ঢাকা    রোববার, ৩০ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

একটি ফোনকলে বাঁচল ১,৬৪৩ শিশুর প্রাণ


নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৬

একটি ফোনকলে বাঁচল ১,৬৪৩ শিশুর প্রাণ
সংগৃহীত

চারপাশের পরিবেশ তখনও অনেকটাই স্বাভাবিক। নদীর তীর থেকে প্রায় ৬০ মিটার উঁচুতে দাঁড়িয়ে থাকা তিনতলা কংক্রিটের স্কুল ভবন দেখে বড় কোনো বিপদের আশঙ্কাও করেননি প্রধান শিক্ষক। কিন্তু হঠাৎ আসা একটি ফোনকল মুহূর্তেই বদলে দেয় পরিস্থিতি। সেই ফোনকলের পর নেওয়া দ্রুত সিদ্ধান্তেই ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার হাত থেকে প্রাণে বেঁচে যায় নেপালের একটি বিদ্যালয়ের ১ হাজার ৬৪৩ শিশু।

ঘটনাটি নেপালের নুয়াকোট জেলার ত্রিভুবন ত্রিশুলি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক ৪৭ বছর বয়সী রাজেন্দ্র দাওয়াদি। প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি সেখানে ইংরেজিও পড়ান।

বুধবার সকাল প্রায় ৯টা ২০ মিনিটে দাওয়াদির কাছে এক বন্ধুর ফোন আসে। বন্ধু তাকে জানান, কাছাকাছি একটি গ্রাম নদীর প্রবল স্রোতে ভেসে গেছে। পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠছে জানিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

শুরুতে অবশ্য দাওয়াদির মনে হয়েছিল, তার বিদ্যালয়টি নিরাপদ। কারণ তিনতলা ভবনটি নদীর তীর থেকে প্রায় ৬০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। ফলে নদীর পানি স্কুল পর্যন্ত পৌঁছাবে—এমন আশঙ্কা তখনও তার খুব একটা ছিল না।

কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। এক অভিভাবক দ্রুত স্কুলে এসে জানান, নদীর পানি অস্বাভাবিক গতিতে বাড়ছে।

এবার আর অপেক্ষা করেননি প্রধান শিক্ষক।

তাৎক্ষণিকভাবে স্কুলের ঘণ্টা বাজিয়ে সব শ্রেণিকক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের বের করার নির্দেশ দেন তিনি। শিক্ষকদের বলা হয়, শিশুদের দ্রুত আরও উঁচু ও নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে। একই সঙ্গে স্কুলবাসের চালকদের ফোন করে বাসগুলো ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন দাওয়াদি।

তবে একটি বাসের চালকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ততক্ষণে বাসটি একটি সেতু পার হয়ে গিয়েছিল।

এরপর শুরু হয় সময়ের বিরুদ্ধে দৌড়। শত শত শিশু দল বেঁধে উঁচু জায়গার দিকে ছুটতে থাকে। আতঙ্কে এক ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে মোটরসাইকেলে করে পাহাড়ের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। অন্য শিক্ষার্থীরা পায়ে হেঁটেই নিরাপদ জায়গার দিকে এগিয়ে যায়। তাদের সঙ্গে ছুটতে থাকেন প্রধান শিক্ষক দাওয়াদিও।

শেষ পর্যন্ত শিশুরা একটি বোধি গাছের নিচে নিরাপদ আশ্রয় নেয়।

শিক্ষার্থীদের সরিয়ে নেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ভয়াবহ বন্যার স্রোত আছড়ে পড়ে পুরো এলাকায়। কাদা, পাথর, বরফ ও বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষ মিশ্রিত প্রবল স্রোত একের পর এক ভবন, সেতু ও স্থাপনা ধ্বংস করতে থাকে। রক্ষা পায়নি ত্রিভুবন ত্রিশুলি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভবনটিও।

তবে ততক্ষণে স্কুলের ১ হাজার ৬৪৩ শিশুকেই নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল। বিদ্যালয়ের অধিকাংশ কর্মীও প্রাণে বেঁচে যান।

তবে এই দুর্যোগে বিদ্যালয়ের দুই কর্মী প্রাণ হারান।

৩২ বছর বয়সী সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক সান্তোস পারিয়ার নদীর কাছে ভাড়া বাসায় খাবার রান্না করতে ফিরে যাওয়ার পর বন্যার স্রোতে ভেসে যান। অন্যদিকে বিদ্যালয়ের দারোয়ান সুলতান লামা স্কুলের দরজা বন্ধ করতে গিয়ে নিখোঁজ হন।

নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছাকাছি লাংতাং লিরুং শৃঙ্গ থেকে বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথর ধসে পড়ার পর এই ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। বরফ ও পাথরের বিশাল স্তূপ লেন্দে খোলা নদীর উজানে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে আছড়ে পড়লে নদীর পানির প্রবাহ ভয়ংকর রূপ নেয়।

দুর্যোগে নেপাল ও তিব্বতের বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নেপালে ৭৬৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং ২ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। অন্যদিকে চীন জানিয়েছে, তিব্বতে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

বন্যার আঘাতে বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলের ভেতরে শতাধিক শ্রমিক আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাদের উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেলে আটকে পড়াদের সহায়তায় পাইপের মাধ্যমে বাতাস পাঠিয়েছে নেপালি সেনাবাহিনী।

ভয়াবহ এই দুর্যোগের মধ্যে প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদির দ্রুত সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত ১ হাজার ৬৪৩ শিশুর জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কয়েক মিনিটের বিলম্বও যেখানে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারত, সেখানে একটি সতর্কতামূলক ফোনকল এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত বাঁচিয়ে দেয় পুরো একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

রোববার, ৩০ আগস্ট ২০২৬


একটি ফোনকলে বাঁচল ১,৬৪৩ শিশুর প্রাণ

প্রকাশের তারিখ : ৩০ আগস্ট ২০২৬

featured Image

চারপাশের পরিবেশ তখনও অনেকটাই স্বাভাবিক। নদীর তীর থেকে প্রায় ৬০ মিটার উঁচুতে দাঁড়িয়ে থাকা তিনতলা কংক্রিটের স্কুল ভবন দেখে বড় কোনো বিপদের আশঙ্কাও করেননি প্রধান শিক্ষক। কিন্তু হঠাৎ আসা একটি ফোনকল মুহূর্তেই বদলে দেয় পরিস্থিতি। সেই ফোনকলের পর নেওয়া দ্রুত সিদ্ধান্তেই ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার হাত থেকে প্রাণে বেঁচে যায় নেপালের একটি বিদ্যালয়ের ১ হাজার ৬৪৩ শিশু।

ঘটনাটি নেপালের নুয়াকোট জেলার ত্রিভুবন ত্রিশুলি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক ৪৭ বছর বয়সী রাজেন্দ্র দাওয়াদি। প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি সেখানে ইংরেজিও পড়ান।

বুধবার সকাল প্রায় ৯টা ২০ মিনিটে দাওয়াদির কাছে এক বন্ধুর ফোন আসে। বন্ধু তাকে জানান, কাছাকাছি একটি গ্রাম নদীর প্রবল স্রোতে ভেসে গেছে। পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠছে জানিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

শুরুতে অবশ্য দাওয়াদির মনে হয়েছিল, তার বিদ্যালয়টি নিরাপদ। কারণ তিনতলা ভবনটি নদীর তীর থেকে প্রায় ৬০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। ফলে নদীর পানি স্কুল পর্যন্ত পৌঁছাবে—এমন আশঙ্কা তখনও তার খুব একটা ছিল না।

কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। এক অভিভাবক দ্রুত স্কুলে এসে জানান, নদীর পানি অস্বাভাবিক গতিতে বাড়ছে।

এবার আর অপেক্ষা করেননি প্রধান শিক্ষক।

তাৎক্ষণিকভাবে স্কুলের ঘণ্টা বাজিয়ে সব শ্রেণিকক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের বের করার নির্দেশ দেন তিনি। শিক্ষকদের বলা হয়, শিশুদের দ্রুত আরও উঁচু ও নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে। একই সঙ্গে স্কুলবাসের চালকদের ফোন করে বাসগুলো ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন দাওয়াদি।

তবে একটি বাসের চালকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ততক্ষণে বাসটি একটি সেতু পার হয়ে গিয়েছিল।

এরপর শুরু হয় সময়ের বিরুদ্ধে দৌড়। শত শত শিশু দল বেঁধে উঁচু জায়গার দিকে ছুটতে থাকে। আতঙ্কে এক ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে মোটরসাইকেলে করে পাহাড়ের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। অন্য শিক্ষার্থীরা পায়ে হেঁটেই নিরাপদ জায়গার দিকে এগিয়ে যায়। তাদের সঙ্গে ছুটতে থাকেন প্রধান শিক্ষক দাওয়াদিও।

শেষ পর্যন্ত শিশুরা একটি বোধি গাছের নিচে নিরাপদ আশ্রয় নেয়।

শিক্ষার্থীদের সরিয়ে নেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ভয়াবহ বন্যার স্রোত আছড়ে পড়ে পুরো এলাকায়। কাদা, পাথর, বরফ ও বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষ মিশ্রিত প্রবল স্রোত একের পর এক ভবন, সেতু ও স্থাপনা ধ্বংস করতে থাকে। রক্ষা পায়নি ত্রিভুবন ত্রিশুলি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভবনটিও।

তবে ততক্ষণে স্কুলের ১ হাজার ৬৪৩ শিশুকেই নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল। বিদ্যালয়ের অধিকাংশ কর্মীও প্রাণে বেঁচে যান।

তবে এই দুর্যোগে বিদ্যালয়ের দুই কর্মী প্রাণ হারান।

৩২ বছর বয়সী সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক সান্তোস পারিয়ার নদীর কাছে ভাড়া বাসায় খাবার রান্না করতে ফিরে যাওয়ার পর বন্যার স্রোতে ভেসে যান। অন্যদিকে বিদ্যালয়ের দারোয়ান সুলতান লামা স্কুলের দরজা বন্ধ করতে গিয়ে নিখোঁজ হন।

নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছাকাছি লাংতাং লিরুং শৃঙ্গ থেকে বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথর ধসে পড়ার পর এই ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। বরফ ও পাথরের বিশাল স্তূপ লেন্দে খোলা নদীর উজানে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে আছড়ে পড়লে নদীর পানির প্রবাহ ভয়ংকর রূপ নেয়।

দুর্যোগে নেপাল ও তিব্বতের বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নেপালে ৭৬৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং ২ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। অন্যদিকে চীন জানিয়েছে, তিব্বতে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

বন্যার আঘাতে বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলের ভেতরে শতাধিক শ্রমিক আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাদের উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেলে আটকে পড়াদের সহায়তায় পাইপের মাধ্যমে বাতাস পাঠিয়েছে নেপালি সেনাবাহিনী।

ভয়াবহ এই দুর্যোগের মধ্যে প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদির দ্রুত সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত ১ হাজার ৬৪৩ শিশুর জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কয়েক মিনিটের বিলম্বও যেখানে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারত, সেখানে একটি সতর্কতামূলক ফোনকল এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত বাঁচিয়ে দেয় পুরো একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ