ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

ত্রিশাল, ময়মনসিংহ

ময়মনসিংহে ২৬৬ বছরের ঐতিহ্য ‘হুমগুটি’ খেলা, দর্শনার্থীদের ঢল


মোঃ মোস্তাকিম মিয়া
মোঃ মোস্তাকিম মিয়া
প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬

ময়মনসিংহে ২৬৬ বছরের ঐতিহ্য ‘হুমগুটি’ খেলা, দর্শনার্থীদের ঢল

ময়মনসিংহে ২৬৬ বছরের ঐতিহ্য ‘হুমগুটি’ খেলা, দর্শনার্থীদের ঢল

মোঃ মোস্তাকিম | ত্রিশাল, ময়মনসিংহ প্রতিনিধি

এ যেন এক আজব খেলা। নেই কোনো রেফারি, নেই নির্দিষ্ট কোনো দল, নেই সীমানার বাধা। যার ইচ্ছা সে খেলতে পারে, আবার না চাইলে খেলায় অংশ নাও নিতে পারে। তবুও এই খেলা দেখতে মানুষের ঢল নামে। শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর অন্য কোথাও এমন ব্যতিক্রমধর্মী খেলা খুঁজে পাওয়া কঠিন। খেলাটির নাম ‘হুমগুটি’।

ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী এই হুমগুটি খেলার সূচনা ব্রিটিশ জমিদার আমলে হলেও আজও তা চলে আসছে বংশপরম্পরায়। প্রতি বছর পৌষ মাসের শেষ দিন, যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘পুহুরা’, ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের বড়ইআটা নামক স্থানে এই খেলার আয়োজন করা হয়।

খেলাটিতে ব্যবহৃত হয় পিতলের মোড়কে তৈরি প্রায় ৩০ কেজি ওজনের একটি ভারী বল, যাকে বলা হয় ‘গুটি’। এই গুটিকে কেন্দ্র করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনও দু-তিন দিনব্যাপী চলে কাড়াকাড়ি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মুক্তাগাছার জমিদার রাজা শশীকান্ত ও ত্রিশাল উপজেলার বৈলরের জমিদার হেমচন্দ্র রায়ের মধ্যে জমির পরিমাপ নিয়ে বিরোধ থেকেই এই খেলার জন্ম। জমিদার আমলে তালুক এলাকার প্রতি কাঠা জমির পরিমাপ ছিল ১০ শতাংশ এবং পরগনার ক্ষেত্রে ছিল সাড়ে ছয় শতাংশ। একই ভূখণ্ডে ভিন্ন পরিমাপ নীতি থাকায় বিরোধ চরমে ওঠে। এই বিরোধ মীমাংসার জন্য তালুক-পরগনার সীমানায় হুমগুটি খেলার আয়োজন করা হয়। যে পক্ষ গুটি দখলে রাখতে পারবে, তারাই বিজয়ী হিসেবে স্বীকৃতি পাবে।

সে সময় মুক্তাগাছা জমিদারের প্রজারা বিজয়ী হন। এর মধ্য দিয়েই ব্রিটিশ আমলে তালুক-পরগনার সীমান্তের জিরো পয়েন্টে হুমগুটি খেলার গোরাপত্তন হয়, যা আজ ২৬৬ বছর ধরে টিকে আছে। যদিও সময়ের সঙ্গে পিতলের গুটির ওজন কিছুটা কমানো হয়েছে।

বর্তমানে বংশানুক্রমে এই খেলার আয়োজন ও পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন এবি সিদ্দিক। গত ৩০ বছর ধরে তিনি হুমগুটি খেলার হাল ধরে রেখেছেন। তিনি মরহুম আব্দুল সালাম মণ্ডলের সন্তান। চার বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি মেজো। পেশাগত জীবনে তিনি বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক দলের নাট্যকার ও গীতিকার হিসেবে কর্মরত।

খেলা উপলক্ষে গ্রামে ফিরে আসেন মেয়েরা বাপের বাড়িতে। দর্শক হিসেবেও তারা এই উৎসবের অংশ হতে চান। বাড়ি বাড়ি চলে পিঠাপুলি উৎসব, আর খেলাস্থলে বসে গ্রামীণ ‘পুহুরা’ মেলা। লক্ষ্মীপুর, দেওখোলা ও আশপাশের গ্রামগুলোতে দু-তিন দিনব্যাপী উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে।

‘হুমগুটি’ স্মৃতি সংসদের পরিচালক এবি সিদ্দিক জানান, “হুমগুটি খেলার মাধ্যমে এক সময় দুই জমিদারের জমি পরিমাপ সংক্রান্ত বিরোধের মীমাংসা হয়েছিল। আমাদের পূর্বপুরুষরা প্রতি বছর পৌষ মাসের শেষ দিন খেলাটি আয়োজন করতেন। সেই ধারাবাহিকতায় আমরাও আজ পর্যন্ত খেলাটি আয়োজন করে আসছি। এবছর খেলাটির বয়স দাঁড়িয়েছে ২৬৬ বছর।”

খেলায় একেক এলাকার একেকটি নিশানা বা চিহ্ন থাকে, যা দেখে বোঝা যায় কে কোন পক্ষের। গুটি কোন দিকে যাচ্ছে, তা নিশানার মাধ্যমেই চিহ্নিত করা হয়। নিজেদের দখলে নিতে খেলোয়াড়রা নানা কৌশল অবলম্বন করেন। গুটি পুরোপুরি ‘গুম’ না হওয়া পর্যন্ত খেলা চলতে থাকে।

চলতি বছর হুমগুটি খেলা ত্রিশাল উপজেলার ধানীখোলা ইউনিয়নের পালোয়ানদের দখলে যায়।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


ময়মনসিংহে ২৬৬ বছরের ঐতিহ্য ‘হুমগুটি’ খেলা, দর্শনার্থীদের ঢল

প্রকাশের তারিখ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬

featured Image

ময়মনসিংহে ২৬৬ বছরের ঐতিহ্য ‘হুমগুটি’ খেলা, দর্শনার্থীদের ঢল

মোঃ মোস্তাকিম | ত্রিশাল, ময়মনসিংহ প্রতিনিধি

এ যেন এক আজব খেলা। নেই কোনো রেফারি, নেই নির্দিষ্ট কোনো দল, নেই সীমানার বাধা। যার ইচ্ছা সে খেলতে পারে, আবার না চাইলে খেলায় অংশ নাও নিতে পারে। তবুও এই খেলা দেখতে মানুষের ঢল নামে। শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর অন্য কোথাও এমন ব্যতিক্রমধর্মী খেলা খুঁজে পাওয়া কঠিন। খেলাটির নাম ‘হুমগুটি’।

ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী এই হুমগুটি খেলার সূচনা ব্রিটিশ জমিদার আমলে হলেও আজও তা চলে আসছে বংশপরম্পরায়। প্রতি বছর পৌষ মাসের শেষ দিন, যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘পুহুরা’, ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের বড়ইআটা নামক স্থানে এই খেলার আয়োজন করা হয়।

খেলাটিতে ব্যবহৃত হয় পিতলের মোড়কে তৈরি প্রায় ৩০ কেজি ওজনের একটি ভারী বল, যাকে বলা হয় ‘গুটি’। এই গুটিকে কেন্দ্র করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনও দু-তিন দিনব্যাপী চলে কাড়াকাড়ি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মুক্তাগাছার জমিদার রাজা শশীকান্ত ও ত্রিশাল উপজেলার বৈলরের জমিদার হেমচন্দ্র রায়ের মধ্যে জমির পরিমাপ নিয়ে বিরোধ থেকেই এই খেলার জন্ম। জমিদার আমলে তালুক এলাকার প্রতি কাঠা জমির পরিমাপ ছিল ১০ শতাংশ এবং পরগনার ক্ষেত্রে ছিল সাড়ে ছয় শতাংশ। একই ভূখণ্ডে ভিন্ন পরিমাপ নীতি থাকায় বিরোধ চরমে ওঠে। এই বিরোধ মীমাংসার জন্য তালুক-পরগনার সীমানায় হুমগুটি খেলার আয়োজন করা হয়। যে পক্ষ গুটি দখলে রাখতে পারবে, তারাই বিজয়ী হিসেবে স্বীকৃতি পাবে।

সে সময় মুক্তাগাছা জমিদারের প্রজারা বিজয়ী হন। এর মধ্য দিয়েই ব্রিটিশ আমলে তালুক-পরগনার সীমান্তের জিরো পয়েন্টে হুমগুটি খেলার গোরাপত্তন হয়, যা আজ ২৬৬ বছর ধরে টিকে আছে। যদিও সময়ের সঙ্গে পিতলের গুটির ওজন কিছুটা কমানো হয়েছে।

বর্তমানে বংশানুক্রমে এই খেলার আয়োজন ও পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন এবি সিদ্দিক। গত ৩০ বছর ধরে তিনি হুমগুটি খেলার হাল ধরে রেখেছেন। তিনি মরহুম আব্দুল সালাম মণ্ডলের সন্তান। চার বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি মেজো। পেশাগত জীবনে তিনি বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক দলের নাট্যকার ও গীতিকার হিসেবে কর্মরত।

খেলা উপলক্ষে গ্রামে ফিরে আসেন মেয়েরা বাপের বাড়িতে। দর্শক হিসেবেও তারা এই উৎসবের অংশ হতে চান। বাড়ি বাড়ি চলে পিঠাপুলি উৎসব, আর খেলাস্থলে বসে গ্রামীণ ‘পুহুরা’ মেলা। লক্ষ্মীপুর, দেওখোলা ও আশপাশের গ্রামগুলোতে দু-তিন দিনব্যাপী উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে।

‘হুমগুটি’ স্মৃতি সংসদের পরিচালক এবি সিদ্দিক জানান, “হুমগুটি খেলার মাধ্যমে এক সময় দুই জমিদারের জমি পরিমাপ সংক্রান্ত বিরোধের মীমাংসা হয়েছিল। আমাদের পূর্বপুরুষরা প্রতি বছর পৌষ মাসের শেষ দিন খেলাটি আয়োজন করতেন। সেই ধারাবাহিকতায় আমরাও আজ পর্যন্ত খেলাটি আয়োজন করে আসছি। এবছর খেলাটির বয়স দাঁড়িয়েছে ২৬৬ বছর।”

খেলায় একেক এলাকার একেকটি নিশানা বা চিহ্ন থাকে, যা দেখে বোঝা যায় কে কোন পক্ষের। গুটি কোন দিকে যাচ্ছে, তা নিশানার মাধ্যমেই চিহ্নিত করা হয়। নিজেদের দখলে নিতে খেলোয়াড়রা নানা কৌশল অবলম্বন করেন। গুটি পুরোপুরি ‘গুম’ না হওয়া পর্যন্ত খেলা চলতে থাকে।

চলতি বছর হুমগুটি খেলা ত্রিশাল উপজেলার ধানীখোলা ইউনিয়নের পালোয়ানদের দখলে যায়।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ