বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ নিয়ে আলোচনা প্রায়ই সামনে আসে। কখনো খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির তথ্য প্রকাশ হয়, কখনো ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয়, আবার কখনো কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দেউলিয়া হওয়ার খবর শিরোনাম হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৫ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই ছিল ‘ডিস্ট্রেসড লোন’ বা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ। অর্থাৎ, এসব ঋণ ভবিষ্যতে খেলাপিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
ব্যাংকিং খাতে বহুল ব্যবহৃত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দের অর্থ ও তাৎপর্য সহজ ভাষায় তুলে ধরা হলো।
খেলাপি ঋণ (Non-Performing Loan বা NPL) হলো এমন ঋণ, যার কিস্তি বা সুদ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ করা হয়নি এবং ব্যাংক সেটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
সাধারণত ৯০ দিন বা তার বেশি সময় ঋণের কিস্তি বকেয়া থাকলে সেটি খেলাপি ঋণ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল ইসলাম জাহিদের মতে, বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশেরও বেশি। তার ভাষায়, প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা অনাদায়ী থাকলে সেটি ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় ধরনের সংকেত।
সব ডিস্ট্রেসড লোন খেলাপি ঋণ নয়।
ডিস্ট্রেসড লোন বলতে এমন ঋণকে বোঝায়, যা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি হয়নি, তবে ঋণগ্রহীতার আর্থিক অবস্থা ও পরিশোধের ধারা দেখে ভবিষ্যতে খেলাপি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পর্যায়ে ঋণ শনাক্ত করা গেলে ব্যাংক আগেভাগে ব্যবস্থা নিতে পারে। এজন্য ঋণগ্রহীতার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, জামানত পুনর্মূল্যায়ন এবং সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
কোনো ঋণগ্রহীতা নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ব্যাংক বিশেষ শর্তে নতুন করে পরিশোধের সময়সূচি নির্ধারণ করতে পারে। এটিই ঋণ পুনঃতফসিল বা লোন রিশিডিউলিং।
এ ক্ষেত্রে সাধারণত:
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাময়িক আর্থিক সংকটে পড়া কিন্তু ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে এমন ব্যবসার জন্য এটি কার্যকর সমাধান হতে পারে।
তবে যথাযথ যাচাই ছাড়া বারবার পুনঃতফসিলের সুযোগ দিলে প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র আড়াল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
যখন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আর আয়, সম্পদ বা অন্য কোনো উপায়ে দেনা পরিশোধ করতে সক্ষম হয় না, তখন সেটিকে দেউলিয়াত্ব বা ব্যাংকরাপ্সি বলা হয়।
তবে শুধু ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলেই কেউ দেউলিয়া হয়ে যায় না। সাধারণত আদালতের মাধ্যমে একটি আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর কাউকে দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণগ্রহীতার সম্পদ বিক্রি করেও যদি ঋণ আদায় সম্ভব না হয়, তখন বিষয়টি আদালতে গড়ায় এবং আদালত প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়।
ঋণ পুনরুদ্ধার বা লোন রিকভারি বলতে বকেয়া ঋণ আদায়ের জন্য ব্যাংকের নেওয়া পদক্ষেপগুলোকে বোঝায়।
সাধারণত প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে এগোয়:
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ও প্রকৃত ব্যবসায়িক সংকটে পড়া ঋণগ্রহীতাদের আলাদাভাবে বিবেচনা করা উচিত। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন হলেও প্রকৃত সংকটে থাকা ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে পুনঃতফসিল বা অন্যান্য সহায়ক ব্যবস্থা অর্থনীতির জন্য বেশি কার্যকর হতে পারে।
সব ঋণ একই ধরনের নয়।
সিকিউরড লোন বা জামানতনির্ভর ঋণের ক্ষেত্রে ঋণের বিপরীতে জমি, ভবন বা অন্য সম্পদ বন্ধক রাখা হয়। কিন্তু সম্পদের মূল্য অতিমূল্যায়ন করা হলে পরবর্তীতে সেটি বিক্রি করেও পুরো ঋণ আদায় সম্ভব নাও হতে পারে।
অন্যদিকে আনসিকিউরড লোন বা জামানতবিহীন ঋণের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি থাকে। যেমন, কিছু ভোক্তা ঋণ বা ক্রেডিট কার্ড ঋণ।
খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকের সমস্যা নয়। এটি ব্যাংকের তারল্য, নতুন ঋণ বিতরণ, বিনিয়োগ, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং আমানতকারীদের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
খেলাপি ঋণ বাড়লে ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যায়, অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয় এবং পুরো আর্থিক খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়।

মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ জুন ২০২৬
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ নিয়ে আলোচনা প্রায়ই সামনে আসে। কখনো খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির তথ্য প্রকাশ হয়, কখনো ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয়, আবার কখনো কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দেউলিয়া হওয়ার খবর শিরোনাম হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৫ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই ছিল ‘ডিস্ট্রেসড লোন’ বা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ। অর্থাৎ, এসব ঋণ ভবিষ্যতে খেলাপিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
ব্যাংকিং খাতে বহুল ব্যবহৃত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দের অর্থ ও তাৎপর্য সহজ ভাষায় তুলে ধরা হলো।
খেলাপি ঋণ (Non-Performing Loan বা NPL) হলো এমন ঋণ, যার কিস্তি বা সুদ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ করা হয়নি এবং ব্যাংক সেটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
সাধারণত ৯০ দিন বা তার বেশি সময় ঋণের কিস্তি বকেয়া থাকলে সেটি খেলাপি ঋণ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল ইসলাম জাহিদের মতে, বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশেরও বেশি। তার ভাষায়, প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা অনাদায়ী থাকলে সেটি ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় ধরনের সংকেত।
সব ডিস্ট্রেসড লোন খেলাপি ঋণ নয়।
ডিস্ট্রেসড লোন বলতে এমন ঋণকে বোঝায়, যা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি হয়নি, তবে ঋণগ্রহীতার আর্থিক অবস্থা ও পরিশোধের ধারা দেখে ভবিষ্যতে খেলাপি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পর্যায়ে ঋণ শনাক্ত করা গেলে ব্যাংক আগেভাগে ব্যবস্থা নিতে পারে। এজন্য ঋণগ্রহীতার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, জামানত পুনর্মূল্যায়ন এবং সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
কোনো ঋণগ্রহীতা নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ব্যাংক বিশেষ শর্তে নতুন করে পরিশোধের সময়সূচি নির্ধারণ করতে পারে। এটিই ঋণ পুনঃতফসিল বা লোন রিশিডিউলিং।
এ ক্ষেত্রে সাধারণত:
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাময়িক আর্থিক সংকটে পড়া কিন্তু ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে এমন ব্যবসার জন্য এটি কার্যকর সমাধান হতে পারে।
তবে যথাযথ যাচাই ছাড়া বারবার পুনঃতফসিলের সুযোগ দিলে প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র আড়াল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
যখন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আর আয়, সম্পদ বা অন্য কোনো উপায়ে দেনা পরিশোধ করতে সক্ষম হয় না, তখন সেটিকে দেউলিয়াত্ব বা ব্যাংকরাপ্সি বলা হয়।
তবে শুধু ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলেই কেউ দেউলিয়া হয়ে যায় না। সাধারণত আদালতের মাধ্যমে একটি আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর কাউকে দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণগ্রহীতার সম্পদ বিক্রি করেও যদি ঋণ আদায় সম্ভব না হয়, তখন বিষয়টি আদালতে গড়ায় এবং আদালত প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়।
ঋণ পুনরুদ্ধার বা লোন রিকভারি বলতে বকেয়া ঋণ আদায়ের জন্য ব্যাংকের নেওয়া পদক্ষেপগুলোকে বোঝায়।
সাধারণত প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে এগোয়:
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ও প্রকৃত ব্যবসায়িক সংকটে পড়া ঋণগ্রহীতাদের আলাদাভাবে বিবেচনা করা উচিত। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন হলেও প্রকৃত সংকটে থাকা ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে পুনঃতফসিল বা অন্যান্য সহায়ক ব্যবস্থা অর্থনীতির জন্য বেশি কার্যকর হতে পারে।
সব ঋণ একই ধরনের নয়।
সিকিউরড লোন বা জামানতনির্ভর ঋণের ক্ষেত্রে ঋণের বিপরীতে জমি, ভবন বা অন্য সম্পদ বন্ধক রাখা হয়। কিন্তু সম্পদের মূল্য অতিমূল্যায়ন করা হলে পরবর্তীতে সেটি বিক্রি করেও পুরো ঋণ আদায় সম্ভব নাও হতে পারে।
অন্যদিকে আনসিকিউরড লোন বা জামানতবিহীন ঋণের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি থাকে। যেমন, কিছু ভোক্তা ঋণ বা ক্রেডিট কার্ড ঋণ।
খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকের সমস্যা নয়। এটি ব্যাংকের তারল্য, নতুন ঋণ বিতরণ, বিনিয়োগ, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং আমানতকারীদের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
খেলাপি ঋণ বাড়লে ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যায়, অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয় এবং পুরো আর্থিক খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়।

আপনার মতামত লিখুন