ঢাকা    শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

দেশে ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাব, ঝুঁকিতে প্রায় ২ কোটি শিশু


নিজস্ব প্রতিনিধি
নিজস্ব প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২০ মে ২০২৬

দেশে ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাব, ঝুঁকিতে প্রায় ২ কোটি শিশু

বাংলাদেশে আবারও ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়ছে হাম রোগ। দেশের বিভিন্ন জেলায় দ্রুত বাড়ছে সংক্রমণ, বাড়ছে শিশু মৃত্যুর আশঙ্কাও। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের টিকাদান ঘাটতি, অপুষ্টি এবং স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতার কারণে পরিস্থিতি এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। গবেষণা ও স্বাস্থ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের ৫৮টি জেলায় হাম সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে এবং প্রায় ২ কোটি শিশু বর্তমানে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

সংক্রমণ বাড়ছে দ্রুত

২০২৬ সালের শুরু থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় হাম আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়তে থাকে। এপ্রিল পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সন্দেহজনক আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১৯ হাজার ছাড়িয়েছে। নিশ্চিতভাবে আক্রান্ত হয়েছে কয়েক হাজার শিশু এবং মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে বহু এলাকায়। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। একজন আক্রান্ত শিশু থেকে খুব সহজেই আরও অনেক শিশু সংক্রমিত হতে পারে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, বস্তি অঞ্চল এবং যেখানে টিকাদানের হার কম—সেসব এলাকাতেই সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।

টিকাদানে বড় ঘাটতি

স্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় কারণ হলো টিকাদানের হার কমে যাওয়া। হাম প্রতিরোধে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হয়। কিন্তু বর্তমানে সেই হার অনেক নিচে নেমে গেছে।

অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে এমআর (Measles-Rubella) টিকা পায়নি। আবার অনেক পরিবার টিকার বিষয়ে সচেতন না হওয়ায় শিশুরা পুরোপুরি অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের বড় একটি অংশ কোনো টিকাই নেয়নি বলে তথ্য উঠে এসেছে।

কেন ভয়ংকর হাম?

অনেকে হামকে সাধারণ জ্বর বা ফুসকুড়ি ভেবে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, হাম প্রাণঘাতী জটিলতা তৈরি করতে পারে।

হামের সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—

  • উচ্চ জ্বর
  • কাশি
  • চোখ লাল হওয়া
  • নাক দিয়ে পানি পড়া
  • শরীরে লাল ফুসকুড়ি

তবে জটিল অবস্থায় এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কে সংক্রমণ এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি।

স্বাস্থ্যখাতে বাড়ছে চাপ

দেশের শিশু হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ। অনেক জায়গায় আলাদা আইসোলেশন ব্যবস্থা না থাকায় সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চিকিৎসকরা দ্রুত গণটিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখনই জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। তারা বলছেন—

  • সারা দেশে বিশেষ টিকাদান অভিযান চালাতে হবে
  • প্রতিটি শিশুর টিকা নিশ্চিত করতে হবে
  • স্কুল ও কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে
  • আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে
  • ভিটামিন-এ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে

অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান

চিকিৎসকরা অভিভাবকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। শিশুর টিকা কার্ড যাচাই করা, নির্ধারিত সময়ে টিকা দেওয়া এবং জ্বর বা ফুসকুড়ি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশ একসময় হাম নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক এই প্রাদুর্ভাব নতুন করে বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ৩০ মে ২০২৬


দেশে ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাব, ঝুঁকিতে প্রায় ২ কোটি শিশু

প্রকাশের তারিখ : ২০ মে ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশে আবারও ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়ছে হাম রোগ। দেশের বিভিন্ন জেলায় দ্রুত বাড়ছে সংক্রমণ, বাড়ছে শিশু মৃত্যুর আশঙ্কাও। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের টিকাদান ঘাটতি, অপুষ্টি এবং স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতার কারণে পরিস্থিতি এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। গবেষণা ও স্বাস্থ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের ৫৮টি জেলায় হাম সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে এবং প্রায় ২ কোটি শিশু বর্তমানে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

সংক্রমণ বাড়ছে দ্রুত

২০২৬ সালের শুরু থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় হাম আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়তে থাকে। এপ্রিল পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সন্দেহজনক আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১৯ হাজার ছাড়িয়েছে। নিশ্চিতভাবে আক্রান্ত হয়েছে কয়েক হাজার শিশু এবং মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে বহু এলাকায়। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। একজন আক্রান্ত শিশু থেকে খুব সহজেই আরও অনেক শিশু সংক্রমিত হতে পারে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, বস্তি অঞ্চল এবং যেখানে টিকাদানের হার কম—সেসব এলাকাতেই সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।

টিকাদানে বড় ঘাটতি

স্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় কারণ হলো টিকাদানের হার কমে যাওয়া। হাম প্রতিরোধে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হয়। কিন্তু বর্তমানে সেই হার অনেক নিচে নেমে গেছে।

অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে এমআর (Measles-Rubella) টিকা পায়নি। আবার অনেক পরিবার টিকার বিষয়ে সচেতন না হওয়ায় শিশুরা পুরোপুরি অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের বড় একটি অংশ কোনো টিকাই নেয়নি বলে তথ্য উঠে এসেছে।

কেন ভয়ংকর হাম?

অনেকে হামকে সাধারণ জ্বর বা ফুসকুড়ি ভেবে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, হাম প্রাণঘাতী জটিলতা তৈরি করতে পারে।

হামের সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—

  • উচ্চ জ্বর
  • কাশি
  • চোখ লাল হওয়া
  • নাক দিয়ে পানি পড়া
  • শরীরে লাল ফুসকুড়ি

তবে জটিল অবস্থায় এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কে সংক্রমণ এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি।

স্বাস্থ্যখাতে বাড়ছে চাপ

দেশের শিশু হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ। অনেক জায়গায় আলাদা আইসোলেশন ব্যবস্থা না থাকায় সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চিকিৎসকরা দ্রুত গণটিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখনই জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। তারা বলছেন—

  • সারা দেশে বিশেষ টিকাদান অভিযান চালাতে হবে
  • প্রতিটি শিশুর টিকা নিশ্চিত করতে হবে
  • স্কুল ও কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে
  • আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে
  • ভিটামিন-এ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে

অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান

চিকিৎসকরা অভিভাবকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। শিশুর টিকা কার্ড যাচাই করা, নির্ধারিত সময়ে টিকা দেওয়া এবং জ্বর বা ফুসকুড়ি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশ একসময় হাম নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক এই প্রাদুর্ভাব নতুন করে বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ