ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়েও কেন দেশে ফিরতে চান শেখ হাসিনা?


নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০২৬

মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়েও কেন দেশে ফিরতে চান শেখ হাসিনা?
ছবি: সংগৃহীত

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, চলতি বছরের ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন। যদিও নির্দিষ্ট কোনো তারিখ বা পরিকল্পনা প্রকাশ করেননি।

২০২৪ সালের সরকারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনা তার অনুপস্থিতিতে পরিচালিত বিচারপ্রক্রিয়ায় আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে বুধবার (৫ আগস্ট) দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে অডিওবার্তার মাধ্যমে বক্তব্য দেন তিনি। সেখানে শেখ হাসিনা বলেন, "আমাকে নিজ দেশে ফিরতেই হবে।" তবে কবে এবং কীভাবে ফিরবেন, সে বিষয়ে এখনই কিছু জানাতে চাননি।

১৫ বছরের বেশি সময় প্রধানমন্ত্রী থাকার পর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এটিই ছিল গণমাধ্যমের সঙ্গে তার প্রথম আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ। দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে অডিও লিংকের মাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও উত্তর দেন তিনি।

এদিকে জাতিসংঘের তদন্তকারীরা দাবি করেছেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় ক্ষমতায় টিকে থাকতে শেখ হাসিনা ও তার সরকার পরিকল্পিত প্রাণঘাতী সহিংসতার আশ্রয় নিয়েছিল। বিবিসি আই-এর যাচাই করা একটি ফোনালাপের অডিওতেও বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের অনুমোদন দিতে শেখ হাসিনার কণ্ঠ শোনা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রসিকিউশন ওই অডিওকে মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করে।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন পরবর্তীতে সরকারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলি ও বিভিন্ন সংঘর্ষে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রবল গণবিক্ষোভের মুখে ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা ঢাকা ছেড়ে ভারতে চলে যান। তার দেশত্যাগের পর হাজারো বিক্ষোভকারী প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ও বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় প্রবেশ করে। এরপর দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হলে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে।

পরবর্তী সময়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসে এবং দলটির নেতা তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। নতুন সরকার শেখ হাসিনার বক্তব্য স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রচার বা প্রকাশ না করার বিষয়ে সতর্কবার্তাও জারি করে।

অন্যদিকে শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। চলতি বছরের নির্বাচনে দলটিকে অংশ নেওয়ার সুযোগও দেওয়া হয়নি। আওয়ামী লীগের নেতাদের অভিযোগ, দলটির শত শত সমর্থক গণপিটুনি ও সহিংসতায় নিহত হয়েছেন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতেও বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার সাবেক প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যিনি বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন, বিবিসিকে বলেন, "শেখ হাসিনা যদি ফিরে না যান, তাহলে সহিংসতা চলতেই থাকবে এবং আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হবে।"

দলের ভেতরেও অসন্তোষ বাড়ছে বলে জানা গেছে। অনেক শীর্ষ নেতা বিদেশে চলে গেলেও মধ্যম সারির নেতা ও কর্মীদের সম্ভাব্য ঝুঁকির মুখে রেখে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। ঢাকাভিত্তিক বিশ্লেষক ডেভিড বার্গম্যানের ভাষ্য, বাংলাদেশে ফিরলে তাকে সঙ্গে সঙ্গেই গ্রেফতার করা হতে পারে। তবে ভবিষ্যতে দেশের রাজনীতিতে নিজের প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখতে হলে শেখ হাসিনার দেশে ফিরে পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই বলেও তিনি মনে করেন।

সব মিলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় ও সম্ভাব্য গ্রেফতারের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা ও জল্পনার জন্ম দিয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়েও কেন দেশে ফিরতে চান শেখ হাসিনা?

প্রকাশের তারিখ : ০৬ আগস্ট ২০২৬

featured Image

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, চলতি বছরের ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন। যদিও নির্দিষ্ট কোনো তারিখ বা পরিকল্পনা প্রকাশ করেননি।

২০২৪ সালের সরকারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনা তার অনুপস্থিতিতে পরিচালিত বিচারপ্রক্রিয়ায় আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে বুধবার (৫ আগস্ট) দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে অডিওবার্তার মাধ্যমে বক্তব্য দেন তিনি। সেখানে শেখ হাসিনা বলেন, "আমাকে নিজ দেশে ফিরতেই হবে।" তবে কবে এবং কীভাবে ফিরবেন, সে বিষয়ে এখনই কিছু জানাতে চাননি।

১৫ বছরের বেশি সময় প্রধানমন্ত্রী থাকার পর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এটিই ছিল গণমাধ্যমের সঙ্গে তার প্রথম আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ। দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে অডিও লিংকের মাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও উত্তর দেন তিনি।

এদিকে জাতিসংঘের তদন্তকারীরা দাবি করেছেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় ক্ষমতায় টিকে থাকতে শেখ হাসিনা ও তার সরকার পরিকল্পিত প্রাণঘাতী সহিংসতার আশ্রয় নিয়েছিল। বিবিসি আই-এর যাচাই করা একটি ফোনালাপের অডিওতেও বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের অনুমোদন দিতে শেখ হাসিনার কণ্ঠ শোনা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রসিকিউশন ওই অডিওকে মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করে।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন পরবর্তীতে সরকারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলি ও বিভিন্ন সংঘর্ষে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রবল গণবিক্ষোভের মুখে ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা ঢাকা ছেড়ে ভারতে চলে যান। তার দেশত্যাগের পর হাজারো বিক্ষোভকারী প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ও বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় প্রবেশ করে। এরপর দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হলে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে।

পরবর্তী সময়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসে এবং দলটির নেতা তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। নতুন সরকার শেখ হাসিনার বক্তব্য স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রচার বা প্রকাশ না করার বিষয়ে সতর্কবার্তাও জারি করে।

অন্যদিকে শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। চলতি বছরের নির্বাচনে দলটিকে অংশ নেওয়ার সুযোগও দেওয়া হয়নি। আওয়ামী লীগের নেতাদের অভিযোগ, দলটির শত শত সমর্থক গণপিটুনি ও সহিংসতায় নিহত হয়েছেন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতেও বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার সাবেক প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যিনি বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন, বিবিসিকে বলেন, "শেখ হাসিনা যদি ফিরে না যান, তাহলে সহিংসতা চলতেই থাকবে এবং আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হবে।"

দলের ভেতরেও অসন্তোষ বাড়ছে বলে জানা গেছে। অনেক শীর্ষ নেতা বিদেশে চলে গেলেও মধ্যম সারির নেতা ও কর্মীদের সম্ভাব্য ঝুঁকির মুখে রেখে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। ঢাকাভিত্তিক বিশ্লেষক ডেভিড বার্গম্যানের ভাষ্য, বাংলাদেশে ফিরলে তাকে সঙ্গে সঙ্গেই গ্রেফতার করা হতে পারে। তবে ভবিষ্যতে দেশের রাজনীতিতে নিজের প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখতে হলে শেখ হাসিনার দেশে ফিরে পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই বলেও তিনি মনে করেন।

সব মিলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় ও সম্ভাব্য গ্রেফতারের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা ও জল্পনার জন্ম দিয়েছে।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ