নিরাপদ ওষুধের প্রহরী ফার্মাসিস্ট, কিশোরগঞ্জে দিবসের আয়োজন
জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষাপ্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই ওষুধ বিজ্ঞানীদের অধিকার, পেশাগত দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির নতুন বার্তা নিয়ে কিশোরগঞ্জের বুকে উদযাপিত হলো বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস।
জীবন বাঁচানোর তাগিদে যেখানে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রই প্রথম সম্বল, সেখানে সেই ওষুধের কার্যকারিতা, সঠিক প্রয়োগ ও নিরাময়ের পূর্ণাঙ্গ গ্যারান্টি দেন যারা—তারা আমাদের ফার্মাসিস্ট। নীরবে-নিভৃতে জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষাপ্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই ওষুধ বিজ্ঞানীদের অধিকার, পেশাগত দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির নতুন বার্তা নিয়ে কিশোরগঞ্জের বুকে উদযাপিত হলো বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস।শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর)—শারদীয় সকালে কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণ পরিণত হয়েছিল আলো আর উদ্দীপনার এক মোহনীয় মিলনমেলায়। “সুস্থ ভবিষ্যতের জন্য ফার্মাসিস্টদের ক্ষমতায়ন”—এই দীপ্ত অঙ্গীকারকে বুকে ধারণ করে ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডি-ফ্যাব), কিশোরগঞ্জ জেলা শাখা আয়োজন করে বর্ণাঢ্য র্যালি, সুচিন্তিত আলোচনা সভা এবং প্রীতি কেক কাটার উৎসবমুখর পর্ব।শরতের নীল আকাশে রোদের সোনালি আভা আর স্নিগ্ধ হাওয়ার পরশে হাসপাতাল চত্বরে তখন জমেছে সাদা পোশাকের মানুষের ঢল। জেলার দূর-দূরান্তের বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে আগত ফার্মাসিস্টদের চোখে-মুখে ছিল পেশাগত মর্যাদার এক নতুন আশার আলো।অনুষ্ঠানের সূচনালগ্নে বের করা হয় এক চোখধাঁধানো ও উৎসবমুখর শোভাযাত্রা বা র্যালি। ব্যানার, ফেস্টুন আর স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক নানা স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে প্রাঙ্গণ। র্যালিটি মেডিকেল কলেজের মূল ফটক ও আশপাশের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। রোগীদের স্বজন, সাধারণ পথচারী ও চিকিৎসাসেবীদের অভিনন্দনে সিক্ত হয় এই পদযাত্রা। ঔষধকে কেবল একটি বড়ি বা তরল রসায়ন নয়, বরং রোগীর জন্য এক পবিত্র আমানত হিসেবে তুলে ধরার সংকল্পই যেন প্রতিফলিত হচ্ছিল অংশগ্রহণকারীদের প্রতিটি পদক্ষেপে।র্যালি শেষে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বরে আয়োজিত হয় প্রাণবন্ত ও তথ্যবহুল আলোচনা সভা। ডি-ফ্যাব কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার দূরদর্শী আহ্বায়ক সাদ্দাম হোসেনের সভাপতিত্বে এবং সংগঠক ও সদস্য সচিব আবু রায়হানের সাবলীল সঞ্চালনায় মঞ্চটি রূপ নেয় চিন্তা ও পেশাগত সুরক্ষার এক অনন্য বাকপীঠে।সভার শুরুতেই স্বাগত বক্তব্যে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ফার্মাসিস্টদের আড়ালে থাকা কঠোর পরিশ্রম ও নিবেদিতপ্রাণ ভূমিকার কথা তুলে ধরা হয়। বক্তারা বলেন—চিকিৎসক যদি হন নিরাময় সংগ্রামের প্রধান নির্দেশক, তবে ফার্মাসিস্টরা হলেন সেই সংগ্রামের সম্মুখ সারির সেনানী, যারা অস্ত্রের মতো ওষুধকে সঠিক ও নিরাপদ রাখেন।আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানকে ঋদ্ধ করেন জেলার জ্যেষ্ঠ ও গুণী সাংবাদিক মোস্তফা কামাল। তিনি তাঁর বক্তব্যে চিকিৎসাসেবা ও ফার্মাসিস্টদের মেলবন্ধনের রূপরেখা তুলে ধরে বলেন, "রোগী ও ওষুধের মাঝখানের সেতুটিই হলেন একজন দক্ষ ফার্মাসিস্ট। চিকিৎসকের দেওয়া ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী রোগীকে সঠিক মাত্রায়, সঠিক সময়ে ওষুধ বুঝিয়ে দেওয়া কেবল কোনো চাকরি নয়, এ এক চরম মানবিক দায়িত্ব। উন্নত বিশ্বে ফার্মাসিস্ট ছাড়া ওষুধ কল্পনাই করা যায় না, আমাদের দেশেও তাঁদের সেই পূর্ণ মর্যাদা ও স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করতে হবে "।বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট অ্যাসোসিয়েশন কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান জনস্বাস্থ্যে ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টদের বাস্তব সংকটের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, নিরাপদ ওষুধ ব্যবস্থাপনা ছাড়া আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা অসম্পূর্ণ। হাসপাতালে রোগীদের সঠিক তথ্য প্রদান এবং অপচিকিৎসা প্রতিরোধে ফার্মাসিস্টদের দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাঁদের নীতিগত মূল্যায়নের ওপর জোর দেন তিনি।স্বাস্থ্য পরিদর্শক অ্যাসোসিয়েশন কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম মানিক বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগ দিয়ে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্য কাঠামোর সাথে ফার্মাসিস্টদের সমন্বয় সাধনের গুরুত্ব বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, তৃণমূলের স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে শুরু করে বিশেষায়িত হাসপাতাল—সবখানেই ফার্মাসিস্টরা হলেন ওষুধের গুণগত মান রক্ষক।আলোচনা সভায় বক্তারা ফার্মাসিস্টদের পেশাগত দক্ষতা ও আগামী দিনের নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য প্রদান করেন। তারা উল্লেখ করেন যে, ভুল মাত্রার প্রয়োগ কিংবা সংরক্ষণের সামান্য ত্রুটি কীভাবে একটি জীবনদায়ী ওষুধকে ক্ষতিকর বস্তুতে পরিণত করতে পারে। একই সাথে বর্তমান বিশ্বব্যাপী অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি ও প্রতিরোধ মোকাবিলার ক্ষেত্রে ফার্মাসিস্টদের সঠিক পরামর্শ ও সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। বক্তারা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাথে সংগতি রেখে প্রযুক্তিনির্ভর ওষুধ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এবং ফার্মাসিস্টদের নিয়মিত উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও পেশাগত অধিকার নিশ্চিত করে তাঁদের ক্ষমতায়ন করার জোর দাবি জানান।আলোচনা সভা শেষে অনুষ্ঠিত হয় দিবসের সবচেয়ে আনন্দঘন মুহূর্ত। বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস উপলক্ষে একটি সুসজ্জিত ও বিশালাকার কেক কাটার মধ্য দিয়ে কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথিবৃন্দ এবং ডি-ফ্যাব নেতৃবৃন্দ একসাথে কেক কেটে পরস্পরের মুখে মিষ্টি তুলে দেন। এ যেন কেবল মিষ্টিমুখ ছিল না, ছিল পেশাগত সংহতি, পারস্পরিক ভালোবাসা ও আগামী দিনে জনসেবায় আত্মনিয়োগ করার মিষ্টি এক শপথ।কিশোরগঞ্জের স্বাস্থ্য অঙ্গনে এই আয়োজন যেন শরতের সকালে এক পশলা সতেজ বৃষ্টি হয়ে এসেছে। ফার্মাসিস্টদের এই জাগ্রত চেতনা ও ঐকান্তিক প্রয়াস আগামী দিনে জেলার প্রতিটি মানুষের কাছে নিরাপদ ওষুধ ও সুচিকিৎসার অম্লান বার্তা পৌঁছে দেবে—এমনি প্রত্যাশা কিশোরগঞ্জবাসীর।tapashmainul70@gmail.com








