পার্বত্য চট্টগ্রামের রোয়াংছড়ি উপজেলায় মারমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক ও ধর্মীয় নববর্ষ উৎসব ‘সাংগ্রাই’ এবারও বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা, আনন্দ-উল্লাস এবং সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে উদযাপিত হয়েছে। পাহাড়ি জনপদের এই বর্ণিল উৎসবের মূল আকর্ষণ ‘জলকেলি’ বা পানি উৎসবকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকা পরিণত হয় এক আনন্দঘন মিলনমেলায়।
বৃহস্পতিবার সকালে রোয়াংছড়ি উপজেলা মাঠ প্রাঙ্গণে শুরু হয় দিনব্যাপী এই উৎসব। উৎসব শুরুর আগে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী প্রার্থনা ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে নববর্ষ বরণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এরপর ঢাক-ঢোল, বাঁশি ও শঙ্খের সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ। পাহাড়ি সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী গান, নৃত্য এবং পোশাকে সাজানো তরুণ-তরুণীদের অংশগ্রহণে উৎসবের আবহ আরও বর্ণিল হয়ে ওঠে।
সাংগ্রাইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ জলকেলিতে অংশ নিতে সকাল থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে মারমা তরুণ-তরুণীসহ নানা বয়সের মানুষ মাঠে জড়ো হন। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে একে অপরের ওপর পবিত্র পানি ছিটিয়ে তারা বিদায়ী বছরের দুঃখ-কষ্ট, ব্যর্থতা ও ক্লান্তি দূর করার প্রতীকী আয়োজন সম্পন্ন করেন। এই পানি ছিটানোর মধ্য দিয়ে নতুন বছরের জন্য শুভকামনা, সৌহার্দ্য ও বন্ধুত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।
উৎসবস্থলকে ঘিরে শুধু মারমা সম্প্রদায়ই নয়, পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মের মানুষও অংশ নেন। স্থানীয় ও দূরদূরান্ত থেকে আসা শত শত দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে পুরো রোয়াংছড়ি উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়। অনেক পর্যটক এই বর্ণিল আয়োজন উপভোগ করতে এসে পাহাড়ি সংস্কৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সম্মানিত সদস্য কে.এস. মং। তিনি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য এই ধরনের উৎসবের মাধ্যমে আরও সমৃদ্ধ ও জীবন্ত থাকে। নতুন প্রজন্মকে সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত রাখতে এমন আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বান্দরবান জেলা পরিষদের সদস্য মাধবী মারমা। তিনি বলেন, সাংগ্রাই শুধু একটি উৎসব নয়, এটি পার্বত্য অঞ্চলের সম্প্রীতি, সহাবস্থান এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রোয়াংছড়ি সাব জোনের ক্যাম্প কমান্ডার মেজর সৈয়দ রবিউল ইসলাম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাজমিন আলম তুলি, রোয়াংছড়ি থানার অফিসার ইনচার্জ হুমায়ুন কবির এবং ১নং রোয়াংছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেহ্লামং মারমা।
বক্তারা তাদের বক্তব্যে পার্বত্য অঞ্চলের দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তারা বলেন, এই ধরনের উৎসব শুধু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যই নয়, বরং সমাজে ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেয়।
অনুষ্ঠানের সভাপতি অংশৈচিং মারমা বলেন, সাংগ্রাই উৎসব আমাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পানি উৎসবের মাধ্যমে আমরা পুরনো বছরের সকল দুঃখ-কষ্ট ভুলে গিয়ে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করি। এটি শুধু মারমা সম্প্রদায়ের নয়, বরং সকলের মিলনমেলার উৎসব।
দিনব্যাপী আয়োজনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নৃত্য, গান এবং ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনার মাধ্যমে পুরো এলাকা আনন্দে মুখরিত থাকে। শিশু, তরুণ-তরুণী ও প্রবীণদের অংশগ্রহণে উৎসবটি এক অনন্য রূপ লাভ করে।
দিনের শেষভাগে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়ন কামনায় বিশেষ প্রার্থনার মাধ্যমে উৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতেও এই ঐতিহ্যবাহী সাংগ্রাই উৎসব পার্বত্য অঞ্চলের শান্তি ও সংস্কৃতির বন্ধনকে আরও দৃঢ় করবে।

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ এপ্রিল ২০২৬
পার্বত্য চট্টগ্রামের রোয়াংছড়ি উপজেলায় মারমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক ও ধর্মীয় নববর্ষ উৎসব ‘সাংগ্রাই’ এবারও বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা, আনন্দ-উল্লাস এবং সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে উদযাপিত হয়েছে। পাহাড়ি জনপদের এই বর্ণিল উৎসবের মূল আকর্ষণ ‘জলকেলি’ বা পানি উৎসবকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকা পরিণত হয় এক আনন্দঘন মিলনমেলায়।
বৃহস্পতিবার সকালে রোয়াংছড়ি উপজেলা মাঠ প্রাঙ্গণে শুরু হয় দিনব্যাপী এই উৎসব। উৎসব শুরুর আগে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী প্রার্থনা ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে নববর্ষ বরণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এরপর ঢাক-ঢোল, বাঁশি ও শঙ্খের সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ। পাহাড়ি সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী গান, নৃত্য এবং পোশাকে সাজানো তরুণ-তরুণীদের অংশগ্রহণে উৎসবের আবহ আরও বর্ণিল হয়ে ওঠে।
সাংগ্রাইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ জলকেলিতে অংশ নিতে সকাল থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে মারমা তরুণ-তরুণীসহ নানা বয়সের মানুষ মাঠে জড়ো হন। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে একে অপরের ওপর পবিত্র পানি ছিটিয়ে তারা বিদায়ী বছরের দুঃখ-কষ্ট, ব্যর্থতা ও ক্লান্তি দূর করার প্রতীকী আয়োজন সম্পন্ন করেন। এই পানি ছিটানোর মধ্য দিয়ে নতুন বছরের জন্য শুভকামনা, সৌহার্দ্য ও বন্ধুত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।
উৎসবস্থলকে ঘিরে শুধু মারমা সম্প্রদায়ই নয়, পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মের মানুষও অংশ নেন। স্থানীয় ও দূরদূরান্ত থেকে আসা শত শত দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে পুরো রোয়াংছড়ি উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়। অনেক পর্যটক এই বর্ণিল আয়োজন উপভোগ করতে এসে পাহাড়ি সংস্কৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সম্মানিত সদস্য কে.এস. মং। তিনি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য এই ধরনের উৎসবের মাধ্যমে আরও সমৃদ্ধ ও জীবন্ত থাকে। নতুন প্রজন্মকে সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত রাখতে এমন আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বান্দরবান জেলা পরিষদের সদস্য মাধবী মারমা। তিনি বলেন, সাংগ্রাই শুধু একটি উৎসব নয়, এটি পার্বত্য অঞ্চলের সম্প্রীতি, সহাবস্থান এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রোয়াংছড়ি সাব জোনের ক্যাম্প কমান্ডার মেজর সৈয়দ রবিউল ইসলাম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাজমিন আলম তুলি, রোয়াংছড়ি থানার অফিসার ইনচার্জ হুমায়ুন কবির এবং ১নং রোয়াংছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেহ্লামং মারমা।
বক্তারা তাদের বক্তব্যে পার্বত্য অঞ্চলের দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তারা বলেন, এই ধরনের উৎসব শুধু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যই নয়, বরং সমাজে ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেয়।
অনুষ্ঠানের সভাপতি অংশৈচিং মারমা বলেন, সাংগ্রাই উৎসব আমাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পানি উৎসবের মাধ্যমে আমরা পুরনো বছরের সকল দুঃখ-কষ্ট ভুলে গিয়ে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করি। এটি শুধু মারমা সম্প্রদায়ের নয়, বরং সকলের মিলনমেলার উৎসব।
দিনব্যাপী আয়োজনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নৃত্য, গান এবং ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনার মাধ্যমে পুরো এলাকা আনন্দে মুখরিত থাকে। শিশু, তরুণ-তরুণী ও প্রবীণদের অংশগ্রহণে উৎসবটি এক অনন্য রূপ লাভ করে।
দিনের শেষভাগে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়ন কামনায় বিশেষ প্রার্থনার মাধ্যমে উৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতেও এই ঐতিহ্যবাহী সাংগ্রাই উৎসব পার্বত্য অঞ্চলের শান্তি ও সংস্কৃতির বন্ধনকে আরও দৃঢ় করবে।

আপনার মতামত লিখুন