ঢাকা    শনিবার, ০২ মে ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

আকরিক লোহার বাণিজ্যে ডলারের আধিপত্যে হোঁচট


নিজস্ব প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০২ মে ২০২৬

আকরিক লোহার বাণিজ্যে ডলারের আধিপত্যে হোঁচট

বিশ্ব বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের দীর্ঘদিনের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ধীরে ধীরে নিজেদের মুদ্রা ইউয়ানের অবস্থান শক্ত করছে চীন। সর্বশেষ আকরিক লোহার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন এনে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে দেশটি। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক বৃহৎ খনি কোম্পানি বিএইচপির সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর চীনা ইস্পাত খাত এখন আংশিকভাবে ইউয়ানে আকরিক লোহা আমদানি করবে, যা বৈশ্বিক পণ্যবাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এতদিন ধরে বিএইচপি থেকে চীনে রপ্তানি হওয়া আকরিক লোহা পুরোপুরি মার্কিন ডলারে মূল্যায়িত হয়ে আসছিল। তবে নতুন সমঝোতার ফলে ভবিষ্যতে এই বাণিজ্যের একটি অংশ ইউয়ানে নিষ্পত্তি হবে। এই পরিবর্তনকে চীনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে তারা ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক পণ্যবাজারে নিজেদের মুদ্রার ব্যবহার বাড়াতে চায়।

এই অগ্রগতির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে চীনের নতুন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান চায়না মিনারেল রিসোর্সেস গ্রুপ (সিএমআরজি)। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে আকরিক লোহা আমদানির মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার জন্য চাপ দিয়ে আসছিল। তারা প্রচলিত পশ্চিমা সূচকের পরিবর্তে চীনা সূচক ব্যবহারের দাবি জানায়। আলোচনার এক পর্যায়ে সরবরাহ ও মূল্য নির্ধারণ নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

বিএইচপি শুরুতে তাদের সরাসরি বিক্রয় চুক্তি এবং বিদ্যমান মূল্য নির্ধারণ কাঠামো বজায় রাখতে অনড় অবস্থানে ছিল। তবে দীর্ঘ সাত মাসের বিরোধ ও কূটনৈতিক আলোচনার পর অবশেষে একটি নতুন সমঝোতা হয়। এই চুক্তিতে চীনের নিজস্ব মূল্য নির্ধারণ সূচককে আংশিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরবরাহকৃত আকরিক লোহার ওপর প্রায় ১ দশমিক ৮ শতাংশ ছাড়ও দিতে রাজি হয় বিএইচপি।

চীন দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বৈশ্বিক মূল্য সূচকের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। বিশেষ করে পণ্যবাজারে প্ল্যাটসসহ পশ্চিমা সূচকের বিকল্প হিসেবে নিজেদের ‘বেইজিং আয়রন অর পোর্ট স্পট প্রাইস ইনডেক্স’ ব্যবহারের দাবি জোরদার করেছে দেশটি। সর্বশেষ চুক্তিতে এই চীনা সূচক ব্যবহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সেটিকে বড় কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন শুধু আকরিক লোহা বাণিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় ধীরে ধীরে ডলারের একচ্ছত্র প্রভাব কমানোর একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ। ইতোমধ্যে তেল, ঋণ বাজার এবং অন্যান্য পণ্যবাজারেও ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে একটি বহুমুদ্রা ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

অন্যদিকে পশ্চিমা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও চীনের অফশোর ঋণ বাজারে আগ্রহ বাড়াচ্ছে। কম সুদের হার এবং বিকল্প বিনিয়োগ সুযোগের কারণে আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীরা ইউয়ানভিত্তিক লেনদেনে ঝুঁকছে। এতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যে নতুন পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বিশ্বের বৃহত্তম পণ্যভোক্তা দেশ হওয়া সত্ত্বেও এতদিন চীনের বাণিজ্যিক লেনদেন মূলত ডলারের ওপর নির্ভরশীল ছিল। নতুন এই পরিবর্তন সেই কাঠামোতে ধীরে ধীরে রূপান্তরের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে আন্তর্জাতিক পণ্যবাজারে মুদ্রা ব্যবহারের ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।

বিষয় : আকরিক লোহা

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ০২ মে ২০২৬


আকরিক লোহার বাণিজ্যে ডলারের আধিপত্যে হোঁচট

প্রকাশের তারিখ : ০২ মে ২০২৬

featured Image

বিশ্ব বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের দীর্ঘদিনের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ধীরে ধীরে নিজেদের মুদ্রা ইউয়ানের অবস্থান শক্ত করছে চীন। সর্বশেষ আকরিক লোহার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন এনে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে দেশটি। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক বৃহৎ খনি কোম্পানি বিএইচপির সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর চীনা ইস্পাত খাত এখন আংশিকভাবে ইউয়ানে আকরিক লোহা আমদানি করবে, যা বৈশ্বিক পণ্যবাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এতদিন ধরে বিএইচপি থেকে চীনে রপ্তানি হওয়া আকরিক লোহা পুরোপুরি মার্কিন ডলারে মূল্যায়িত হয়ে আসছিল। তবে নতুন সমঝোতার ফলে ভবিষ্যতে এই বাণিজ্যের একটি অংশ ইউয়ানে নিষ্পত্তি হবে। এই পরিবর্তনকে চীনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে তারা ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক পণ্যবাজারে নিজেদের মুদ্রার ব্যবহার বাড়াতে চায়।

এই অগ্রগতির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে চীনের নতুন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান চায়না মিনারেল রিসোর্সেস গ্রুপ (সিএমআরজি)। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে আকরিক লোহা আমদানির মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার জন্য চাপ দিয়ে আসছিল। তারা প্রচলিত পশ্চিমা সূচকের পরিবর্তে চীনা সূচক ব্যবহারের দাবি জানায়। আলোচনার এক পর্যায়ে সরবরাহ ও মূল্য নির্ধারণ নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

বিএইচপি শুরুতে তাদের সরাসরি বিক্রয় চুক্তি এবং বিদ্যমান মূল্য নির্ধারণ কাঠামো বজায় রাখতে অনড় অবস্থানে ছিল। তবে দীর্ঘ সাত মাসের বিরোধ ও কূটনৈতিক আলোচনার পর অবশেষে একটি নতুন সমঝোতা হয়। এই চুক্তিতে চীনের নিজস্ব মূল্য নির্ধারণ সূচককে আংশিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরবরাহকৃত আকরিক লোহার ওপর প্রায় ১ দশমিক ৮ শতাংশ ছাড়ও দিতে রাজি হয় বিএইচপি।

চীন দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বৈশ্বিক মূল্য সূচকের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। বিশেষ করে পণ্যবাজারে প্ল্যাটসসহ পশ্চিমা সূচকের বিকল্প হিসেবে নিজেদের ‘বেইজিং আয়রন অর পোর্ট স্পট প্রাইস ইনডেক্স’ ব্যবহারের দাবি জোরদার করেছে দেশটি। সর্বশেষ চুক্তিতে এই চীনা সূচক ব্যবহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সেটিকে বড় কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন শুধু আকরিক লোহা বাণিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় ধীরে ধীরে ডলারের একচ্ছত্র প্রভাব কমানোর একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ। ইতোমধ্যে তেল, ঋণ বাজার এবং অন্যান্য পণ্যবাজারেও ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে একটি বহুমুদ্রা ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

অন্যদিকে পশ্চিমা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও চীনের অফশোর ঋণ বাজারে আগ্রহ বাড়াচ্ছে। কম সুদের হার এবং বিকল্প বিনিয়োগ সুযোগের কারণে আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীরা ইউয়ানভিত্তিক লেনদেনে ঝুঁকছে। এতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যে নতুন পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বিশ্বের বৃহত্তম পণ্যভোক্তা দেশ হওয়া সত্ত্বেও এতদিন চীনের বাণিজ্যিক লেনদেন মূলত ডলারের ওপর নির্ভরশীল ছিল। নতুন এই পরিবর্তন সেই কাঠামোতে ধীরে ধীরে রূপান্তরের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে আন্তর্জাতিক পণ্যবাজারে মুদ্রা ব্যবহারের ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০২৪১০৯১৭৩০
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: 01711-070054

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ