ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর জন্য পরিস্থিতি মাকড়সার জালের মতো হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা এখন অনেক বেশি, কারণ ট্রাম্পের শুরু করা খেলা যেকোনো সময় তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সিএনএন–এর বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এ ধরনের ইঙ্গিতই দেওয়া হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরান–এর আকাশে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন এবং ভয়াবহ অধ্যায়ের সূচনা হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে শুরু হওয়া সামরিক অভিযানকে পেন্টাগন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির প্রতিফলন হিসেবে দেখছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঘোষণা করেছেন, এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটবে আমেরিকার শর্তে। তবে ইতিহাসবিদরা মনে করছেন, এই বার্তায় ২০০১ সালের জর্জ ডব্লিউ বুশ–এর সেই দম্ভোক্তির প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়, যা দুই দশকের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পৌঁছে দিয়েছিল।
ইতিমধ্যেই এই যুদ্ধের ফলে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। এতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ আমূল বদলে গেছে। ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ অভিযান এমন এক জুয়া যা সফল হলে ইরানের দীর্ঘ ৫০ বছরের শত্রুতার অবসান ঘটতে পারে, কিন্তু ব্যর্থ হলে পুরো অঞ্চল দীর্ঘস্থায়ী অরাজকতার কবলে পড়তে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের পদক্ষেপ ইরানের নাগরিকদের স্বাধীনতার পথ দেখাতে পারে, অন্যদিকে সমালোচকরা বলছেন, পর্যাপ্ত আইনি ভিত্তি ছাড়া শুরু হওয়া এই যুদ্ধ আমেরিকার জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে।
সিএনএনের বিশ্লেষণে তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি চিহ্নিত করা হয়েছে। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক ধারণা হলো, ক্রমাগত বিমান হামলার ফলে ইরান একটি গণঅভ্যুত্থান erlebt করবে, যা নতুন ও স্থিতিশীল সরকার গঠনের পথ খুলবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাবে। তবে বাস্তববাদী পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, ইরানের অবশিষ্ট নেতৃত্ব সম্ভবত নতুন কোনো শক্ত ভিত্তি তৈরি করবে, যা আমেরিকার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে থাকবে। সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করে ইরানকে আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে নিষ্ক্রিয় রাখাই ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য।
সবচেয়ে ভীতিজনক পরিস্থিতি হতে পারে, যদি ইরান লিবিয়ার মতো গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত হয়। ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হলে এবং পরমাণু কর্মসূচি উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর হাতে চলে গেলে, তা মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বব্যাপী শরণার্থী সংকট এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করলেও, তেহরানের শাসন কাঠামো জটিল। খামেনির মৃত্যুর পর মধ্যপন্থী কোনো নেতার আবির্ভাব হয়নি, এবং কট্টরপন্থীরা প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠতে পারে।
যুদ্ধের ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে, ইরানকে রাশিয়া ও চীন–এর অক্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন করা। ইরান যদি সামরিক সক্ষমতা হারায়, তবে ইউক্রেন–যুদ্ধে রাশিয়ার ড্রোন ও মিসাইল সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে আমেরিকার প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে বলে হোয়াইট হাউসের ধারণা। তবে আফগানিস্তান ও ইরাকের তিক্ত অভিজ্ঞতা স্মরণ করিয়ে দেয়, যুদ্ধের ময়দানে জয়লাভ এবং একটি দেশ পুনর্গঠন দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন চ্যালেঞ্জ।
ইরানি জনগণ বিক্ষোভে সাড়া দিতে পারছে না, কারণ কট্টরপন্থী বাসিজ বাহিনী ও রেভল্যুশনারি গার্ডস শক্তিশালী এবং বিদ্রোহ দমনে নৃশংস। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক তেলের দাম বৃদ্ধি পাবে এবং আমেরিকার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। জনমতের জরিপে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ আমেরিকান এই অভিযানের বিপক্ষে।
শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের পরিণতি অনিশ্চিত। মধ্যবর্তী নির্বাচনের বছরে ট্রাম্পের জন্য দ্রুত বিজয় জরুরি, কিন্তু ইরান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত করে প্রেসিডেন্সিক অবস্থানকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। পেন্টাগন যা দাবি করুক, এই আগুনের লেলিহান শিখা কতদূর ছড়াবে তা কারো নিয়ন্ত্রণে নেই।
বিষয় : ইরান মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত Iran MiddleEast Khamenei খামেনি

শনিবার, ০২ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ মার্চ ২০২৬
ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর জন্য পরিস্থিতি মাকড়সার জালের মতো হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা এখন অনেক বেশি, কারণ ট্রাম্পের শুরু করা খেলা যেকোনো সময় তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সিএনএন–এর বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এ ধরনের ইঙ্গিতই দেওয়া হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরান–এর আকাশে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন এবং ভয়াবহ অধ্যায়ের সূচনা হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে শুরু হওয়া সামরিক অভিযানকে পেন্টাগন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির প্রতিফলন হিসেবে দেখছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঘোষণা করেছেন, এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটবে আমেরিকার শর্তে। তবে ইতিহাসবিদরা মনে করছেন, এই বার্তায় ২০০১ সালের জর্জ ডব্লিউ বুশ–এর সেই দম্ভোক্তির প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়, যা দুই দশকের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পৌঁছে দিয়েছিল।
ইতিমধ্যেই এই যুদ্ধের ফলে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। এতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ আমূল বদলে গেছে। ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ অভিযান এমন এক জুয়া যা সফল হলে ইরানের দীর্ঘ ৫০ বছরের শত্রুতার অবসান ঘটতে পারে, কিন্তু ব্যর্থ হলে পুরো অঞ্চল দীর্ঘস্থায়ী অরাজকতার কবলে পড়তে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের পদক্ষেপ ইরানের নাগরিকদের স্বাধীনতার পথ দেখাতে পারে, অন্যদিকে সমালোচকরা বলছেন, পর্যাপ্ত আইনি ভিত্তি ছাড়া শুরু হওয়া এই যুদ্ধ আমেরিকার জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে।
সিএনএনের বিশ্লেষণে তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি চিহ্নিত করা হয়েছে। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক ধারণা হলো, ক্রমাগত বিমান হামলার ফলে ইরান একটি গণঅভ্যুত্থান erlebt করবে, যা নতুন ও স্থিতিশীল সরকার গঠনের পথ খুলবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাবে। তবে বাস্তববাদী পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, ইরানের অবশিষ্ট নেতৃত্ব সম্ভবত নতুন কোনো শক্ত ভিত্তি তৈরি করবে, যা আমেরিকার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে থাকবে। সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করে ইরানকে আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে নিষ্ক্রিয় রাখাই ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য।
সবচেয়ে ভীতিজনক পরিস্থিতি হতে পারে, যদি ইরান লিবিয়ার মতো গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত হয়। ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হলে এবং পরমাণু কর্মসূচি উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর হাতে চলে গেলে, তা মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বব্যাপী শরণার্থী সংকট এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করলেও, তেহরানের শাসন কাঠামো জটিল। খামেনির মৃত্যুর পর মধ্যপন্থী কোনো নেতার আবির্ভাব হয়নি, এবং কট্টরপন্থীরা প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠতে পারে।
যুদ্ধের ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে, ইরানকে রাশিয়া ও চীন–এর অক্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন করা। ইরান যদি সামরিক সক্ষমতা হারায়, তবে ইউক্রেন–যুদ্ধে রাশিয়ার ড্রোন ও মিসাইল সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে আমেরিকার প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে বলে হোয়াইট হাউসের ধারণা। তবে আফগানিস্তান ও ইরাকের তিক্ত অভিজ্ঞতা স্মরণ করিয়ে দেয়, যুদ্ধের ময়দানে জয়লাভ এবং একটি দেশ পুনর্গঠন দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন চ্যালেঞ্জ।
ইরানি জনগণ বিক্ষোভে সাড়া দিতে পারছে না, কারণ কট্টরপন্থী বাসিজ বাহিনী ও রেভল্যুশনারি গার্ডস শক্তিশালী এবং বিদ্রোহ দমনে নৃশংস। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক তেলের দাম বৃদ্ধি পাবে এবং আমেরিকার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। জনমতের জরিপে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ আমেরিকান এই অভিযানের বিপক্ষে।
শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের পরিণতি অনিশ্চিত। মধ্যবর্তী নির্বাচনের বছরে ট্রাম্পের জন্য দ্রুত বিজয় জরুরি, কিন্তু ইরান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত করে প্রেসিডেন্সিক অবস্থানকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। পেন্টাগন যা দাবি করুক, এই আগুনের লেলিহান শিখা কতদূর ছড়াবে তা কারো নিয়ন্ত্রণে নেই।

আপনার মতামত লিখুন