নওগাঁয় পেশাগত দায়িত্ব পালনের জেরে দুই সাংবাদিকের ছবি ব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে ভুয়া ছবি ও ভিডিও তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানহানিকর অপপ্রচার চালানোর অভিযোগ উঠেছে। সাংবাদিকদের হাতে ও পকেটে টাকার বান্ডিল দেখানো এবং বাড়ি থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে—এমন দৃশ্যের ছবি ও ভিডিও বিভিন্ন ফেসবুক আইডি থেকে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এ ঘটনায় নওগাঁ সদর মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন প্রাইম টিভির নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি সবুজ হোসেন। গত ৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে করা জিডির নম্বর ৪২০। অভিযোগকারীর দাবি, অপপ্রচারকারীদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সবুজ হোসেন বেসরকারি স্যাটেলাইট টিভি প্রাইম টিভি ও আজকের বাংলা জেলা প্রতিনিধি এবং দৈনিক মুক্ত খবর এবং উন্নয়নে বাংলাদেশ পত্রিকার নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি মো. কামরুল হাসান জীবন সম্প্রতি আত্রাই উপজেলার আহসানগঞ্জ-শাহাগোলা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী তহশিলদার মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেন। এসব প্রতিবেদনে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি, ভূমি অফিসে কথিত দালালদের দৌরাত্ম্য এবং অনুসন্ধান বন্ধ করতে সাংবাদিককে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাবের অভিযোগ তুলে ধরা হয়। প্রথম প্রতিবেদনে একজন সেবাগ্রহীতার লিখিত অভিযোগের বরাতে বলা হয়, জমির খাজনা বাবদ ১২ হাজার টাকা দেওয়ার বিপরীতে অনলাইন রসিদ দেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ৬০০ টাকার। পরবর্তী প্রতিবেদনে সাংবাদিকতার অনুসন্ধান বন্ধ করতে আর্থিক সুবিধা ও নিয়মিত মাসিক অর্থ দেওয়ার প্রস্তাবের অভিযোগ প্রকাশ করা হয়। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
সাংবাদিক সবুজ হোসেনের অভিযোগ, এসব সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই বিভিন্ন ফেসবুক আইডি ব্যবহার করে তাঁর ও সহকর্মী কামরুল হাসান জীবনের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও মানহানিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। তাঁদের ছবি এবং বিকাশের লেনদেনের স্ক্রিনশট ব্যবহার করে সাংবাদিকতার আড়ালে অর্থ আদায়, চাঁদাবাজি ও মাদক গ্রহণের মতো অভিযোগ তুলে পোস্ট দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর করা জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টার দিকে ‘পরিস্থিতি পরিস্থিতি’ নামের একটি ফেসবুক আইডিতে দুই সাংবাদিকের ছবি ও বিকাশের সেন্ড মানির স্ক্রিনশট ব্যবহার করে তাঁদের বিরুদ্ধে অর্থ আদায় এবং সাংবাদিকতার নাম ব্যবহার করে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগসংবলিত একটি পোস্ট দেখতে পান। পরবর্তী সময়ে ‘পরিস্থিতি পরিস্থিতি’, ‘স্বপ্ন স্বপ্ন’, ‘Nigeria Nigeria’, ‘জার্মানি জার্মানি’, ‘চাইনা চাইনা’ ও ‘Porse Khotun’সহ কয়েকটি ফেসবুক আইডি থেকে নওগাঁর বিভিন্ন গ্রুপ ও পেজে একই ধরনের পোস্ট ছড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়।
অভিযোগকারীর ভাষ্য, কিছু পোস্টে তাঁদের ছবি এমনভাবে সম্পাদনা করা হয়েছে অথবা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ছবি-ভিডিও তৈরি করা হয়েছে, যাতে তাঁদের হাতে কিংবা পকেটে টাকার বান্ডিল রয়েছে বলে মনে হয়। কোথাও আবার পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে—এমন দৃশ্যের মতো ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব কনটেন্টের মাধ্যমে তাঁদের পেশাগত সুনাম ও সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা চলছে বলে দাবি করেন তিনি। সবুজ হোসেন আরও অভিযোগ করেন, আহসানগঞ্জ-শাহাগোলা ভূমি অফিসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে পরিচিত সেন্টু নামের এক ব্যক্তির হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে পাঠানো কিছু বার্তার ভাষা ও বক্তব্যের সঙ্গে ভুয়া ফেসবুক আইডিগুলোর পোস্টের উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। তাঁর দাবি, +৮৮০১৬১১-২৯৯৪৭৫ নম্বর থেকে পাঠানো বার্তার সঙ্গে এসব পোস্টের মিল থাকায় তিনি ওই ব্যক্তির সম্পৃক্ততা নিয়ে সন্দেহ করছেন। তবে শুধু বার্তার ভাষা বা বক্তব্যের মিল দিয়ে অপপ্রচারের উৎস কিংবা কারও সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা যায় না; এ জন্য ডিজিটাল আলামত যাচাই ও তদন্ত প্রয়োজন।
এ বিষয়ে সাংবাদিকদের কাছে সেন্টু ক্ষমা চেয়ে পাঠানো বক্তব্যে বলেন, “ভাই, আমাকে মাফ করে দেন। আমি আপনার পায়ে ধরছি। আমার একটি মেয়ে সন্তান আছে, আমাকে ক্ষমা করে দেন। আপনারা সব নিউজ ও পোস্ট ডিলিট করেন, আমিও সব পোস্ট ডিলিট করার ব্যবস্থা করছি। আমি গরিব ছেলে, আমাকে ছেড়ে দেন ভাই। মুস্তাফিজুর ভাইকেও ছেড়ে দেন। আপনাদের নিয়মিত মাসিক সম্মানীর ব্যবস্থা করে দেবো ভাই।” তাঁর এই বক্তব্যে পোস্ট মুছে ফেলা এবং সাংবাদিকদের নিয়মিত মাসিক সম্মানী দেওয়ার প্রস্তাবের কথা উঠে এসেছে বলে দাবি করেছেন সাংবাদিকেরা। তবে বক্তব্যটির পূর্ণ প্রেক্ষাপট ও সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, এ বিষয়ে সহকারী তহশিলদার মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, “সেন্টু খাজনা খারিজের টাকা থেকে ভাইদের টাকা দিতে বলে। সে সাংবাদিকদেরও বলে, ভাই, এগুলো করেন না। এগুলো ম্যানেজ করার জন্য কী করা যায়, সেগুলো করেন। ভাই, আমি আপনাদের সম্মানী করব। আমার অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। আর কী হবে, আমি আর এই অফিসে থাকতে চাই না। আমাকে অন্য কোথাও যেখানে দেবে, সেখানেই শান্তি। এর আগে অনেক টাকা খরচ করেছি।”
তাঁদের এসব বক্তব্য ঘিরে ভূমি অফিসে খাজনা ও নামজারি-সংক্রান্ত সেবায় অর্থ লেনদেনের অভিযোগ নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে সরকারি ফি-র বাইরে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয় কি না, কথিত মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হয় কি না এবং সংগৃহীত অর্থের কোনো অংশ সংশ্লিষ্ট কারও কাছে যায় কি না—এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। তবে অভিযোগ ও বক্তব্যের ভিত্তিতে অর্থ ভাগাভাগির বিষয়টি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত বলা যায় না।
জনস্বার্থে প্রকাশিত সংবাদকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকদের ছবি ব্যবহার করে ভুয়া কনটেন্ট তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ যেমন গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন, তেমনি ভূমি অফিসে অনিয়ম, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং সাংবাদিকদের আর্থিক সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাবসংক্রান্ত অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল আলামত, আর্থিক লেনদেনের নথি, সেবাগ্রহীতাদের বক্তব্য এবং ভূমি অফিসের কার্যক্রম খতিয়ে দেখে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সাংবাদিকেরা।
ভূমি অফিসের অনিয়ম নিয়ে সংবাদ, দুই সাংবাদিকের ছবি বিকৃত করে অপপ্রচারের অভিযোগ, থানায় জিডি








