পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর জন্য ত্যাগ, তাকওয়া ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক অনন্য শিক্ষা বহন করে। কুরবানী কেবল পশু জবাইয়ের নাম নয়; বরং এটি আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য এবং মানবতার কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করার এক মহিমান্বিত ইবাদত।
শরীয়তের পরিভাষায়, আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে নির্ধারিত দিনে নির্দিষ্ট নিয়মে কিছু চতুষ্পদ প্রাণী জবাই করাকেই কুরবানী বলা হয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, মানুষ যেন নির্দিষ্ট দিনগুলোতে তাঁর নাম স্মরণ করে এবং তিনি যে গৃহপালিত পশু দান করেছেন তা থেকে আহার করে ও অসহায়-দরিদ্রদের আহার করায়।
সূরা হাজ্জের ৩৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, কুরবানির পশুর গোশত বা রক্ত তাঁর কাছে পৌঁছে না; বরং পৌঁছে মানুষের তাকওয়া ও খোদাভীতি। অর্থাৎ কুরবানির মূল উদ্দেশ্য বাহ্যিক আয়োজন নয়, বরং অন্তরের আন্তরিকতা ও আল্লাহভীতি।
ইসলামে কিছু পশুকে কুরবানির জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জাহেলি যুগে দেব-দেবীর নামে উৎসর্গ করা বা বিশেষ কুসংস্কারের সঙ্গে জড়িত ‘বহিরা’, ‘সায়েবা’, ‘ওয়াছিলা’ ও ‘হ্যাম’ ধরনের পশু কুরবানির উপযোগী নয়।
ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী, ১০ জিলহজ ঈদের নামাজের পর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কুরবানী করা যায়। তবে প্রথম দিন কুরবানী করা উত্তম। ঈদের নামাজের আগে কুরবানী করলে তা সহীহ হবে না। রাতের বেলায় কুরবানী করাকে মাকরুহ বলা হয়েছে।
শরীকী কুরবানির ক্ষেত্রে সকল অংশীদারের নিয়ত বিশুদ্ধ হওয়া জরুরি। কারও উপার্জন হারাম হলে বা কেউ শুধু গোশত ভক্ষণ করার উদ্দেশ্যে শরীক হলে কারও কুরবানীই সহীহ হবে না। একই সঙ্গে প্রত্যেকের অংশ সমান হতে হবে এবং গোশত পাল্লা দিয়ে মেপে বণ্টন করতে হবে।
আলেমরা বলেন, একটি বড় পশুর সাত ভাগের এক ভাগকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা বৈধ নয়। কারণ এতে সাত ভাগের পরিবর্তে আট ভাগ হয়ে যায়, যা শরীয়তসম্মত নয়।
যে ব্যক্তি নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক কিংবা যার ওপর সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব, তার ওপর কুরবানী করাও ওয়াজিব। কুরবানী আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় ইবাদত। হাদিসে এসেছে, কুরবানির পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে বান্দা একটি করে নেকি লাভ করে।
হাদিস অনুযায়ী, উটের বয়স কমপক্ষে পাঁচ বছর, গরু বা মহিষের দুই বছর এবং ছাগল বা ভেড়ার এক বছর হতে হবে। তবে দুম্বা ছয় মাসের হলেও চলবে যদি তা দেখতে এক বছরের মতো হয়।
কুরবানির পশু হতে হবে ত্রুটিমুক্ত। স্পষ্ট কানা, গুরুতর অসুস্থ, খোঁড়া বা অতিরিক্ত দুর্বল পশু কুরবানির জন্য বৈধ নয়। একইভাবে কান কাটা, শিং গোড়া থেকে উপড়ানো কিংবা চলাফেরায় অক্ষম পশুও কুরবানির অনুপযোগী।
ইসলামে কুরবানির গোশত তিন ভাগে ভাগ করা মুস্তাহাব। এক ভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনের জন্য এবং অপর ভাগ দরিদ্রদের জন্য রাখা উত্তম। তবে সম্পূর্ণ গোশত নিজে রেখে দিলেও কুরবানী সহীহ হবে, যদিও তা অনুচিত বলে উল্লেখ করেছেন আলেমরা।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা খাও, সদকা করো এবং কিছু সংরক্ষণ করো।” অর্থাৎ কুরবানির মাধ্যমে যেমন নিজের পরিবার উপকৃত হবে, তেমনি সমাজের অসহায় মানুষের মুখেও হাসি ফোটাতে হবে।
হাদিসে এসেছে, যদি কুরবানির পশুর পেটে বাচ্চা থাকে তবে মায়ের জবাইয়ের সঙ্গে বাচ্চার জবাইও হয়ে যায়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন, জবাইয়ের পর জীবিত বাচ্চা পাওয়া গেলে সেটিকে আলাদাভাবে জবাই করে খাওয়া বৈধ। মৃত পাওয়া গেলে তা না খাওয়াই উত্তম।
কুরবানির শিক্ষা কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের হৃদয়ে ত্যাগ, সহমর্মিতা ও আল্লাহভীতির চেতনা জাগ্রত করে। তাই কুরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য উপলব্ধি করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইখলাসের সঙ্গে এই ইবাদত পালন করাই একজন মুমিনের কর্তব্য।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলের কুরবানী কবুল করুন। আমিন।
লেখক: ড. মোহাম্মদ এমদাদ হোসেন
শিক্ষক, গবেষক ও প্রিন্সিপাল
শহীদ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কামারপাড়া, তুরাগ, উত্তরা, ঢাকা।

শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ মে ২০২৬
পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর জন্য ত্যাগ, তাকওয়া ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক অনন্য শিক্ষা বহন করে। কুরবানী কেবল পশু জবাইয়ের নাম নয়; বরং এটি আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য এবং মানবতার কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করার এক মহিমান্বিত ইবাদত।
শরীয়তের পরিভাষায়, আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে নির্ধারিত দিনে নির্দিষ্ট নিয়মে কিছু চতুষ্পদ প্রাণী জবাই করাকেই কুরবানী বলা হয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, মানুষ যেন নির্দিষ্ট দিনগুলোতে তাঁর নাম স্মরণ করে এবং তিনি যে গৃহপালিত পশু দান করেছেন তা থেকে আহার করে ও অসহায়-দরিদ্রদের আহার করায়।
সূরা হাজ্জের ৩৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, কুরবানির পশুর গোশত বা রক্ত তাঁর কাছে পৌঁছে না; বরং পৌঁছে মানুষের তাকওয়া ও খোদাভীতি। অর্থাৎ কুরবানির মূল উদ্দেশ্য বাহ্যিক আয়োজন নয়, বরং অন্তরের আন্তরিকতা ও আল্লাহভীতি।
ইসলামে কিছু পশুকে কুরবানির জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জাহেলি যুগে দেব-দেবীর নামে উৎসর্গ করা বা বিশেষ কুসংস্কারের সঙ্গে জড়িত ‘বহিরা’, ‘সায়েবা’, ‘ওয়াছিলা’ ও ‘হ্যাম’ ধরনের পশু কুরবানির উপযোগী নয়।
ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী, ১০ জিলহজ ঈদের নামাজের পর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কুরবানী করা যায়। তবে প্রথম দিন কুরবানী করা উত্তম। ঈদের নামাজের আগে কুরবানী করলে তা সহীহ হবে না। রাতের বেলায় কুরবানী করাকে মাকরুহ বলা হয়েছে।
শরীকী কুরবানির ক্ষেত্রে সকল অংশীদারের নিয়ত বিশুদ্ধ হওয়া জরুরি। কারও উপার্জন হারাম হলে বা কেউ শুধু গোশত ভক্ষণ করার উদ্দেশ্যে শরীক হলে কারও কুরবানীই সহীহ হবে না। একই সঙ্গে প্রত্যেকের অংশ সমান হতে হবে এবং গোশত পাল্লা দিয়ে মেপে বণ্টন করতে হবে।
আলেমরা বলেন, একটি বড় পশুর সাত ভাগের এক ভাগকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা বৈধ নয়। কারণ এতে সাত ভাগের পরিবর্তে আট ভাগ হয়ে যায়, যা শরীয়তসম্মত নয়।
যে ব্যক্তি নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক কিংবা যার ওপর সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব, তার ওপর কুরবানী করাও ওয়াজিব। কুরবানী আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় ইবাদত। হাদিসে এসেছে, কুরবানির পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে বান্দা একটি করে নেকি লাভ করে।
হাদিস অনুযায়ী, উটের বয়স কমপক্ষে পাঁচ বছর, গরু বা মহিষের দুই বছর এবং ছাগল বা ভেড়ার এক বছর হতে হবে। তবে দুম্বা ছয় মাসের হলেও চলবে যদি তা দেখতে এক বছরের মতো হয়।
কুরবানির পশু হতে হবে ত্রুটিমুক্ত। স্পষ্ট কানা, গুরুতর অসুস্থ, খোঁড়া বা অতিরিক্ত দুর্বল পশু কুরবানির জন্য বৈধ নয়। একইভাবে কান কাটা, শিং গোড়া থেকে উপড়ানো কিংবা চলাফেরায় অক্ষম পশুও কুরবানির অনুপযোগী।
ইসলামে কুরবানির গোশত তিন ভাগে ভাগ করা মুস্তাহাব। এক ভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনের জন্য এবং অপর ভাগ দরিদ্রদের জন্য রাখা উত্তম। তবে সম্পূর্ণ গোশত নিজে রেখে দিলেও কুরবানী সহীহ হবে, যদিও তা অনুচিত বলে উল্লেখ করেছেন আলেমরা।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা খাও, সদকা করো এবং কিছু সংরক্ষণ করো।” অর্থাৎ কুরবানির মাধ্যমে যেমন নিজের পরিবার উপকৃত হবে, তেমনি সমাজের অসহায় মানুষের মুখেও হাসি ফোটাতে হবে।
হাদিসে এসেছে, যদি কুরবানির পশুর পেটে বাচ্চা থাকে তবে মায়ের জবাইয়ের সঙ্গে বাচ্চার জবাইও হয়ে যায়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন, জবাইয়ের পর জীবিত বাচ্চা পাওয়া গেলে সেটিকে আলাদাভাবে জবাই করে খাওয়া বৈধ। মৃত পাওয়া গেলে তা না খাওয়াই উত্তম।
কুরবানির শিক্ষা কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের হৃদয়ে ত্যাগ, সহমর্মিতা ও আল্লাহভীতির চেতনা জাগ্রত করে। তাই কুরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য উপলব্ধি করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইখলাসের সঙ্গে এই ইবাদত পালন করাই একজন মুমিনের কর্তব্য।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলের কুরবানী কবুল করুন। আমিন।
লেখক: ড. মোহাম্মদ এমদাদ হোসেন
শিক্ষক, গবেষক ও প্রিন্সিপাল
শহীদ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কামারপাড়া, তুরাগ, উত্তরা, ঢাকা।

আপনার মতামত লিখুন