ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম দ্য জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদনের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। হরমুজ প্রণালির তলদেশের ইন্টারনেট অবকাঠামোকে ইরানের সম্ভাব্য চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার আলোচনা অবশ্য নতুন নয়। এর আগে আইআরজিসি-ঘনিষ্ঠ তাসনিম নিউজ এজেন্সিও ওই এলাকার সাবমেরিন ক্যাবলগুলোর ঝুঁকি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।
কায়হানের সম্পাদকীয়তে শরিয়তমাদারি হরমুজ ও পারস্য উপসাগরের তলদেশ দিয়ে যাওয়া প্রায় সাতটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ফাইবার-অপটিক ক্যাবল ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেন। এসব ক্যাবলের কার্যক্রমে গুরুতর বিঘ্ন সৃষ্টি বা সেগুলো বিচ্ছিন্ন করাকে ইরানের প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টির একটি উপায় হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
তবে এই আহ্বানকে এখন পর্যন্ত ইরান সরকারের আনুষ্ঠানিক নীতি বা সামরিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষ এখনো ক্যাবল কাটার এই আহ্বান অনুমোদন করেনি। এটি কায়হানের সম্পাদকের নিজস্ব অবস্থান ও রাজনৈতিক আহ্বান হিসেবেই সামনে এসেছে।
কায়হান ইরানের কট্টর রক্ষণশীল ধারার প্রভাবশালী সংবাদপত্র। এর প্রধান সম্পাদক হোসেইন শরিয়তমাদারি দীর্ঘদিন ধরেই হরমুজ প্রণালিকে পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের পক্ষে বক্তব্য দিয়ে আসছেন। এবার সেই ধারণাকে নৌযান ও জ্বালানি পরিবহনের বাইরে ডিজিটাল অবকাঠামো পর্যন্ত সম্প্রসারণের আহ্বান জানালেন তিনি।
হরমুজ প্রণালির তলদেশ দিয়ে AAE-1, FALCON এবং Gulf Bridge International-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্যাবল নেটওয়ার্ক গেছে। এগুলো পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোকে ভারত, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করে। ফলে এসব ক্যাবলের একাধিকটিতে একসঙ্গে বড় ধরনের ক্ষতি হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের ইন্টারনেট ও ডিজিটাল সেবায় গুরুতর বিঘ্ন ঘটতে পারে।
এসব সাবমেরিন ক্যাবল দিয়ে সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারের পাশাপাশি আর্থিক লেনদেন, ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সরকারি যোগাযোগ, ক্লাউড সেবা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ তথ্য আদান-প্রদান হয়। ফলে ক্যাবলে বড় ধরনের ক্ষতি হলে শুধু ইন্টারনেট সংযোগ নয়, ব্যাংকিং, ব্যবসা ও সরকারি কার্যক্রমও প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর আগেও হরমুজের তলদেশের ডিজিটাল অবকাঠামো নিয়ে সতর্কতামূলক বার্তা দিয়েছিল আইআরজিসি-ঘনিষ্ঠ তাসনিম। গত এপ্রিলে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যমটি হরমুজ প্রণালিকে উপসাগরীয় অঞ্চলের ডিজিটাল অর্থনীতির একটি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করে। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্যাবল একসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হলে পারস্য উপসাগরজুড়ে বড় ধরনের যোগাযোগ বিপর্যয় দেখা দিতে পারে বলেও সেখানে বলা হয়।
পরবর্তী সময়ে ইরানঘনিষ্ঠ বিভিন্ন মহল এসব ক্যাবল ব্যবহারকারী বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ফি আদায়ের প্রস্তাবও সামনে আনে। গুগল, মেটা, মাইক্রোসফট ও অ্যামাজনের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে ইরানের নিয়ম মেনে কার্যক্রম পরিচালনা এবং ক্যাবল ব্যবহারের জন্য অর্থ দেওয়ার ধারণাও আলোচিত হয়। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর করার আইনগত ভিত্তি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন।
সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যে হরমুজের সাবমেরিন ক্যাবলগুলো নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও বেড়েছে। দ্য জেরুজালেম পোস্টের ৩ সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের মূল্যায়নের বরাতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলায় হরমুজে নজরদারি ও মাইন স্থাপনের ক্ষেত্রে ইরানের কিছু সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই প্রতিবেদনে একটি মার্কিন সূত্রের বরাতে বলা হয়, ইরান সাবমেরিন ক্যাবল অকার্যকর করার বিষয়টি বিবেচনা করছিল—যদিও এই দাবি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজে একাধিক সাবমেরিন ক্যাবল ইচ্ছাকৃতভাবে বিচ্ছিন্ন করা হলে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর। তবে বিকল্প রুট থাকায় এর অর্থ এই নয় যে পুরো বিশ্বের ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাবে। ক্ষতিগ্রস্ত ট্রাফিকের একটি অংশ অন্য পথে পাঠানো সম্ভব হলেও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হলে আঞ্চলিক যোগাযোগ, আর্থিক লেনদেন ও ডিজিটাল সেবায় বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে।
তাই কায়হানের সম্পাদকের সর্বশেষ আহ্বান বাস্তব কোনো সামরিক পদক্ষেপে রূপ নেয় কি না, সেদিকেই এখন নজর থাকবে। এখন পর্যন্ত হরমুজের তলদেশের ক্যাবল কেটে দেওয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশের তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি যে চলমান সংঘাতে ডিজিটাল অবকাঠামোকেন্দ্রিক নতুন চাপের ক্ষেত্রেও পরিণত হতে পারে, সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো সেই আশঙ্কাই বাড়াচ্ছে।

বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম দ্য জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদনের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। হরমুজ প্রণালির তলদেশের ইন্টারনেট অবকাঠামোকে ইরানের সম্ভাব্য চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার আলোচনা অবশ্য নতুন নয়। এর আগে আইআরজিসি-ঘনিষ্ঠ তাসনিম নিউজ এজেন্সিও ওই এলাকার সাবমেরিন ক্যাবলগুলোর ঝুঁকি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।
কায়হানের সম্পাদকীয়তে শরিয়তমাদারি হরমুজ ও পারস্য উপসাগরের তলদেশ দিয়ে যাওয়া প্রায় সাতটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ফাইবার-অপটিক ক্যাবল ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেন। এসব ক্যাবলের কার্যক্রমে গুরুতর বিঘ্ন সৃষ্টি বা সেগুলো বিচ্ছিন্ন করাকে ইরানের প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টির একটি উপায় হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
তবে এই আহ্বানকে এখন পর্যন্ত ইরান সরকারের আনুষ্ঠানিক নীতি বা সামরিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষ এখনো ক্যাবল কাটার এই আহ্বান অনুমোদন করেনি। এটি কায়হানের সম্পাদকের নিজস্ব অবস্থান ও রাজনৈতিক আহ্বান হিসেবেই সামনে এসেছে।
কায়হান ইরানের কট্টর রক্ষণশীল ধারার প্রভাবশালী সংবাদপত্র। এর প্রধান সম্পাদক হোসেইন শরিয়তমাদারি দীর্ঘদিন ধরেই হরমুজ প্রণালিকে পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের পক্ষে বক্তব্য দিয়ে আসছেন। এবার সেই ধারণাকে নৌযান ও জ্বালানি পরিবহনের বাইরে ডিজিটাল অবকাঠামো পর্যন্ত সম্প্রসারণের আহ্বান জানালেন তিনি।
হরমুজ প্রণালির তলদেশ দিয়ে AAE-1, FALCON এবং Gulf Bridge International-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্যাবল নেটওয়ার্ক গেছে। এগুলো পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোকে ভারত, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করে। ফলে এসব ক্যাবলের একাধিকটিতে একসঙ্গে বড় ধরনের ক্ষতি হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের ইন্টারনেট ও ডিজিটাল সেবায় গুরুতর বিঘ্ন ঘটতে পারে।
এসব সাবমেরিন ক্যাবল দিয়ে সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারের পাশাপাশি আর্থিক লেনদেন, ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সরকারি যোগাযোগ, ক্লাউড সেবা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ তথ্য আদান-প্রদান হয়। ফলে ক্যাবলে বড় ধরনের ক্ষতি হলে শুধু ইন্টারনেট সংযোগ নয়, ব্যাংকিং, ব্যবসা ও সরকারি কার্যক্রমও প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর আগেও হরমুজের তলদেশের ডিজিটাল অবকাঠামো নিয়ে সতর্কতামূলক বার্তা দিয়েছিল আইআরজিসি-ঘনিষ্ঠ তাসনিম। গত এপ্রিলে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যমটি হরমুজ প্রণালিকে উপসাগরীয় অঞ্চলের ডিজিটাল অর্থনীতির একটি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করে। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্যাবল একসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হলে পারস্য উপসাগরজুড়ে বড় ধরনের যোগাযোগ বিপর্যয় দেখা দিতে পারে বলেও সেখানে বলা হয়।
পরবর্তী সময়ে ইরানঘনিষ্ঠ বিভিন্ন মহল এসব ক্যাবল ব্যবহারকারী বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ফি আদায়ের প্রস্তাবও সামনে আনে। গুগল, মেটা, মাইক্রোসফট ও অ্যামাজনের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে ইরানের নিয়ম মেনে কার্যক্রম পরিচালনা এবং ক্যাবল ব্যবহারের জন্য অর্থ দেওয়ার ধারণাও আলোচিত হয়। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর করার আইনগত ভিত্তি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন।
সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যে হরমুজের সাবমেরিন ক্যাবলগুলো নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও বেড়েছে। দ্য জেরুজালেম পোস্টের ৩ সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের মূল্যায়নের বরাতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলায় হরমুজে নজরদারি ও মাইন স্থাপনের ক্ষেত্রে ইরানের কিছু সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই প্রতিবেদনে একটি মার্কিন সূত্রের বরাতে বলা হয়, ইরান সাবমেরিন ক্যাবল অকার্যকর করার বিষয়টি বিবেচনা করছিল—যদিও এই দাবি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজে একাধিক সাবমেরিন ক্যাবল ইচ্ছাকৃতভাবে বিচ্ছিন্ন করা হলে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর। তবে বিকল্প রুট থাকায় এর অর্থ এই নয় যে পুরো বিশ্বের ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাবে। ক্ষতিগ্রস্ত ট্রাফিকের একটি অংশ অন্য পথে পাঠানো সম্ভব হলেও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হলে আঞ্চলিক যোগাযোগ, আর্থিক লেনদেন ও ডিজিটাল সেবায় বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে।
তাই কায়হানের সম্পাদকের সর্বশেষ আহ্বান বাস্তব কোনো সামরিক পদক্ষেপে রূপ নেয় কি না, সেদিকেই এখন নজর থাকবে। এখন পর্যন্ত হরমুজের তলদেশের ক্যাবল কেটে দেওয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশের তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি যে চলমান সংঘাতে ডিজিটাল অবকাঠামোকেন্দ্রিক নতুন চাপের ক্ষেত্রেও পরিণত হতে পারে, সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো সেই আশঙ্কাই বাড়াচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন