সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে দুই সাংবাদিকের ওপর ইন্টার্ন চিকিৎসকদের হামলার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছেন সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ। তাঁরা বলেছেন, স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের অধিকারকে শৃঙ্খলিত করার অপচেষ্টার অংশ হিসেবেই এ ধরনের ন্যক্কারজনক হামলা চালানো হয়েছে। এ ঘটনা শুধু সাংবাদিকদের ওপর নয়, বরং গোটা সিলেটবাসীর ন্যায্য অধিকার ও চিকিৎসাসেবা পাওয়ার দাবির ওপর আঘাত।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) দুপুরে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে সর্বস্তরের সাংবাদিকদের উদ্যোগে আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা এসব কথা বলেন। সমাবেশ থেকে অবিলম্বে হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি মুকতাবিস-উন-নূরের সভাপতিত্বে সমাবেশ পরিচালনা করেন সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন। এতে সিলেটের বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি ও বিশিষ্টজনেরা সংহতি জানান।
বক্তারা বলেন, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সিলেটবাসীর গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসেবাকেন্দ্র। এখানে কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, বিশৃঙ্খলা কিংবা পেশিশক্তির দাপট বরদাশত করা হবে না। রোগীদের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত করে তাঁদের জিম্মি করা কিংবা রোগীর স্বজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও মারধরের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের হামলার শিকার হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তাঁরা আরও বলেন, অতীতে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকদের বিভিন্ন আন্দোলনের সময় সাংবাদিকেরা তাঁদের দাবিদাওয়া ও পরিস্থিতি গণমাধ্যমে তুলে ধরেছেন। অথচ পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দুই সাংবাদিককে রক্তাক্ত হতে হয়েছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করে হাসপাতালের অনিয়ম আড়াল করা যাবে না।
সমাবেশে ক্ষোভ প্রকাশ করে সাংবাদিক নেতারা বলেন, ঘটনার তিন দিন পেরিয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকা উদ্বেগজনক। অতীতে হাসপাতালের অচলাবস্থা নিরসনে প্রশাসন দ্রুত উদ্যোগ নিলেও সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন ও দোষীদের বিচারের ক্ষেত্রে বিলম্ব গ্রহণযোগ্য নয়। অবিলম্বে তদন্ত কমিটি গঠন করে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
বক্তারা আরও বলেন, ইন্টার্ন চিকিৎসকদের একটি অংশের বিরুদ্ধে রোগীর স্বজন ও সাধারণ মানুষকে হেনস্তা এবং লাঠিসোঁটা দিয়ে মারধরের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দায়মুক্তি দেওয়ার সুযোগ নেই। হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ সাংবাদিক কিংবা সাধারণ মানুষের ওপর হামলার সাহস না পায়।
নেতৃবৃন্দ স্পষ্ট করে বলেন, এ ঘটনায় কোনো আপসকামী সমাধান তাঁরা চান না। সাংবাদিকদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে শিগগিরই পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে বৈঠক করা হবে। সেখান থেকে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে।
সমাবেশে বক্তব্য দেন সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী, সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি মঈন উদ্দিন, সিলেট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম, সাবেক সভাপতি ইকরামুল কবির ইকু, সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের জ্যেষ্ঠ সদস্য অধ্যক্ষ লিয়াকত শাহ ফরিদী, ইলেকট্রনিক মিডিয়া জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (ইমজা) সিলেটের সভাপতি মো. মাহবুবুর রহমান রিপন, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি সিলেট ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল হক চৌধুরী (ভিপি মাহবুব), সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহ দিদার আলম চৌধুরী নবেল, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাবের সভাপতি গুলজার আহমদ হেলাল, বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন সিলেট বিভাগীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হুমায়ূন কবীর লিটন এবং সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাবের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাসুদ আহমদ রনি প্রমুখ।
সমাবেশে সংহতি জানান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসক্লাব, দক্ষিণ সুরমা ও বিশ্বনাথসহ বিভিন্ন উপজেলা প্রেসক্লাব, সিলেট উইমেনস জার্নালিস্ট ক্লাব, বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সিলেট বিভাগীয় কমিটি এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
এ সময় সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আল আজাদ, দৈনিক সমকালের ব্যুরো প্রধান মুকিত রহমানী, দৈনিক উত্তর পূর্বের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ফখরুল ইসলাম, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মোহাম্মদ মহসিন, চয়ন চৌধুরী, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ তাজ উদ্দিন, ইমজার সাধারণ সম্পাদক আনিস রহমান, জেলা প্রেসক্লাবের সহসভাপতি সজল ঘোষ, দপ্তর সম্পাদক আব্দুল আহাদ, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মো. রেজাউল হক ডালিম, তথ্যপ্রযুক্তি সম্পাদক আহমেদ জামিল, বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সিলেট বিভাগীয় কমিটির সভাপতি বিলকিস আক্তার সুমি, সিলেট উইমেনস জার্নালিস্ট ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শাকিলা ববিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, গত বুধবার রাতে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের মারধরের খবর পেয়ে রাত ১০টার দিকে তথ্য ও ছবি সংগ্রহ করতে যান দৈনিক শ্যামল সিলেটের ফটোসাংবাদিক রেজা রুবেল এবং সিলেটভিউ২৪-এর নিজস্ব প্রতিবেদক নিবেন্দু তালুকদার। তাঁরা দুজনই সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সদস্য। তথ্য সংগ্রহের সময় একদল ইন্টার্ন চিকিৎসক তাঁদের ওপর হামলা চালান। এ সময় স্যালাইনের স্ট্যান্ড দিয়ে তাঁদের মাথায় আঘাত করা হয় এবং বেধড়ক মারধর করা হয়। এতে দুজনই রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত হন। সাংবাদিকেরা নিজেদের পরিচয়পত্র দেখানোর পরও হামলা থেকে রেহাই পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাংবাদিকদের ওপর এ হামলার ঘটনায় সিলেটজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সমাবেশ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সত্যতা উদ্ঘাটন, দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং হাসপাতালকে রোগীবান্ধব ও নিরাপদ চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।








