ঢাকা    মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

কীভাবে ধৌত করা হয় পবিত্র কাবা শরিফ?


নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৯ জুন ২০২৬

কীভাবে ধৌত করা হয় পবিত্র কাবা শরিফ?
ছবি: সংগৃহীত

ইসলামি বিশ্বের অন্যতম পবিত্র ও আবেগঘন ধর্মীয় আয়োজন ‘গুসল কাবা’ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামী ৩০ জুন (মঙ্গলবার)। ১৪৪৮ হিজরির ১৫ মহররম পবিত্র কাবা শরিফের বার্ষিক ধৌতকরণ উপলক্ষে সব ধরনের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছে সৌদি আরবের দুই পবিত্র মসজিদের পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ।

এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কার্যক্রম নয়; বরং ১,৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এক আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য, যা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সুন্নাহর অনুসরণে আজও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালন করা হয়।

নবীজির (সা.) সুন্নাহ থেকে ঐতিহ্যের সূচনা

ইসলামি ইতিহাস অনুযায়ী, ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে মক্কা বিজয়ের পর মহানবী (সা.) কাবা শরিফে প্রবেশ করে জমজমের পানি দিয়ে এর অভ্যন্তর পরিষ্কার করেছিলেন। সেই ঘটনাকেই ‘গুসল কাবা’র সূচনা হিসেবে ধরা হয়।

পরবর্তীকালে এই সুন্নাহকে ভিত্তি করে কাবা ধৌতকরণ একটি নিয়মিত ও আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় আয়োজনে পরিণত হয়, যা বর্তমানে সৌদি সরকারের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

কবে অনুষ্ঠিত হয় গুসল কাবা?

আগে বছরে দুইবার কাবা শরিফ ধৌত করা হতো। একবার রমজান মাসের আগে এবং আরেকবার হজ মৌসুম শেষে মহররম মাসে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাধারণত বছরে একবার, মহররম মাসেই এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানের দিন ফজরের নামাজের পর বিশেষ সিঁড়ির মাধ্যমে কাবা শরিফের দরজা খোলা হয়। এর আগের রাতে এশার নামাজের পর কাবার গিলাফ (কিসওয়া) কিছুটা ওপরে তুলে রাখা হয়, যাতে ধৌতকরণের কাজ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা যায়।

যেভাবে ধৌত করা হয় কাবা শরিফ

গুসল কাবার পুরো প্রক্রিয়া তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয়।

প্রথম ধাপ:

কাবা শরিফের অভ্যন্তরের দেয়াল ও মেঝে একটি বিশেষ সুগন্ধি মিশ্রণ দিয়ে ধৌত করা হয়। এই মিশ্রণে থাকে পবিত্র জমজমের পানি, তায়েফের গোলাপজল, গোলাপ তেল, উদ (আগরউড) তেল এবং কস্তুরী।

দ্বিতীয় ধাপ:

ধৌতকরণ শেষে নরম ও উন্নত মানের সাদা কাপড় দিয়ে কাবার ভেতরের অংশ ভালোভাবে মুছে শুকানো হয়।

তৃতীয় ধাপ:

সবশেষে কাবার অভ্যন্তরে সুগন্ধি ছিটিয়ে দেওয়া হয়, যা পুরো পরিবেশে এক বিশেষ আধ্যাত্মিক আবহ সৃষ্টি করে।

যেসব উপকরণ ব্যবহার করা হয়

ইসলামিক বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, ধৌতকরণে সাধারণত ব্যবহৃত হয়—

  • প্রায় ৪০ লিটার জমজমের পানি
  • প্রায় ৫৪০ মিলিলিটার তায়েফের গোলাপজল
  • প্রায় ২৪ মিলিলিটার গোলাপ তেল
  • প্রায় ২৪ মিলিলিটার উদ (আগরউড) তেল
  • প্রায় ৩ মিলিলিটার কস্তুরী

এখানে গোলাপজল ও গোলাপ তেল দুটি ভিন্ন উপাদান। গোলাপজল সুগন্ধিযুক্ত তরল, আর গোলাপ তেল অত্যন্ত ঘন ও মূল্যবান সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

কারা অংশ নেন?

গুসল কাবা সাধারণত সৌদি বাদশাহ অথবা তাঁর মনোনীত প্রতিনিধির নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় দুই পবিত্র মসজিদের পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিশিষ্ট আলেম এবং কাবা শরিফের ঐতিহাসিক চাবির দায়িত্বে থাকা বনু শায়বা পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত থাকেন।

সাধারণ মানুষের প্রবেশ থাকে না

কাবা শরিফের অভ্যন্তর সাধারণ সময় জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে না। গুসল কাবার দিনও এটি সীমিত সংখ্যক আমন্ত্রিত ব্যক্তির উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয়।

তবে বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান টেলিভিশন ও বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক আয়োজন প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পান।

শতাব্দী পেরিয়েও অমলিন এক ঐতিহ্য

গুসল কাবা শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, ভালোবাসা ও পবিত্র কাবা শরিফের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার প্রতীক। মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ থেকে উৎসারিত এই আয়োজন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একই মর্যাদা ও আধ্যাত্মিক আবেদন নিয়ে মুসলিম বিশ্বের হৃদয়ে স্থান করে আছে।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬


কীভাবে ধৌত করা হয় পবিত্র কাবা শরিফ?

প্রকাশের তারিখ : ২৯ জুন ২০২৬

featured Image

ইসলামি বিশ্বের অন্যতম পবিত্র ও আবেগঘন ধর্মীয় আয়োজন ‘গুসল কাবা’ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামী ৩০ জুন (মঙ্গলবার)। ১৪৪৮ হিজরির ১৫ মহররম পবিত্র কাবা শরিফের বার্ষিক ধৌতকরণ উপলক্ষে সব ধরনের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছে সৌদি আরবের দুই পবিত্র মসজিদের পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ।

এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কার্যক্রম নয়; বরং ১,৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এক আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য, যা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সুন্নাহর অনুসরণে আজও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালন করা হয়।

নবীজির (সা.) সুন্নাহ থেকে ঐতিহ্যের সূচনা

ইসলামি ইতিহাস অনুযায়ী, ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে মক্কা বিজয়ের পর মহানবী (সা.) কাবা শরিফে প্রবেশ করে জমজমের পানি দিয়ে এর অভ্যন্তর পরিষ্কার করেছিলেন। সেই ঘটনাকেই ‘গুসল কাবা’র সূচনা হিসেবে ধরা হয়।

পরবর্তীকালে এই সুন্নাহকে ভিত্তি করে কাবা ধৌতকরণ একটি নিয়মিত ও আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় আয়োজনে পরিণত হয়, যা বর্তমানে সৌদি সরকারের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

কবে অনুষ্ঠিত হয় গুসল কাবা?

আগে বছরে দুইবার কাবা শরিফ ধৌত করা হতো। একবার রমজান মাসের আগে এবং আরেকবার হজ মৌসুম শেষে মহররম মাসে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাধারণত বছরে একবার, মহররম মাসেই এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানের দিন ফজরের নামাজের পর বিশেষ সিঁড়ির মাধ্যমে কাবা শরিফের দরজা খোলা হয়। এর আগের রাতে এশার নামাজের পর কাবার গিলাফ (কিসওয়া) কিছুটা ওপরে তুলে রাখা হয়, যাতে ধৌতকরণের কাজ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা যায়।

যেভাবে ধৌত করা হয় কাবা শরিফ

গুসল কাবার পুরো প্রক্রিয়া তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয়।

প্রথম ধাপ:

কাবা শরিফের অভ্যন্তরের দেয়াল ও মেঝে একটি বিশেষ সুগন্ধি মিশ্রণ দিয়ে ধৌত করা হয়। এই মিশ্রণে থাকে পবিত্র জমজমের পানি, তায়েফের গোলাপজল, গোলাপ তেল, উদ (আগরউড) তেল এবং কস্তুরী।

দ্বিতীয় ধাপ:

ধৌতকরণ শেষে নরম ও উন্নত মানের সাদা কাপড় দিয়ে কাবার ভেতরের অংশ ভালোভাবে মুছে শুকানো হয়।

তৃতীয় ধাপ:

সবশেষে কাবার অভ্যন্তরে সুগন্ধি ছিটিয়ে দেওয়া হয়, যা পুরো পরিবেশে এক বিশেষ আধ্যাত্মিক আবহ সৃষ্টি করে।

যেসব উপকরণ ব্যবহার করা হয়

ইসলামিক বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, ধৌতকরণে সাধারণত ব্যবহৃত হয়—

  • প্রায় ৪০ লিটার জমজমের পানি
  • প্রায় ৫৪০ মিলিলিটার তায়েফের গোলাপজল
  • প্রায় ২৪ মিলিলিটার গোলাপ তেল
  • প্রায় ২৪ মিলিলিটার উদ (আগরউড) তেল
  • প্রায় ৩ মিলিলিটার কস্তুরী

এখানে গোলাপজল ও গোলাপ তেল দুটি ভিন্ন উপাদান। গোলাপজল সুগন্ধিযুক্ত তরল, আর গোলাপ তেল অত্যন্ত ঘন ও মূল্যবান সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

কারা অংশ নেন?

গুসল কাবা সাধারণত সৌদি বাদশাহ অথবা তাঁর মনোনীত প্রতিনিধির নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় দুই পবিত্র মসজিদের পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিশিষ্ট আলেম এবং কাবা শরিফের ঐতিহাসিক চাবির দায়িত্বে থাকা বনু শায়বা পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত থাকেন।

সাধারণ মানুষের প্রবেশ থাকে না

কাবা শরিফের অভ্যন্তর সাধারণ সময় জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে না। গুসল কাবার দিনও এটি সীমিত সংখ্যক আমন্ত্রিত ব্যক্তির উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয়।

তবে বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান টেলিভিশন ও বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক আয়োজন প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পান।

শতাব্দী পেরিয়েও অমলিন এক ঐতিহ্য

গুসল কাবা শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, ভালোবাসা ও পবিত্র কাবা শরিফের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার প্রতীক। মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ থেকে উৎসারিত এই আয়োজন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একই মর্যাদা ও আধ্যাত্মিক আবেদন নিয়ে মুসলিম বিশ্বের হৃদয়ে স্থান করে আছে।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ