বিশ্বজুড়ে অন্যতম বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নতুন সম্ভাবনার দিক উন্মোচন করেছেন বিজ্ঞানীরা। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট অংশকে উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে নতুন চিকিৎসাপদ্ধতি উদ্ভাবনের পথ খুলে দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ব্রাজিলের সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয় এবং নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের যৌথ গবেষণায় মস্তিষ্কের ‘ল্যাটেরাল প্যারাফেসিয়াল’ (পিএফএল) নামের একটি অঞ্চলের কার্যপ্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই অঞ্চলটি মূলত শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও এটি রক্তনালির সংকোচন এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গবেষকদের মতে, শ্বাস-প্রশ্বাসের নির্দিষ্ট ধরণ—বিশেষ করে ব্যায়াম, কাশি বা হাসির সময় জোরে শ্বাস ছাড়ার প্রক্রিয়া—এই পিএফএল অঞ্চলকে সক্রিয় করে তুলতে পারে। এর ফলে রক্তনালি সংকুচিত হয়ে রক্তচাপ বৃদ্ধি পেতে পারে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, পিএফএল অঞ্চল শুধু শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ নয়; এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। এই অঞ্চল সক্রিয় থাকলে রক্তচাপ বেড়ে যায়, আর এটি নিষ্ক্রিয় করা হলে রক্তচাপ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
প্রাণী পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। ইঁদুরের ওপর জিনগত প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়, যেখানে পিএফএল অঞ্চলের নিউরনগুলো আলাদাভাবে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় করা হয়। পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, নিউরন সক্রিয় হলে রক্তচাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়, আর নিষ্ক্রিয় করলে তা স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে আসে।
গবেষণাটি আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘সার্কুলেশন রিসার্চ’-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষক জুলিয়ান প্যাটন জানান, উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রে এই মস্তিষ্ক অঞ্চলটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
তার ভাষায়, “উচ্চ রক্তচাপের অবস্থায় পিএফএল অঞ্চল সক্রিয় হয়ে ওঠে, আর আমরা যখন এটি নিষ্ক্রিয় করি, তখন রক্তচাপ স্বাভাবিক হয়ে যায়।” তিনি আরও বলেন, এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে উচ্চ রক্তচাপ চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, বর্তমানে ব্যবহৃত প্রচলিত চিকিৎসায় প্রায় ৪০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে রক্তচাপ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে না। ফলে নতুন লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই অনুভূত হচ্ছে।
গবেষণায় স্লিপ অ্যাপনিয়ার সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্কের দিকটিও তুলে ধরা হয়েছে। ঘুমের সময় শ্বাসপ্রশ্বাসে ব্যাঘাত ঘটলে শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয় এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে যায়। এই পরিবর্তন পিএফএল নিউরনকে সক্রিয় করে তুলতে পারে, যা পরবর্তীতে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়।
তবে গবেষকরা সতর্ক করেছেন, এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য মূলত প্রাণী পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে। মানুষের শরীরে একই প্রক্রিয়া কতটা কার্যকরভাবে কাজ করে, তা নিশ্চিত করতে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। এ অবস্থায় এই গবেষণা চিকিৎসাবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মস্তিষ্কের এই নির্দিষ্ট অঞ্চলকে লক্ষ্য করে ভবিষ্যতে নতুন ধরনের থেরাপি উদ্ভাবন করা সম্ভব হতে পারে, যা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা কমাতে সহায়ক হবে।
#আরএ
বিষয় : উচ্চ রক্তচাপ

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬
বিশ্বজুড়ে অন্যতম বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নতুন সম্ভাবনার দিক উন্মোচন করেছেন বিজ্ঞানীরা। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট অংশকে উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে নতুন চিকিৎসাপদ্ধতি উদ্ভাবনের পথ খুলে দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ব্রাজিলের সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয় এবং নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের যৌথ গবেষণায় মস্তিষ্কের ‘ল্যাটেরাল প্যারাফেসিয়াল’ (পিএফএল) নামের একটি অঞ্চলের কার্যপ্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই অঞ্চলটি মূলত শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও এটি রক্তনালির সংকোচন এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গবেষকদের মতে, শ্বাস-প্রশ্বাসের নির্দিষ্ট ধরণ—বিশেষ করে ব্যায়াম, কাশি বা হাসির সময় জোরে শ্বাস ছাড়ার প্রক্রিয়া—এই পিএফএল অঞ্চলকে সক্রিয় করে তুলতে পারে। এর ফলে রক্তনালি সংকুচিত হয়ে রক্তচাপ বৃদ্ধি পেতে পারে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, পিএফএল অঞ্চল শুধু শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ নয়; এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। এই অঞ্চল সক্রিয় থাকলে রক্তচাপ বেড়ে যায়, আর এটি নিষ্ক্রিয় করা হলে রক্তচাপ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
প্রাণী পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। ইঁদুরের ওপর জিনগত প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়, যেখানে পিএফএল অঞ্চলের নিউরনগুলো আলাদাভাবে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় করা হয়। পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, নিউরন সক্রিয় হলে রক্তচাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়, আর নিষ্ক্রিয় করলে তা স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে আসে।
গবেষণাটি আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘সার্কুলেশন রিসার্চ’-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষক জুলিয়ান প্যাটন জানান, উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রে এই মস্তিষ্ক অঞ্চলটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
তার ভাষায়, “উচ্চ রক্তচাপের অবস্থায় পিএফএল অঞ্চল সক্রিয় হয়ে ওঠে, আর আমরা যখন এটি নিষ্ক্রিয় করি, তখন রক্তচাপ স্বাভাবিক হয়ে যায়।” তিনি আরও বলেন, এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে উচ্চ রক্তচাপ চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, বর্তমানে ব্যবহৃত প্রচলিত চিকিৎসায় প্রায় ৪০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে রক্তচাপ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে না। ফলে নতুন লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই অনুভূত হচ্ছে।
গবেষণায় স্লিপ অ্যাপনিয়ার সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্কের দিকটিও তুলে ধরা হয়েছে। ঘুমের সময় শ্বাসপ্রশ্বাসে ব্যাঘাত ঘটলে শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয় এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে যায়। এই পরিবর্তন পিএফএল নিউরনকে সক্রিয় করে তুলতে পারে, যা পরবর্তীতে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়।
তবে গবেষকরা সতর্ক করেছেন, এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য মূলত প্রাণী পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে। মানুষের শরীরে একই প্রক্রিয়া কতটা কার্যকরভাবে কাজ করে, তা নিশ্চিত করতে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। এ অবস্থায় এই গবেষণা চিকিৎসাবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মস্তিষ্কের এই নির্দিষ্ট অঞ্চলকে লক্ষ্য করে ভবিষ্যতে নতুন ধরনের থেরাপি উদ্ভাবন করা সম্ভব হতে পারে, যা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা কমাতে সহায়ক হবে।
#আরএ

আপনার মতামত লিখুন