ঢাকা    শনিবার, ০৯ মে ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

দুই পা হারিয়ে বিছানায় নুরুল ইসলাম, নিভতে বসেছে জীবনপ্রদীপ



দুই পা হারিয়ে বিছানায় নুরুল ইসলাম, নিভতে বসেছে জীবনপ্রদীপ
ছবি : প্রতিনিধি

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলা-এর সতরদ্রোন গ্রামের বাসিন্দা মো. নুরুল ইসলাম (৪৫)। একসময় স্বপ্ন ছিল প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবেন, দূর করবেন দারিদ্র্যের কষ্ট। কিন্তু নির্মম বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন আজ ভেঙে চুরমার। দুই পা হারিয়ে এখন তিনি বিছানায় শয্যাশায়ী। চিকিৎসা ও জীবিকার সংকটে তার জীবনপ্রদীপ যেন ধীরে ধীরে নিভে যাওয়ার পথে।

প্রায় ১২ বছর আগে শেষ সম্বল জমি-জমা বিক্রি করে তিনি পাড়ি জমিয়েছিলেন ওমান-এ। সেখানে ভাগ্য সহায় না হওয়ায় দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু হাল ছাড়েননি। আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতায় আবারও নতুন স্বপ্ন নিয়ে যান মালয়েশিয়া-তে। শুরুতে সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও কিছুদিনের মধ্যেই তার পায়ে দেখা দেয় ভয়াবহ পচন রোগ, যা পরে গ্যাংরিন হিসেবে শনাক্ত হয়। কর্মস্থলের কোম্পানি কোনো সহায়তা না দিয়ে তাকে অসুস্থ অবস্থায় দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়।

দেশে ফিরে শুরু হয় তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়। চিকিৎসার জন্য একের পর এক অস্ত্রোপচার করতে হয়। প্রথমে ডান পা হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলতে হয়, কিন্তু সংক্রমণ বাড়তে থাকায় সেটি হাঁটুর ওপর পর্যন্ত অপসারণ করতে হয়। একইভাবে বাম পায়েও পচন ছড়িয়ে পড়ে। ধাপে ধাপে আঙুল থেকে শুরু করে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত কাটার পর শেষমেশ বাম পা-টিও হাঁটুর ওপর থেকে কেটে ফেলতে বাধ্য হন চিকিৎসকরা।

বর্তমানে তার শরীরে নতুন করে সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বাম পায়ের অবশিষ্ট অংশে আবারও পচন ধরেছে, যার জন্য জরুরি অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। কিন্তু সেই চিকিৎসার ব্যয় বহন করার মতো সামর্থ্য তার নেই। অর্থাভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বন্ধ হয়ে আছে, আর প্রতিদিনই বাড়ছে অনিশ্চয়তা।

শুধু শারীরিক কষ্টই নয়, নুরুল ইসলামের জীবনে নেমে এসেছে গভীর পারিবারিক বিপর্যয়ও। অসুস্থতার সময় পাশে থাকার বদলে তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যান। কোনো ভাই-বোন নেই তার। বাবা মো. নেন্দু মিয়া অনেক আগেই মারা গেছেন। বর্তমানে বাড়িতে আছেন শুধু তার বৃদ্ধ মা হাজেরা খাতুন—কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তিনিও গত এক বছর ধরে প্যারালাইসিস-এ আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। নিজের যত্ন নেওয়ার সামর্থ্যও নেই তার।

নিজের অসহায় পরিস্থিতির কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, তিনি বাঁচতে চান। চিকিৎসার জন্য সরকারের পাশাপাশি দেশ-বিদেশের মানুষের সহায়তা কামনা করেন। একসময় একটি ছোট দোকান চালিয়ে সংসার চালাতেন, কিন্তু এখন চলাফেরা করতে না পারায় সেই পথও বন্ধ হয়ে গেছে।

মা হাজেরা খাতুন নিজের অসুস্থতার চেয়ে ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি জানান, তাদের আর কোনো অবলম্বন নেই। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের সহায়তা ছাড়া বেঁচে থাকার পথও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য মো. বিরাজ মিয়া বলেন, শুরুতে এলাকাবাসী চাঁদা তুলে চিকিৎসার খরচ জোগালেও এখন আর সেই সহায়তা অব্যাহত রাখা সম্ভব হচ্ছে না। নুরুল ইসলামের পাশে দাঁড়ানোর মতো ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ও নেই। সরকারি সহায়তা এবং প্রবাসীদের সহযোগিতা ছাড়া তাকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়বে।

প্রতিবেশী রাকিব আহম্মেদ জানান, যখন নুরুল ইসলামের পায়ে গ্যাংরিন ধরা পড়ে, তখনই তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যান। বর্তমানে মা-ছেলে দুজনই অসুস্থ অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দেখাশোনা করার মতো কেউ নেই তাদের।

এ বিষয়ে কটিয়াদী উপজেলা প্রশাসন-এর নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীমা আফরোজ মারলিজ জানান, বিষয়টি তার নজরে এসেছে এবং অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নুরুল ইসলামের এই করুণ বাস্তবতা শুধু একটি পরিবারের দুর্দশার গল্প নয়- এটি আমাদের সমাজের কাছে এক মানবিক আহ্বান, যেখানে সামান্য সহানুভূতি ও সহযোগিতাই হয়তো ফিরিয়ে দিতে পারে একটি নিভতে বসা জীবনের আলো।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ০৯ মে ২০২৬


দুই পা হারিয়ে বিছানায় নুরুল ইসলাম, নিভতে বসেছে জীবনপ্রদীপ

প্রকাশের তারিখ : ০৪ মে ২০২৬

featured Image

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলা-এর সতরদ্রোন গ্রামের বাসিন্দা মো. নুরুল ইসলাম (৪৫)। একসময় স্বপ্ন ছিল প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবেন, দূর করবেন দারিদ্র্যের কষ্ট। কিন্তু নির্মম বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন আজ ভেঙে চুরমার। দুই পা হারিয়ে এখন তিনি বিছানায় শয্যাশায়ী। চিকিৎসা ও জীবিকার সংকটে তার জীবনপ্রদীপ যেন ধীরে ধীরে নিভে যাওয়ার পথে।

প্রায় ১২ বছর আগে শেষ সম্বল জমি-জমা বিক্রি করে তিনি পাড়ি জমিয়েছিলেন ওমান-এ। সেখানে ভাগ্য সহায় না হওয়ায় দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু হাল ছাড়েননি। আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতায় আবারও নতুন স্বপ্ন নিয়ে যান মালয়েশিয়া-তে। শুরুতে সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও কিছুদিনের মধ্যেই তার পায়ে দেখা দেয় ভয়াবহ পচন রোগ, যা পরে গ্যাংরিন হিসেবে শনাক্ত হয়। কর্মস্থলের কোম্পানি কোনো সহায়তা না দিয়ে তাকে অসুস্থ অবস্থায় দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়।

দেশে ফিরে শুরু হয় তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়। চিকিৎসার জন্য একের পর এক অস্ত্রোপচার করতে হয়। প্রথমে ডান পা হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলতে হয়, কিন্তু সংক্রমণ বাড়তে থাকায় সেটি হাঁটুর ওপর পর্যন্ত অপসারণ করতে হয়। একইভাবে বাম পায়েও পচন ছড়িয়ে পড়ে। ধাপে ধাপে আঙুল থেকে শুরু করে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত কাটার পর শেষমেশ বাম পা-টিও হাঁটুর ওপর থেকে কেটে ফেলতে বাধ্য হন চিকিৎসকরা।

বর্তমানে তার শরীরে নতুন করে সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বাম পায়ের অবশিষ্ট অংশে আবারও পচন ধরেছে, যার জন্য জরুরি অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। কিন্তু সেই চিকিৎসার ব্যয় বহন করার মতো সামর্থ্য তার নেই। অর্থাভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বন্ধ হয়ে আছে, আর প্রতিদিনই বাড়ছে অনিশ্চয়তা।

শুধু শারীরিক কষ্টই নয়, নুরুল ইসলামের জীবনে নেমে এসেছে গভীর পারিবারিক বিপর্যয়ও। অসুস্থতার সময় পাশে থাকার বদলে তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যান। কোনো ভাই-বোন নেই তার। বাবা মো. নেন্দু মিয়া অনেক আগেই মারা গেছেন। বর্তমানে বাড়িতে আছেন শুধু তার বৃদ্ধ মা হাজেরা খাতুন—কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তিনিও গত এক বছর ধরে প্যারালাইসিস-এ আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। নিজের যত্ন নেওয়ার সামর্থ্যও নেই তার।

নিজের অসহায় পরিস্থিতির কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, তিনি বাঁচতে চান। চিকিৎসার জন্য সরকারের পাশাপাশি দেশ-বিদেশের মানুষের সহায়তা কামনা করেন। একসময় একটি ছোট দোকান চালিয়ে সংসার চালাতেন, কিন্তু এখন চলাফেরা করতে না পারায় সেই পথও বন্ধ হয়ে গেছে।

মা হাজেরা খাতুন নিজের অসুস্থতার চেয়ে ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি জানান, তাদের আর কোনো অবলম্বন নেই। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের সহায়তা ছাড়া বেঁচে থাকার পথও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য মো. বিরাজ মিয়া বলেন, শুরুতে এলাকাবাসী চাঁদা তুলে চিকিৎসার খরচ জোগালেও এখন আর সেই সহায়তা অব্যাহত রাখা সম্ভব হচ্ছে না। নুরুল ইসলামের পাশে দাঁড়ানোর মতো ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ও নেই। সরকারি সহায়তা এবং প্রবাসীদের সহযোগিতা ছাড়া তাকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়বে।

প্রতিবেশী রাকিব আহম্মেদ জানান, যখন নুরুল ইসলামের পায়ে গ্যাংরিন ধরা পড়ে, তখনই তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যান। বর্তমানে মা-ছেলে দুজনই অসুস্থ অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দেখাশোনা করার মতো কেউ নেই তাদের।

এ বিষয়ে কটিয়াদী উপজেলা প্রশাসন-এর নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীমা আফরোজ মারলিজ জানান, বিষয়টি তার নজরে এসেছে এবং অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নুরুল ইসলামের এই করুণ বাস্তবতা শুধু একটি পরিবারের দুর্দশার গল্প নয়- এটি আমাদের সমাজের কাছে এক মানবিক আহ্বান, যেখানে সামান্য সহানুভূতি ও সহযোগিতাই হয়তো ফিরিয়ে দিতে পারে একটি নিভতে বসা জীবনের আলো।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ