বাণিজ্যযুদ্ধ, অভিবাসন সংকট এবং নানাবিধ অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলে মার্কিন অর্থনীতি যখন ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছিল, ঠিক তখনই ইরানের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আকস্মিক সামরিক অভিযান সেই সম্ভাবনার ওপর চরম আঘাত হেনেছে। ট্রাম্পের এই ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রধান ধমনীগুলোতেও অস্থিরতার কম্পন সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সংঘাত মার্কিন প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগের জন্য এক ‘অগ্নিপরীক্ষা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ও হরমুজ প্রণালী সংকট :
ইরানে মার্কিন হামলার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৭০ ডলার থেকে লাফিয়ে ৮০ ডলারে পৌঁছেছে। তবে সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গা হলো ‘হরমুজ প্রণালী’, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী। সংঘাতের কারণে এই পথে জাহাজ চলাচল স্থবির হয়ে পড়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ইরান যদি পাল্টা আঘাত হিসেবে এই পথটি দীর্ঘমেয়াদে রুদ্ধ করে দেয়, তবে তেলের দাম ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সিইও-দের আস্থা ও বিনিয়োগে ভাটা :
সম্প্রতি ‘কনফারেন্স বোর্ড’-এর এক জরিপে দেখা গেছে, মার্কিন অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে সিইও-দের মধ্যে আস্থার পারদ ঊর্ধ্বমুখী ছিল। কিন্তু বর্তমান সামরিক উত্তেজনা সেই স্বস্তিতে জল ঢেলে দিয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৬০ শতাংশ সিইও মনে করেন, এই ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ব্যবসায়িক পরিবেশের জন্য বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাতে পারে। জেপি মরগান-এর অর্থনীতিবিদ জোসেফ লুপটনের মতে, দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো যখন নতুন নিয়োগ ও মূলধন বিনিয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই এই ‘সামরিক যুদ্ধ’ তাদের পুনরায় ‘সতর্কতা বা দ্বিধা’র বৃত্তে ঠেলে দিয়েছে।
ফেডারেল রিজার্ভ ও মুদ্রানীতির ভবিষ্যৎ :
২০২২ সালের ইউক্রেন যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতা বর্তমান পরিস্থিতিতে ফেডারেল রিজার্ভকে (ফেড) এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সাবেক ফেড প্রধান জ্যানেট ইয়েলেন সতর্ক করে বলেছেন যে, এই যুদ্ধ মার্কিন মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি এবং প্রবৃদ্ধি হ্রাসের ঝুঁকি—উভয়ই তৈরি করেছে। এর ফলে ফেড হয়তো সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে পারে। ন্যাটিক্সিস-এর বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহ চেইন লণ্ডভণ্ড হওয়া, বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হওয়ার মতো মন্দার লক্ষণ দেখা দেওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
অপ্রতিসম যুদ্ধ ও বৈশ্বিক উৎপাদন নেটওয়ার্ক :
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের সম্ভাবনা মাত্র ৩০ শতাংশ। ইরান সরাসরি যুদ্ধের বদলে সাইবার হামলা, সন্ত্রাসবাদ এবং প্রক্সি ওয়ারের মতো ‘অপ্রতিসম’ বা চোরাগোপ্তা হামলার পথ বেছে নিতে পারে। ইতোমধ্যে কাতারের গ্যাস স্থাপনায় হামলার ফলে এলএনজি সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছে। এই সংঘাত যদি ইরাকের মতো তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা বৈশ্বিক উৎপাদন নেটওয়ার্ককে পঙ্গু করে দিয়ে পুরো বিশ্বকে এক দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার বৃত্তে আটকে ফেলবে।

শনিবার, ০২ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ মার্চ ২০২৬
বাণিজ্যযুদ্ধ, অভিবাসন সংকট এবং নানাবিধ অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলে মার্কিন অর্থনীতি যখন ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছিল, ঠিক তখনই ইরানের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আকস্মিক সামরিক অভিযান সেই সম্ভাবনার ওপর চরম আঘাত হেনেছে। ট্রাম্পের এই ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রধান ধমনীগুলোতেও অস্থিরতার কম্পন সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সংঘাত মার্কিন প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগের জন্য এক ‘অগ্নিপরীক্ষা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ও হরমুজ প্রণালী সংকট :
ইরানে মার্কিন হামলার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৭০ ডলার থেকে লাফিয়ে ৮০ ডলারে পৌঁছেছে। তবে সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গা হলো ‘হরমুজ প্রণালী’, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী। সংঘাতের কারণে এই পথে জাহাজ চলাচল স্থবির হয়ে পড়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ইরান যদি পাল্টা আঘাত হিসেবে এই পথটি দীর্ঘমেয়াদে রুদ্ধ করে দেয়, তবে তেলের দাম ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সিইও-দের আস্থা ও বিনিয়োগে ভাটা :
সম্প্রতি ‘কনফারেন্স বোর্ড’-এর এক জরিপে দেখা গেছে, মার্কিন অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে সিইও-দের মধ্যে আস্থার পারদ ঊর্ধ্বমুখী ছিল। কিন্তু বর্তমান সামরিক উত্তেজনা সেই স্বস্তিতে জল ঢেলে দিয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৬০ শতাংশ সিইও মনে করেন, এই ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ব্যবসায়িক পরিবেশের জন্য বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাতে পারে। জেপি মরগান-এর অর্থনীতিবিদ জোসেফ লুপটনের মতে, দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো যখন নতুন নিয়োগ ও মূলধন বিনিয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই এই ‘সামরিক যুদ্ধ’ তাদের পুনরায় ‘সতর্কতা বা দ্বিধা’র বৃত্তে ঠেলে দিয়েছে।
ফেডারেল রিজার্ভ ও মুদ্রানীতির ভবিষ্যৎ :
২০২২ সালের ইউক্রেন যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতা বর্তমান পরিস্থিতিতে ফেডারেল রিজার্ভকে (ফেড) এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সাবেক ফেড প্রধান জ্যানেট ইয়েলেন সতর্ক করে বলেছেন যে, এই যুদ্ধ মার্কিন মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি এবং প্রবৃদ্ধি হ্রাসের ঝুঁকি—উভয়ই তৈরি করেছে। এর ফলে ফেড হয়তো সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে পারে। ন্যাটিক্সিস-এর বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহ চেইন লণ্ডভণ্ড হওয়া, বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হওয়ার মতো মন্দার লক্ষণ দেখা দেওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
অপ্রতিসম যুদ্ধ ও বৈশ্বিক উৎপাদন নেটওয়ার্ক :
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের সম্ভাবনা মাত্র ৩০ শতাংশ। ইরান সরাসরি যুদ্ধের বদলে সাইবার হামলা, সন্ত্রাসবাদ এবং প্রক্সি ওয়ারের মতো ‘অপ্রতিসম’ বা চোরাগোপ্তা হামলার পথ বেছে নিতে পারে। ইতোমধ্যে কাতারের গ্যাস স্থাপনায় হামলার ফলে এলএনজি সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছে। এই সংঘাত যদি ইরাকের মতো তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা বৈশ্বিক উৎপাদন নেটওয়ার্ককে পঙ্গু করে দিয়ে পুরো বিশ্বকে এক দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার বৃত্তে আটকে ফেলবে।

আপনার মতামত লিখুন