সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং খাত বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও দ্রুতবর্ধনশীল উৎস হিসেবে গড়ে উঠেছে। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবার বিস্তার, বৈশ্বিক রিমোট ওয়ার্ক সংস্কৃতির সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক ডিজিটাল মার্কেটপ্লেসে বাংলাদেশি পেশাজীবীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এই খাতের প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছে।
সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং, গ্রাফিক ডিজাইন, কনটেন্ট ডেভেলপমেন্ট, বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (BPO) এবং ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্সসহ বিভিন্ন খাতে কাজ করে দেশের লক্ষাধিক তরুণ নিয়মিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট শিল্পসূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই খাত থেকে বছরে কয়েক বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ বৈদেশিক আয় দেশে প্রবেশ করছে। রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি এটি এখন বৈদেশিক মুদ্রার একটি বিকল্প ও সম্ভাবনাময় উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে এই প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ব্যাংকিং, করনীতি ও পেমেন্ট অবকাঠামো ঘিরে একাধিক কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের অভিযোগও সামনে আসছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেস, পেমেন্ট প্রসেসর, ব্যাংক চার্জ এবং সম্ভাব্য কর কর্তনের পর অনেক ক্ষেত্রে ফ্রিল্যান্সারদের প্রকৃত হাতে পাওয়া অর্থ ক্লায়েন্টের মোট ব্যয়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ফ্রিল্যান্সাররা আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্ট বা মার্কেটপ্লেস থেকে উপার্জিত অর্থ দেশে আনার ক্ষেত্রে একাধিক স্তরের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। Payoneer, Wise, ব্যাংক ওয়্যার ট্রান্সফারসহ বিভিন্ন চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ দেশে এলেও প্রতিটি মাধ্যমেই রয়েছে আলাদা নিয়ম, চার্জ কাঠামো এবং ডকুমেন্টেশন জটিলতা।
ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ প্রাপ্তিতে সময়ক্ষেপণ, সার্ভিস চার্জ এবং আন্তর্জাতিক লেনদেন-সম্পর্কিত আনুষ্ঠানিকতা অনেক ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত বোঝা হিসেবে দেখা দিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বিশেষ করে বিভাগীয় শহর ও জেলা পর্যায়ের ফ্রিল্যান্সারদের জন্য ব্যাংকিং সেবা ও নথি ব্যবস্থাপনায় রাজধানীকেন্দ্রিক নির্ভরতা অতিরিক্ত সময় ও ব্যয় সৃষ্টি করছে।
ফ্রিল্যান্সিং আয়ের বৈধতা প্রমাণ, কর সুবিধা গ্রহণ এবং ব্যাংকিং রেকর্ড ব্যবস্থাপনার জন্য রেমিট্যান্স সার্টিফিকেট একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি।
তবে বিভিন্ন ব্যাংকিং চ্যানেলে এই সার্টিফিকেট প্রাপ্তির প্রক্রিয়া একরকম নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও সরাসরি আবেদন করতে হয়, কোথাও ই-মেইলের মাধ্যমে, আবার কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শাখায় শারীরিকভাবে উপস্থিত হতে হয়।
ফলে একই ধরনের আর্থিক লেনদেন হলেও প্রক্রিয়াগত ভিন্নতার কারণে ব্যবহারকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
বিশ্বের অন্যতম প্রধান ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম PayPal এখনো বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। ফলে আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং ইকোসিস্টেমে বাংলাদেশি পেশাজীবীদের জন্য বিকল্প পেমেন্ট চ্যানেলের ওপর নির্ভরতা বেশি।
বর্তমানে Payoneer ও Wise কিছুটা বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এগুলো বৈশ্বিক মানের পূর্ণাঙ্গ সমাধান নয় বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, উন্নত পেমেন্ট গেটওয়ের সীমিত উপস্থিতি আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্ট ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবসায়িক স্কেলিংয়ের ক্ষেত্রে একটি কাঠামোগত বাধা তৈরি করছে।
বিদেশি ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অর্থের ক্ষেত্রে কিছু দেশে উৎসে কর (Withholding Tax) প্রযোজ্য থাকে। ফলে অর্থ প্রেরণের আগেই একটি অংশ কেটে রাখা হয়।
এরপর দেশে প্রচলিত কর কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় না হলে একই আয়ের ওপর অতিরিক্ত কর-চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
বাংলাদেশের একাধিক দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় কর চুক্তি (DTA) থাকলেও এর ব্যবহারিক প্রয়োগ সীমিত বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। জটিল প্রক্রিয়া ও সচেতনতার অভাবে অনেক ফ্রিল্যান্সার এই সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন না।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসগুলোও আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কমিশন হিসেবে কেটে রাখে। Upwork, Fiverrসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম সাধারণত ফ্রিল্যান্সারদের কাছ থেকে সার্ভিস ফি গ্রহণ করে। একই সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে ক্লায়েন্টদের কাছ থেকেও আলাদা প্ল্যাটফর্ম ফি বা প্রসেসিং চার্জ নেওয়া হয়।
ফলে একজন ক্লায়েন্ট কোনো প্রকল্পের জন্য যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেন, তার পুরোটা ফ্রিল্যান্সারের হাতে পৌঁছায় না। প্ল্যাটফর্ম কমিশন, পেমেন্ট প্রসেসিং চার্জ, ব্যাংকিং ফি, মুদ্রা রূপান্তর ব্যয় এবং সম্ভাব্য উৎসে কর কর্তনের পর প্রকৃত প্রাপ্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সিং অর্থনীতিতে প্ল্যাটফর্ম কমিশন একটি স্বাভাবিক ব্যবসায়িক বাস্তবতা। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সীমিত পেমেন্ট অবকাঠামো, ব্যাংকিং জটিলতা এবং কর-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা যুক্ত হওয়ায় প্রকৃত আয়ের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কিছু বাণিজ্যিক ব্যাংক ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বিশেষায়িত ব্যাংকিং সেবা চালু করেছে, যেখানে বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব ও স্থানীয় মুদ্রা হিসাব আলাদাভাবে পরিচালনার সুযোগ রয়েছে।
এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি এখনো সীমিত পরিসরের মধ্যে রয়েছে এবং পুরো খাতের জন্য সমন্বিত সমাধান নয়।
অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রিল্যান্সিং খাতের সম্ভাবনাকে পূর্ণভাবে কাজে লাগাতে হলে কয়েকটি বিষয়ে নীতিগত সংস্কার প্রয়োজন।
তাদের মতে, এসব কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া খাতটির পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং খাতকে ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, কার্যকর নীতি সহায়তা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাত থেকে বার্ষিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি আয় সম্ভব।
তবে বর্তমান কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এই সম্ভাবনার পথে অন্যতম বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।
শেষ কথা
ফ্রিল্যান্সিং খাত এখন আর কেবল ব্যক্তিগত আয়ের উৎস নয়, এটি বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে এই খাতের সঙ্গে যুক্ত পেশাজীবীরা মনে করেন, তারা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করলেও তা ব্যবস্থাপনার কাঠামো এখনো সেই বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ফলে প্রশ্নটি এখন আর শুধু ব্যক্তিগত ভোগান্তির নয়; বরং একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক খাতের নীতি ও কাঠামোগত সক্ষমতার প্রশ্ন।
ডলার আয়ের এই নতুন অর্থনীতিকে টেকসই করতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত নীতি, আধুনিক অবকাঠামো এবং সহজ ও স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনা—এমনটাই মত সংশ্লিষ্টদের।
লেখকঃ শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
#আরইউএস
বিষয় : ব্যাংকিং

মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ জুন ২০২৬
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং খাত বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও দ্রুতবর্ধনশীল উৎস হিসেবে গড়ে উঠেছে। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবার বিস্তার, বৈশ্বিক রিমোট ওয়ার্ক সংস্কৃতির সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক ডিজিটাল মার্কেটপ্লেসে বাংলাদেশি পেশাজীবীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এই খাতের প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছে।
সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং, গ্রাফিক ডিজাইন, কনটেন্ট ডেভেলপমেন্ট, বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (BPO) এবং ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্সসহ বিভিন্ন খাতে কাজ করে দেশের লক্ষাধিক তরুণ নিয়মিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট শিল্পসূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই খাত থেকে বছরে কয়েক বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ বৈদেশিক আয় দেশে প্রবেশ করছে। রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি এটি এখন বৈদেশিক মুদ্রার একটি বিকল্প ও সম্ভাবনাময় উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে এই প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ব্যাংকিং, করনীতি ও পেমেন্ট অবকাঠামো ঘিরে একাধিক কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের অভিযোগও সামনে আসছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেস, পেমেন্ট প্রসেসর, ব্যাংক চার্জ এবং সম্ভাব্য কর কর্তনের পর অনেক ক্ষেত্রে ফ্রিল্যান্সারদের প্রকৃত হাতে পাওয়া অর্থ ক্লায়েন্টের মোট ব্যয়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ফ্রিল্যান্সাররা আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্ট বা মার্কেটপ্লেস থেকে উপার্জিত অর্থ দেশে আনার ক্ষেত্রে একাধিক স্তরের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। Payoneer, Wise, ব্যাংক ওয়্যার ট্রান্সফারসহ বিভিন্ন চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ দেশে এলেও প্রতিটি মাধ্যমেই রয়েছে আলাদা নিয়ম, চার্জ কাঠামো এবং ডকুমেন্টেশন জটিলতা।
ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ প্রাপ্তিতে সময়ক্ষেপণ, সার্ভিস চার্জ এবং আন্তর্জাতিক লেনদেন-সম্পর্কিত আনুষ্ঠানিকতা অনেক ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত বোঝা হিসেবে দেখা দিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বিশেষ করে বিভাগীয় শহর ও জেলা পর্যায়ের ফ্রিল্যান্সারদের জন্য ব্যাংকিং সেবা ও নথি ব্যবস্থাপনায় রাজধানীকেন্দ্রিক নির্ভরতা অতিরিক্ত সময় ও ব্যয় সৃষ্টি করছে।
ফ্রিল্যান্সিং আয়ের বৈধতা প্রমাণ, কর সুবিধা গ্রহণ এবং ব্যাংকিং রেকর্ড ব্যবস্থাপনার জন্য রেমিট্যান্স সার্টিফিকেট একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি।
তবে বিভিন্ন ব্যাংকিং চ্যানেলে এই সার্টিফিকেট প্রাপ্তির প্রক্রিয়া একরকম নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও সরাসরি আবেদন করতে হয়, কোথাও ই-মেইলের মাধ্যমে, আবার কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শাখায় শারীরিকভাবে উপস্থিত হতে হয়।
ফলে একই ধরনের আর্থিক লেনদেন হলেও প্রক্রিয়াগত ভিন্নতার কারণে ব্যবহারকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
বিশ্বের অন্যতম প্রধান ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম PayPal এখনো বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। ফলে আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং ইকোসিস্টেমে বাংলাদেশি পেশাজীবীদের জন্য বিকল্প পেমেন্ট চ্যানেলের ওপর নির্ভরতা বেশি।
বর্তমানে Payoneer ও Wise কিছুটা বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এগুলো বৈশ্বিক মানের পূর্ণাঙ্গ সমাধান নয় বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, উন্নত পেমেন্ট গেটওয়ের সীমিত উপস্থিতি আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্ট ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবসায়িক স্কেলিংয়ের ক্ষেত্রে একটি কাঠামোগত বাধা তৈরি করছে।
বিদেশি ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অর্থের ক্ষেত্রে কিছু দেশে উৎসে কর (Withholding Tax) প্রযোজ্য থাকে। ফলে অর্থ প্রেরণের আগেই একটি অংশ কেটে রাখা হয়।
এরপর দেশে প্রচলিত কর কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় না হলে একই আয়ের ওপর অতিরিক্ত কর-চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
বাংলাদেশের একাধিক দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় কর চুক্তি (DTA) থাকলেও এর ব্যবহারিক প্রয়োগ সীমিত বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। জটিল প্রক্রিয়া ও সচেতনতার অভাবে অনেক ফ্রিল্যান্সার এই সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন না।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসগুলোও আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কমিশন হিসেবে কেটে রাখে। Upwork, Fiverrসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম সাধারণত ফ্রিল্যান্সারদের কাছ থেকে সার্ভিস ফি গ্রহণ করে। একই সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে ক্লায়েন্টদের কাছ থেকেও আলাদা প্ল্যাটফর্ম ফি বা প্রসেসিং চার্জ নেওয়া হয়।
ফলে একজন ক্লায়েন্ট কোনো প্রকল্পের জন্য যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেন, তার পুরোটা ফ্রিল্যান্সারের হাতে পৌঁছায় না। প্ল্যাটফর্ম কমিশন, পেমেন্ট প্রসেসিং চার্জ, ব্যাংকিং ফি, মুদ্রা রূপান্তর ব্যয় এবং সম্ভাব্য উৎসে কর কর্তনের পর প্রকৃত প্রাপ্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সিং অর্থনীতিতে প্ল্যাটফর্ম কমিশন একটি স্বাভাবিক ব্যবসায়িক বাস্তবতা। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সীমিত পেমেন্ট অবকাঠামো, ব্যাংকিং জটিলতা এবং কর-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা যুক্ত হওয়ায় প্রকৃত আয়ের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কিছু বাণিজ্যিক ব্যাংক ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বিশেষায়িত ব্যাংকিং সেবা চালু করেছে, যেখানে বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব ও স্থানীয় মুদ্রা হিসাব আলাদাভাবে পরিচালনার সুযোগ রয়েছে।
এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি এখনো সীমিত পরিসরের মধ্যে রয়েছে এবং পুরো খাতের জন্য সমন্বিত সমাধান নয়।
অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রিল্যান্সিং খাতের সম্ভাবনাকে পূর্ণভাবে কাজে লাগাতে হলে কয়েকটি বিষয়ে নীতিগত সংস্কার প্রয়োজন।
তাদের মতে, এসব কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া খাতটির পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং খাতকে ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, কার্যকর নীতি সহায়তা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাত থেকে বার্ষিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি আয় সম্ভব।
তবে বর্তমান কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এই সম্ভাবনার পথে অন্যতম বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।
শেষ কথা
ফ্রিল্যান্সিং খাত এখন আর কেবল ব্যক্তিগত আয়ের উৎস নয়, এটি বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে এই খাতের সঙ্গে যুক্ত পেশাজীবীরা মনে করেন, তারা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করলেও তা ব্যবস্থাপনার কাঠামো এখনো সেই বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ফলে প্রশ্নটি এখন আর শুধু ব্যক্তিগত ভোগান্তির নয়; বরং একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক খাতের নীতি ও কাঠামোগত সক্ষমতার প্রশ্ন।
ডলার আয়ের এই নতুন অর্থনীতিকে টেকসই করতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত নীতি, আধুনিক অবকাঠামো এবং সহজ ও স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনা—এমনটাই মত সংশ্লিষ্টদের।
লেখকঃ শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
#আরইউএস

আপনার মতামত লিখুন