন উদ্বেগ তৈরি করছে।

জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, এআই প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুৎ ও পানির চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।

বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এআই-সংশ্লিষ্ট ডেটা সেন্টারগুলোর পানি ব্যবহারের পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ঘনমিটারে পৌঁছাতে পারে।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক শাওলেই রেনের গবেষণা আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন, এআই ব্যবহারের সঙ্গে জড়িত পানি ব্যয় সাধারণ মানুষের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি।

যদিও বিভিন্ন গবেষণায় সংখ্যার পার্থক্য রয়েছে, কারণ সব ডেটা সেন্টার একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে না, তবু গবেষকদের মধ্যে একটি বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে,এআইয়ের পরিবেশগত পদচিহ্ন দ্রুত বাড়ছে।

এখানেই তৈরি হয়েছে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য।

একদিকে এআই জলবায়ু পরিবর্তনের পূর্বাভাস দিতে সাহায্য করছে। কৃষিতে পানির ব্যবহার কমানোর প্রযুক্তি তৈরি করছে। রোগ নির্ণয় সহজ করছে। অন্যদিকে সেই প্রযুক্তিই পরিচালিত হচ্ছে এমন অবকাঠামোর মাধ্যমে, যা বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহার করছে। প্রযুক্তি আমাদের পানিসম্পদ রক্ষার সমাধান খুঁজতে সাহায্য করছে, আবার সেই প্রযুক্তিই নতুন করে পানির ওপর চাপ তৈরি করছে। এই দ্বৈত বাস্তবতাই আজ গবেষকদের ভাবিয়ে তুলছে।

বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এখন এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণে ব্যস্ত। নতুন ডেটা সেন্টার গড়ে উঠছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, ভারত, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে। প্রতিটি নতুন ডেটা সেন্টার মানে আরও বেশি কম্পিউটিং ক্ষমতা। আর আরও বেশি কম্পিউটিং ক্ষমতা মানে আরও বেশি কুলিংয়ের প্রয়োজন।

বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দশকে ডেটা সেন্টারগুলো বিশ্বের অন্যতম বড় শিল্পভিত্তিক পানি ব্যবহারকারী খাতে পরিণত হতে পারে।

ভারত থেকে স্পেন: বাড়ছে স্থানীয় উদ্বেগ

পানি নিয়ে উদ্বেগ শুধু গবেষণাপত্রে সীমাবদ্ধ নেই। স্পেন, চিলি, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় বাসিন্দারা ইতিমধ্যে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন।

তাদের যুক্তি, যেখানে কৃষকরা সেচের পানির জন্য সংগ্রাম করছেন, সেখানে বিশাল প্রযুক্তি অবকাঠামোর জন্য কোটি কোটি লিটার পানি ব্যবহার কতটা যৌক্তিক?

ভারতের বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, চেন্নাই ও মুম্বাইয়ের মতো প্রযুক্তিনির্ভর শহরগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিয়ে আলোচনা আগেই ছিল। এখন সেই আলোচনায় যোগ হয়েছে ডেটা সেন্টারের প্রসঙ্গ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে ডেটা সেন্টারের অবস্থান নির্বাচন করতে স্থানীয় পানিসম্পদের বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

বাংলাদেশ এখনো বড় আকারের এআই ডেটা সেন্টারের কেন্দ্র নয়। তবে বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য অপ্রাসঙ্গিক নয়।দেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়। কৃষিকাজে সেচনির্ভরতা বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খরা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতও নতুন চাপ তৈরি করছে।

প্রযুক্তির বৈশ্বিক বিস্তার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রাকৃতিক সম্পদের প্রশ্ন কোনো একক দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বব্যাপী পানি ব্যবস্থাপনা ও টেকসই প্রযুক্তি উন্নয়ন বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পূর্বাভাস বলছে, আগামী বছরগুলোতে এআই চালিত ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এর অর্থ হলো আরও বেশি সার্ভার, আরও বেশি অবকাঠামো এবং সম্ভাব্যভাবে আরও বেশি পানির ব্যবহার।

প্রশ্ন হচ্ছে, প্রযুক্তির এই প্রবৃদ্ধি কি পরিবেশের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে পরিচালিত হবে?

নাকি আমরা এমন এক ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছি, যেখানে ডিজিটাল সুবিধার বিনিময়ে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অসহনীয় চাপ তৈরি হবে?

সুখবর হলো, সমাধানের পথ নিয়েও কাজ চলছে।

বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো পানি পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তি উন্নয়নে বিনিয়োগ করছে। নতুন ধরনের কুলিং সিস্টেম তৈরি হচ্ছে, যেখানে কম পানি প্রয়োজন হয়।কিছু ক্ষেত্রে সমুদ্রের পানি বা পুনর্ব্যবহৃত পানি ব্যবহারের পরীক্ষাও চলছে।

গুগল, মাইক্রোসফট ও মেটার মতো প্রতিষ্ঠান ২০৩০ সালের মধ্যে নিজেদের “ওয়াটার নিউট্রাল” করার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে।

শুধু প্রযুক্তি কোম্পানি নয়, সরকার ও নীতিনির্ধারকদেরও এগিয়ে আসতে হবে। ডেটা সেন্টারের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, পানির ব্যবহার সংক্রান্ত স্বচ্ছতা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রতিটি অগ্রগতি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে নতুন দায়িত্বও এনেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো আমাদের সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রযুক্তি। এটি চিকিৎসা, শিক্ষা, গবেষণা ও অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

তবে প্রযুক্তির এই উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আড়ালে একটি অদৃশ্য বাস্তবতা রয়েছে পানি।

হয়তো আগামী দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হবে, আমরা কি এমন একটি প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবী গড়ে তুলতে পারব, যেখানে উদ্ভাবন ও পরিবেশ একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সহযাত্রী?

কারণ শেষ পর্যন্ত একটি সত্য বদলায় না।

পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পিউটারও পানির বিকল্প তৈরি করতে পারেনি।

আর মানুষ যতই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দিকে এগিয়ে যাক, তার বেঁচে থাকার জন্য এখনো প্রয়োজন এক গ্লাস বিশুদ্ধ পানি।

চৈতি ঘোষ, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।

#আর ইউ এস

বিষয় : এআই

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬


এআইয়ের জলপদচিহ্ন ও ভবিষ্যতের পানিসংকট

প্রকাশের তারিখ : ১৩ জুন ২০২৬

featured Image

একটি প্রশ্ন। “আগামীকাল বৃষ্টি হবে কি?”

মোবাইল ফোনের পর্দায় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই উত্তর হাজির। উত্তরটি এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছ থেকে। ব্যবহারকারী হয়তো ভাবছেন, এটি কেবল একটি ডিজিটাল প্রক্রিয়া। কয়েকটি অ্যালগরিদম কাজ করেছে, তথ্য বিশ্লেষণ হয়েছে, তারপর উত্তর এসেছে।

কিন্তু বাস্তবে এই কয়েক সেকেন্ডের উত্তরের পেছনে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে চলেছে হাজারো কম্পিউটারের নিরবচ্ছিন্ন কাজ। উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে সার্ভার। সেই তাপ কমাতে প্রবাহিত হয়েছে বিশুদ্ধ পানি। ব্যয় হয়েছে বিদ্যুৎ। ব্যবহার হয়েছে বিরল খনিজ ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো।

প্রযুক্তির এই যুগে আমরা যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ভবিষ্যতের প্রতীক হিসেবে দেখছি, তখন আরেকটি প্রশ্নও ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে এই ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে গিয়ে আমরা কি অদৃশ্যভাবে খরচ করে ফেলছি পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি, অর্থাৎ পানি?

মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাগার থেকে বেরিয়ে এসেছে সাধারণ মানুষের হাতে। শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক, সাংবাদিক থেকে চিকিৎসক, ব্যবসায়ী থেকে কৃষক প্রায় সব পেশার মানুষ এখন কোনো না কোনোভাবে এআই ব্যবহার করছেন।

কেউ লেখালেখির সহায়তা নিচ্ছেন, কেউ তথ্য বিশ্লেষণ করছেন, কেউ ছবি তৈরি করছেন, কেউ সফটওয়্যার কোড লিখছেন।

প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, ইন্টারনেট আবিষ্কারের পর মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তনগুলোর একটি হতে পারে এআই। কিন্তু প্রতিটি প্রযুক্তিগত বিপ্লবেরই একটি মূল্য থাকে। শিল্পবিপ্লবের মূল্য ছিল কয়লা ও কার্বন নিঃসরণ। ডিজিটাল যুগের মূল্য ছিল বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবহার। এখন প্রশ্ন উঠছে, এআই বিপ্লবের মূল্য কি হতে যাচ্ছে পানি?

আমরা যখন কোনো চ্যাটবটকে প্রশ্ন করি, তখন মনে হয় কাজটি সম্পূর্ণ ভার্চুয়াল। যেন কোনো বাস্তব সম্পদের প্রয়োজনই নেই। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

চ্যাটজিপিটি, জেমিনাই, ক্লড কিংবা অন্যান্য বৃহৎ ভাষা মডেলের উত্তর তৈরির পেছনে কাজ করে বিশাল ডেটা সেন্টার। এসব ডেটা সেন্টারে হাজার হাজার শক্তিশালী প্রসেসর দিন-রাত কাজ করে। এই প্রসেসরগুলো প্রচণ্ড তাপ উৎপন্ন করে। আর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে প্রয়োজন হয় উন্নত কুলিং সিস্টেম। সেখানেই প্রবেশ করে পানি। বিশুদ্ধ পানি ছাড়া অধিকাংশ উন্নত কুলিং ব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায় না। কারণ খনিজসমৃদ্ধ বা দূষিত পানি ব্যবহারে যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

গবেষকদের মতে, বড় আকারের একটি ডেটা সেন্টার প্রতিদিন এমন পরিমাণ পানি ব্যবহার করতে পারে, যা একটি ছোট শহরের দৈনন্দিন পানির চাহিদার সমান।

সংখ্যাগুলো কেন উদ্বেগ তৈরি করছে।

জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, এআই প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুৎ ও পানির চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।

বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এআই-সংশ্লিষ্ট ডেটা সেন্টারগুলোর পানি ব্যবহারের পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ঘনমিটারে পৌঁছাতে পারে।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক শাওলেই রেনের গবেষণা আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন, এআই ব্যবহারের সঙ্গে জড়িত পানি ব্যয় সাধারণ মানুষের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি।

যদিও বিভিন্ন গবেষণায় সংখ্যার পার্থক্য রয়েছে, কারণ সব ডেটা সেন্টার একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে না, তবু গবেষকদের মধ্যে একটি বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে,এআইয়ের পরিবেশগত পদচিহ্ন দ্রুত বাড়ছে।

এখানেই তৈরি হয়েছে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য।

একদিকে এআই জলবায়ু পরিবর্তনের পূর্বাভাস দিতে সাহায্য করছে। কৃষিতে পানির ব্যবহার কমানোর প্রযুক্তি তৈরি করছে। রোগ নির্ণয় সহজ করছে। অন্যদিকে সেই প্রযুক্তিই পরিচালিত হচ্ছে এমন অবকাঠামোর মাধ্যমে, যা বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহার করছে। প্রযুক্তি আমাদের পানিসম্পদ রক্ষার সমাধান খুঁজতে সাহায্য করছে, আবার সেই প্রযুক্তিই নতুন করে পানির ওপর চাপ তৈরি করছে। এই দ্বৈত বাস্তবতাই আজ গবেষকদের ভাবিয়ে তুলছে।

বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এখন এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণে ব্যস্ত। নতুন ডেটা সেন্টার গড়ে উঠছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, ভারত, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে। প্রতিটি নতুন ডেটা সেন্টার মানে আরও বেশি কম্পিউটিং ক্ষমতা। আর আরও বেশি কম্পিউটিং ক্ষমতা মানে আরও বেশি কুলিংয়ের প্রয়োজন।

বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দশকে ডেটা সেন্টারগুলো বিশ্বের অন্যতম বড় শিল্পভিত্তিক পানি ব্যবহারকারী খাতে পরিণত হতে পারে।

ভারত থেকে স্পেন: বাড়ছে স্থানীয় উদ্বেগ

পানি নিয়ে উদ্বেগ শুধু গবেষণাপত্রে সীমাবদ্ধ নেই। স্পেন, চিলি, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় বাসিন্দারা ইতিমধ্যে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন।

তাদের যুক্তি, যেখানে কৃষকরা সেচের পানির জন্য সংগ্রাম করছেন, সেখানে বিশাল প্রযুক্তি অবকাঠামোর জন্য কোটি কোটি লিটার পানি ব্যবহার কতটা যৌক্তিক?

ভারতের বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, চেন্নাই ও মুম্বাইয়ের মতো প্রযুক্তিনির্ভর শহরগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিয়ে আলোচনা আগেই ছিল। এখন সেই আলোচনায় যোগ হয়েছে ডেটা সেন্টারের প্রসঙ্গ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে ডেটা সেন্টারের অবস্থান নির্বাচন করতে স্থানীয় পানিসম্পদের বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

বাংলাদেশ এখনো বড় আকারের এআই ডেটা সেন্টারের কেন্দ্র নয়। তবে বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য অপ্রাসঙ্গিক নয়।দেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়। কৃষিকাজে সেচনির্ভরতা বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খরা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতও নতুন চাপ তৈরি করছে।

প্রযুক্তির বৈশ্বিক বিস্তার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রাকৃতিক সম্পদের প্রশ্ন কোনো একক দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বব্যাপী পানি ব্যবস্থাপনা ও টেকসই প্রযুক্তি উন্নয়ন বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পূর্বাভাস বলছে, আগামী বছরগুলোতে এআই চালিত ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এর অর্থ হলো আরও বেশি সার্ভার, আরও বেশি অবকাঠামো এবং সম্ভাব্যভাবে আরও বেশি পানির ব্যবহার।

প্রশ্ন হচ্ছে, প্রযুক্তির এই প্রবৃদ্ধি কি পরিবেশের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে পরিচালিত হবে?

নাকি আমরা এমন এক ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছি, যেখানে ডিজিটাল সুবিধার বিনিময়ে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অসহনীয় চাপ তৈরি হবে?

সুখবর হলো, সমাধানের পথ নিয়েও কাজ চলছে।

বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো পানি পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তি উন্নয়নে বিনিয়োগ করছে। নতুন ধরনের কুলিং সিস্টেম তৈরি হচ্ছে, যেখানে কম পানি প্রয়োজন হয়।কিছু ক্ষেত্রে সমুদ্রের পানি বা পুনর্ব্যবহৃত পানি ব্যবহারের পরীক্ষাও চলছে।

গুগল, মাইক্রোসফট ও মেটার মতো প্রতিষ্ঠান ২০৩০ সালের মধ্যে নিজেদের “ওয়াটার নিউট্রাল” করার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে।

শুধু প্রযুক্তি কোম্পানি নয়, সরকার ও নীতিনির্ধারকদেরও এগিয়ে আসতে হবে। ডেটা সেন্টারের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, পানির ব্যবহার সংক্রান্ত স্বচ্ছতা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রতিটি অগ্রগতি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে নতুন দায়িত্বও এনেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো আমাদের সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রযুক্তি। এটি চিকিৎসা, শিক্ষা, গবেষণা ও অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

তবে প্রযুক্তির এই উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আড়ালে একটি অদৃশ্য বাস্তবতা রয়েছে পানি।

হয়তো আগামী দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হবে, আমরা কি এমন একটি প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবী গড়ে তুলতে পারব, যেখানে উদ্ভাবন ও পরিবেশ একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সহযাত্রী?

কারণ শেষ পর্যন্ত একটি সত্য বদলায় না।

পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পিউটারও পানির বিকল্প তৈরি করতে পারেনি।

আর মানুষ যতই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দিকে এগিয়ে যাক, তার বেঁচে থাকার জন্য এখনো প্রয়োজন এক গ্লাস বিশুদ্ধ পানি।

চৈতি ঘোষ, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।

#আর ইউ এস


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ