ফরিদপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের পর এক নারীর পেটে গজ রেখে সেলাই করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রায় দেড় মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা গেছেন কনিকা মণ্ডল (৩৫)। এ ঘটনায় এলাকায় ক্ষোভ ও শোকের সৃষ্টি হয়েছে।
শুক্রবার সকালে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বাঘুটিয়া গ্রামে কনিকার বাড়িতে যান স্বাস্থ্য মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি নিহতের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন এবং পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন। এ সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের আশ্বাস দেন।
কনিকার মৃত্যুর ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
নিহত কনিকা মণ্ডল বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বাঘুটিয়া গ্রামের অশান্ত মণ্ডলের স্ত্রী। স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ২৯ জুন ফরিদপুরের সমরিতা হাসপাতালে কনিকার সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, অপারেশনের সময় তাঁর পেটে গজ রেখেই সেলাই করে দেন চিকিৎসক লক্ষ্মী রানি দত্ত।
অপারেশনের পর কনিকার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। পরে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রায় দেড় মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ১৯ আগস্ট রাতে তাঁর মৃত্যু হয়।
কনিকার স্বামী অশান্ত মণ্ডল বলেন, অপারেশনের পর থেকেই তাঁর স্ত্রীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। পরে ঢাকায় নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
মায়ের মৃত্যুতে ক্ষোভ ও কষ্ট প্রকাশ করে কনিকার ছেলে পার্থ মণ্ডল বলেন, ‘আমার মায়ের মৃত্যু হয়েছে। এই ক্ষতি কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব নয়। আর যেন কোনো মায়ের এভাবে মৃত্যু না হয়, সে জন্য ওই হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের শাস্তি চাই।’
কনিকার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে আছে। ঘরের বারান্দায় কনিকার দেড় মাস বয়সী সন্তানকে কোলে নিয়ে কান্না করছেন তাঁর বোন দীপিকা বিশ্বাস দীপা। পাশে রয়েছে কনিকার আরও দুই সন্তান। প্রতিবেশীরা তাঁদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আসার খবর পেয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও কনিকার বাড়িতে জড়ো হন। তবে মানুষের ভিড়ের মধ্যেও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ছিল গভীর শোকের ছায়া।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাঁরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আর্থিক সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা সোলেমান বিশ্বাস বলেন, চিকিৎসার নামে রোগীদের সঙ্গে এমন ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কনিকার মৃত্যুর জন্য দায়ী চিকিৎসকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি। পাশাপাশি ভবিষ্যতে দেশের আর কোনো পরিবার যেন এমন পরিস্থিতির শিকার না হয়, সে জন্য বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর চিকিৎসাব্যবস্থা কঠোরভাবে তদারকির আহ্বান জানান।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মোসলেম খান বলেন, কনিকার চিকিৎসা ও দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকার কারণে পরিবারটি আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর দাবি, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক।
স্বাস্থ্য মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘ঘটনার তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিককে ঘিরে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ এবং বিভিন্ন অনিয়মের কথা শোনা যায়। এসব বিষয়ে সরকার নজর দিচ্ছে। কনিকা মণ্ডলের মৃত্যুর ঘটনাটিও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে।
এখন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের দিকে তাকিয়ে আছেন কনিকার স্বজন ও এলাকাবাসী। তাঁদের প্রত্যাশা, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতে চিকিৎসাসেবায় এমন অবহেলার পুনরাবৃত্তি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ আগস্ট ২০২৬
ফরিদপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের পর এক নারীর পেটে গজ রেখে সেলাই করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রায় দেড় মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা গেছেন কনিকা মণ্ডল (৩৫)। এ ঘটনায় এলাকায় ক্ষোভ ও শোকের সৃষ্টি হয়েছে।
শুক্রবার সকালে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বাঘুটিয়া গ্রামে কনিকার বাড়িতে যান স্বাস্থ্য মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি নিহতের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন এবং পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন। এ সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের আশ্বাস দেন।
কনিকার মৃত্যুর ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
নিহত কনিকা মণ্ডল বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বাঘুটিয়া গ্রামের অশান্ত মণ্ডলের স্ত্রী। স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ২৯ জুন ফরিদপুরের সমরিতা হাসপাতালে কনিকার সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, অপারেশনের সময় তাঁর পেটে গজ রেখেই সেলাই করে দেন চিকিৎসক লক্ষ্মী রানি দত্ত।
অপারেশনের পর কনিকার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। পরে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রায় দেড় মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ১৯ আগস্ট রাতে তাঁর মৃত্যু হয়।
কনিকার স্বামী অশান্ত মণ্ডল বলেন, অপারেশনের পর থেকেই তাঁর স্ত্রীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। পরে ঢাকায় নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
মায়ের মৃত্যুতে ক্ষোভ ও কষ্ট প্রকাশ করে কনিকার ছেলে পার্থ মণ্ডল বলেন, ‘আমার মায়ের মৃত্যু হয়েছে। এই ক্ষতি কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব নয়। আর যেন কোনো মায়ের এভাবে মৃত্যু না হয়, সে জন্য ওই হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের শাস্তি চাই।’
কনিকার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে আছে। ঘরের বারান্দায় কনিকার দেড় মাস বয়সী সন্তানকে কোলে নিয়ে কান্না করছেন তাঁর বোন দীপিকা বিশ্বাস দীপা। পাশে রয়েছে কনিকার আরও দুই সন্তান। প্রতিবেশীরা তাঁদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আসার খবর পেয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও কনিকার বাড়িতে জড়ো হন। তবে মানুষের ভিড়ের মধ্যেও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ছিল গভীর শোকের ছায়া।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাঁরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আর্থিক সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা সোলেমান বিশ্বাস বলেন, চিকিৎসার নামে রোগীদের সঙ্গে এমন ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কনিকার মৃত্যুর জন্য দায়ী চিকিৎসকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি। পাশাপাশি ভবিষ্যতে দেশের আর কোনো পরিবার যেন এমন পরিস্থিতির শিকার না হয়, সে জন্য বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর চিকিৎসাব্যবস্থা কঠোরভাবে তদারকির আহ্বান জানান।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মোসলেম খান বলেন, কনিকার চিকিৎসা ও দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকার কারণে পরিবারটি আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর দাবি, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক।
স্বাস্থ্য মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘ঘটনার তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিককে ঘিরে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ এবং বিভিন্ন অনিয়মের কথা শোনা যায়। এসব বিষয়ে সরকার নজর দিচ্ছে। কনিকা মণ্ডলের মৃত্যুর ঘটনাটিও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে।
এখন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের দিকে তাকিয়ে আছেন কনিকার স্বজন ও এলাকাবাসী। তাঁদের প্রত্যাশা, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতে চিকিৎসাসেবায় এমন অবহেলার পুনরাবৃত্তি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

আপনার মতামত লিখুন