পার্বত্য জেলা বান্দরবানের রোয়াংছড়িতে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব 'বুদ্ধ পূর্ণিমা' এ বছরও গভীর শ্রদ্ধা, ভক্তি ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হচ্ছে।
ত্রি-স্মৃতি বিজড়িত এই পবিত্র দিনে গৌতম বুদ্ধের জন্ম, বুদ্ধত্ব লাভ এবং মহাপরিনির্বাণকে স্মরণ করে দিনব্যাপী নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালিত হচ্ছে, যা পুরো উপজেলাজুড়ে সৃষ্টি করেছে এক অনন্য আধ্যাত্মিক আবহ।
বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই রোয়াংছড়ির কেন্দ্রীয় জেতবন বৌদ্ধ বিহারসহ উপজেলার ছোট-বড় সব বিহার প্রাঙ্গণে পুণ্যার্থীদের উপস্থিতিতে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়। ভক্তরা পরিচ্ছন্ন পোশাকে বিহারে এসে ধর্মীয় নিয়ম-কানুন মেনে পূজা-অর্চনায় অংশ নেন। সকাল সাড়ে ৯টায় কেন্দ্রীয় জেতবন বৌদ্ধ বিহার থেকে এক বিশাল বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়, যা ছিল দিনের অন্যতম আকর্ষণ। রঙিন ব্যানার, ফুলে সজ্জিত প্রতীকী উপকরণ এবং ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত নারী-পুরুষ ও শিশুদের অংশগ্রহণে শোভাযাত্রাটি হয়ে ওঠে দৃষ্টিনন্দন।
জেতবন বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ ভদন্ত পঞ্ঞনাইদা মহাথেরের নেতৃত্বে আয়োজিত এই শোভাযাত্রায় বিভিন্ন বিহারের ভিক্ষু সংঘ, দায়ক-দায়িকা এবং শত শত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী অংশ নেন। শোভাযাত্রাটি উপজেলার প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে বটতলি এলাকায় গিয়ে প্রথম পর্বের সমাপ্তি ঘটে। পথিমধ্যে স্থানীয় বাসিন্দারাও এই শোভাযাত্রা উপভোগ করেন এবং অনেকেই এতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন।
দিনের শুরুতেই ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে ছোয়াইন পূজা (অন্নদান) অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ভিক্ষুদের মাঝে আহার দান করা হয়। এরপর বোধিবৃক্ষের মূলে চন্দন জল ঢেলে পূজা অর্চনা, প্রদীপ প্রজ্বলন এবং পবিত্র পটঠান সূত্র পাঠ করা হয়। এসব আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ভক্তরা বুদ্ধের শান্তি, অহিংসা ও মৈত্রীর বাণী হৃদয়ে ধারণ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলতে থাকে সমবেত প্রার্থনা, যেখানে আবালবৃদ্ধবনিতা অংশ নিয়ে দেশ, জাতি ও সমগ্র বিশ্বের কল্যাণ কামনা করেন।
বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্ব। এ পর্বে হাজারো দায়ক-দায়িকা বিভিন্ন পাত্রে চন্দন জল, ফুল এবং মঙ্গল বৃক্ষের পাতা (বিশেষত জামপাতা) নিয়ে বৃক্ষ পূজায় অংশ নেবেন। পাশাপাশি আয়োজিত হবে ধর্মীয় আলোচনা সভা, যেখানে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা পঞ্চশীল, অষ্টশীল ও নবমশীল গ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের আত্মশুদ্ধির পাশাপাশি দেশ ও মানবজাতির মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করবেন।
কেন্দ্রীয় জেতবন বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ ভদন্ত পঞ্ঞনাইদা মহাথেরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ধর্মীয় সভায় প্রাজ্ঞ ভিক্ষু সংঘ বুদ্ধের জীবনাদর্শ, মানবকল্যাণ, সহনশীলতা এবং অহিংস দর্শন নিয়ে দেশনা প্রদান করবেন। এতে অংশগ্রহণকারীরা নৈতিকতা, সংযম ও মানবিক মূল্যবোধের গুরুত্ব সম্পর্কে দিকনির্দেশনা লাভ করবেন।
রোয়াংছড়ি সদর ছাড়াও উপজেলার প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলের ছোট-বড় সব বৌদ্ধ বিহারেও একইভাবে বুদ্ধ পূর্ণিমা উদযাপিত হচ্ছে। প্রতিটি এলাকায় উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে, তবে তার সঙ্গে রয়েছে গভীর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য। শান্তি, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের বার্তা ছড়িয়ে দিতে এই পবিত্র তিথিটি পালন করছেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা।
সব মিলিয়ে, 'বুদ্ধ পূর্ণিমা' শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি মানবতা, শান্তি ও সৌহার্দ্যের এক অনন্য বার্তা বহন করে- যা আজকের বিশ্বে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।

শনিবার, ০২ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬
পার্বত্য জেলা বান্দরবানের রোয়াংছড়িতে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব 'বুদ্ধ পূর্ণিমা' এ বছরও গভীর শ্রদ্ধা, ভক্তি ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হচ্ছে।
ত্রি-স্মৃতি বিজড়িত এই পবিত্র দিনে গৌতম বুদ্ধের জন্ম, বুদ্ধত্ব লাভ এবং মহাপরিনির্বাণকে স্মরণ করে দিনব্যাপী নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালিত হচ্ছে, যা পুরো উপজেলাজুড়ে সৃষ্টি করেছে এক অনন্য আধ্যাত্মিক আবহ।
বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই রোয়াংছড়ির কেন্দ্রীয় জেতবন বৌদ্ধ বিহারসহ উপজেলার ছোট-বড় সব বিহার প্রাঙ্গণে পুণ্যার্থীদের উপস্থিতিতে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়। ভক্তরা পরিচ্ছন্ন পোশাকে বিহারে এসে ধর্মীয় নিয়ম-কানুন মেনে পূজা-অর্চনায় অংশ নেন। সকাল সাড়ে ৯টায় কেন্দ্রীয় জেতবন বৌদ্ধ বিহার থেকে এক বিশাল বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়, যা ছিল দিনের অন্যতম আকর্ষণ। রঙিন ব্যানার, ফুলে সজ্জিত প্রতীকী উপকরণ এবং ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত নারী-পুরুষ ও শিশুদের অংশগ্রহণে শোভাযাত্রাটি হয়ে ওঠে দৃষ্টিনন্দন।
জেতবন বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ ভদন্ত পঞ্ঞনাইদা মহাথেরের নেতৃত্বে আয়োজিত এই শোভাযাত্রায় বিভিন্ন বিহারের ভিক্ষু সংঘ, দায়ক-দায়িকা এবং শত শত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী অংশ নেন। শোভাযাত্রাটি উপজেলার প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে বটতলি এলাকায় গিয়ে প্রথম পর্বের সমাপ্তি ঘটে। পথিমধ্যে স্থানীয় বাসিন্দারাও এই শোভাযাত্রা উপভোগ করেন এবং অনেকেই এতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন।
দিনের শুরুতেই ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে ছোয়াইন পূজা (অন্নদান) অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ভিক্ষুদের মাঝে আহার দান করা হয়। এরপর বোধিবৃক্ষের মূলে চন্দন জল ঢেলে পূজা অর্চনা, প্রদীপ প্রজ্বলন এবং পবিত্র পটঠান সূত্র পাঠ করা হয়। এসব আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ভক্তরা বুদ্ধের শান্তি, অহিংসা ও মৈত্রীর বাণী হৃদয়ে ধারণ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলতে থাকে সমবেত প্রার্থনা, যেখানে আবালবৃদ্ধবনিতা অংশ নিয়ে দেশ, জাতি ও সমগ্র বিশ্বের কল্যাণ কামনা করেন।
বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্ব। এ পর্বে হাজারো দায়ক-দায়িকা বিভিন্ন পাত্রে চন্দন জল, ফুল এবং মঙ্গল বৃক্ষের পাতা (বিশেষত জামপাতা) নিয়ে বৃক্ষ পূজায় অংশ নেবেন। পাশাপাশি আয়োজিত হবে ধর্মীয় আলোচনা সভা, যেখানে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা পঞ্চশীল, অষ্টশীল ও নবমশীল গ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের আত্মশুদ্ধির পাশাপাশি দেশ ও মানবজাতির মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করবেন।
কেন্দ্রীয় জেতবন বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ ভদন্ত পঞ্ঞনাইদা মহাথেরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ধর্মীয় সভায় প্রাজ্ঞ ভিক্ষু সংঘ বুদ্ধের জীবনাদর্শ, মানবকল্যাণ, সহনশীলতা এবং অহিংস দর্শন নিয়ে দেশনা প্রদান করবেন। এতে অংশগ্রহণকারীরা নৈতিকতা, সংযম ও মানবিক মূল্যবোধের গুরুত্ব সম্পর্কে দিকনির্দেশনা লাভ করবেন।
রোয়াংছড়ি সদর ছাড়াও উপজেলার প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলের ছোট-বড় সব বৌদ্ধ বিহারেও একইভাবে বুদ্ধ পূর্ণিমা উদযাপিত হচ্ছে। প্রতিটি এলাকায় উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে, তবে তার সঙ্গে রয়েছে গভীর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য। শান্তি, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের বার্তা ছড়িয়ে দিতে এই পবিত্র তিথিটি পালন করছেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা।
সব মিলিয়ে, 'বুদ্ধ পূর্ণিমা' শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি মানবতা, শান্তি ও সৌহার্দ্যের এক অনন্য বার্তা বহন করে- যা আজকের বিশ্বে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।

আপনার মতামত লিখুন