ভ্রমণ

জলতরঙ্গে আবাহন, ভয়ের মেঘ সরিয়ে ডাকছে কিশোরগঞ্জের হাওর।

মাথার ওপর প্রকাণ্ড মেঘের চন্দ্রাতপ আর হাওরের বুকভাঙা নির্মল বাতাস—সব মিলে কিশোরগঞ্জের হাওর এখন প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অপরূপ স্বর্গরাজ্য।

⎙ প্রিন্ট
জলতরঙ্গে আবাহন, ভয়ের মেঘ সরিয়ে ডাকছে কিশোরগঞ্জের হাওর।
বর্ষা শেষ হয়ে আসার এই শেষলগ্নে রূপসী হাওর তার সমস্ত উজাড় করা সৌন্দর্য নিয়ে ডাকছে রূপপিপাসু পর্যটকদের।
⌖ নিকলী
বর্ষার রূপালী জলরাশি এখনো পুরোপুরি বিদায় নেয়নি। আশ্বিনের শেষ আলোয় বিস্তৃত পানিপান্থের বুক চিরে গর্জে উঠছে ইঞ্জিনচালিত সুসজ্জিত ট্রলার ও কাঠের ডিঙি। চারদিকে অশেষ জলধি, শূন্যে ভেসে থাকা যেন কোনো অলৌকিক দ্বীপ-গ্রাম, মাথার ওপর প্রকাণ্ড মেঘের চন্দ্রাতপ আর হাওরের বুকভাঙা নির্মল বাতাস—সব মিলে কিশোরগঞ্জের হাওর এখন প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অপরূপ স্বর্গরাজ্য। বর্ষা শেষ হয়ে আসার এই শেষলগ্নে রূপসী হাওর তার সমস্ত উজাড় করা সৌন্দর্য নিয়ে ডাকছে রূপপিপাসু পর্যটকদের। তবে শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মোহ নয়, সাম্প্রতিক সময়ের আতঙ্ক কাটিয়ে নতুন করে নিরাপত্তার সুদৃঢ় চাদরে ঢাকা পড়েছে কিশোরগঞ্জের উত্তর-পূর্ব দিগন্ত। ডাকাতদের উপদ্রব রুখে জেলা পুলিশের নেওয়া বৈপ্লবিক ও কল্যাণমুখী উদ্যোগে হাওর ভ্রমণে এসেছে অভূতপূর্ব গতিশীলতা।​চলতি বছরের শুরুর দিকে নিকলী, করিমগঞ্জ ও ইটনা-মিঠামইনের নৌপথে হঠাৎ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল ডাকাতির আতঙ্ক। সন্ধ্যার পর শান্ত হাওরের জলধারা যেন থমথমে অনিশ্চয়তায় ঢেকে যেত। কিন্তু সেই ভয়ের মেঘকে দীর্ঘস্থায়ী হতে দেননি কিশোরগঞ্জের পুলিশ প্রশাসন। কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান এবং স্থানীয় প্রশাসনের বিশেষ উদ্বেগের পর জেলা পুলিশ তৎপর হয়ে ওঠে।​পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের ( যিনি ‘রহমান শেলী’ নামে সাহিত্যজগতেও এক দরদী কবি ও প্রাবন্ধিক হিসেবে সুপরিচিত) প্রত্যক্ষ রূপরেখায় শুরু হয় বিশেষ সাঁড়াশি অভিযান। হাওরের দুর্গম কোণে অভিযান চালিয়ে একের পর এক ডাকাত সর্দার ও তাদের সহযোগীদের আইনের আওতায় আনা হয়। নিরাপত্তার খাতিরে প্রথমে বিকেল ৫টার পর নৌকা চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর এখন নিশ্চিন্তে রাত ৮টা পর্যন্ত ঘুরে বেড়াতে পারছেন দর্শনার্থীরা। ফলে ট্রলার ও নৌকা মালিকদের মুখে যেমন হাসি ফুটেছে, তেমনই পর্যটকরাও নির্বিঘ্নে হাওরের সূর্যাস্ত ও গোধূলির মায়াবী আলো উপভোগ করছেন।​​হাওরে প্রবেশের তিনটি প্রধান প্রবেশপথ—নিকলীর ঐতিহাসিক বেড়িবাঁধ, করিমগঞ্জের বালিখোলা ফেরিঘাট এবং চামড়া নৌবন্দর। পূর্বে এসব ঘাটে এসে পর্যটকদের চরম ভোগান্তি, অতিরিক্ত নৌকা ভাড়া এবং খাবার ও থাকার জায়গা নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়তে হতো। এই অবসান ঘটাতে জেলা পুলিশ স্থাপন করেছে দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিক ‘পর্যটক ছাউনি’। ​ছাউনিগুলোর তোরণে শোভা পাচ্ছে সচেতনতামূলক বার্তা—‘মাদক ছাড়ি, ভ্রমণ করি’। প্রতিটি ছাউনিতে প্রবেশ করতেই পর্যটকদের চোখে পড়বে গোটা হাওর অঞ্চলের বিশাল মানচিত্র, যা দেখে নিমেষেই যেকোনো নতুন দর্শনার্থী ছকে ফেলতে পারেন তাঁর ভ্রমণের রোডম্যাপ। এছাড়া ছাউনিগুলোতে যুক্ত করা হয়েছে স্বচ্ছ তথ্যবোর্ড যাতে যুক্ত করা হয়েছে ট্রলার ও নৌকা ভাড়ার সরকার নির্ধারিত বা স্বাভাবিক তালিকা, যার ফলে দালালদের খপ্পরে পড়ার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া স্থানীয় হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁর নাম, যোগাযোগ নম্বর এবং খাবারের যুক্তিসংগত মূল্যের তালিকাও সংযুক্ত আছে। ছাউনির পাশেই রয়েছে পুলিশের ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম এবং জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসার (First Aid) কিট। কোনো পর্যটক হঠাৎ অসুস্থ হলে বা দুর্ঘটনার শিকার হলে তৎক্ষণাৎ পাওয়া যাচ্ছে সেবা। এছাড়া যেকোনো বিশৃঙ্খলা রুখতে নৌ পুলিশ ও পর্যটন পুলিশের জরুরি ফোন নম্বর দৃশ্যমান স্থানে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।​​নিকলী বা বালিখোলা ঘাট থেকে ট্রলারে চড়ে পর্যটকেরা ছুটছেন ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের পানে। বর্ষাকালে এই অঞ্চল যেন নীল জলের ওপর এক রূপকথার সাম্রাজ্য। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো বিখ্যাত ‘ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অল ওয়েদার সড়ক’। ​মাইলের পর মাইল বিস্তৃত পিচঢালা সড়কটি বর্ষায় জলমগ্ন প্রান্তরের মধ্য দিয়ে ধাবিত হয়েছে এক বিস্ময়কর মহিমায়। সড়কের দুই পাশে আঁছড়ে পড়ে হাওরের ঢেউ, আর মাথার ওপর মেঘ-রোদের খেয়া। ভ্রমণপিপাসুরা নৌকার পাশাপাশি এই সড়কে গাড়ি বা মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। পথিমধ্যে তারা দর্শন করছেন মিঠামইনের ঐতিহাসিক দিল্লির আখড়া, অষ্টগ্রামের পঞ্চরত্ন কুতুব শাহী মসজিদসহ শতবর্ষী ঐতিহ্য। মাঝহাওরে ছনে ছাওয়া কোনো নির্জন গ্রামে নোঙর ফেলে স্থানীয় মানুষদের সাধারণ ও সংগ্রামমুখর জীবনযাত্রা প্রত্যক্ষ করা পর্যটকদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা এনে দিচ্ছে।​​পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান হাওর পর্যটনকে শুধু সাময়িক বিনোদন হিসেবে দেখেননি; বরং একে একটি টেকসই ও অর্থবহ রূপ দিতে নিয়েছেন দূরদর্শী পদক্ষেপ। কিশোরগঞ্জের হাওরকে নতুন প্রজন্মের কাছে উন্মুক্ত করতে জেলা শহর থেকে শুরু করে বিভিন্ন উপজেলার হোটেল ও রিসোর্টে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিদিন অন্তত একটি কক্ষ বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে বরাদ্দ রাখার বিশেষ অনুরোধ ও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসা তরুণ শিক্ষার্থীরা যেন স্বল্প খরচে হাওরের রূপ দর্শন ও গবেষণা করতে পারে, সেই পথ প্রশস্ত করাই এর মূল উদ্দেশ্য। ​পাশাপাশি, হাওরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও লোকসংস্কৃতি সম্পর্কে পর্যটকদের সঠিক ধারণা দিতে স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষিত করে ‘পর্যটন গাইড’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন স্থানীয় বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে দর্শনার্থীরাও পাচ্ছেন নির্ভরযোগ্য ও সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতার ছোঁয়া।​​সাধারণত বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে হাওরে নতুন পানি আসে এবং আশ্বিন-কার্তিক পর্যন্ত তা পূর্ণ যৌবনে থাকে। সেপ্টেম্বরের শেষলগ্নে এসে হাওরের পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে। ফলে নৌভ্রমণের জলীয় মরশুম শেষের দিকে। তবে পানি কমে গেলেই কি হাওরের সৌন্দর্য হারিয়ে যায় ? ​কবিহৃদয়ের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মনে করেন, শুকনো মৌসুমে হাওরের রূপ ভিন্ন, কিন্তু কোনো অংশে কম নয়। বর্ষায় যা অতল জলরাশি, শুকনো মৌসুমে তা-ই হয়ে ওঠে সবুজ-সোনালী দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ বা ধূ ধূ রূপালী ক্যানভাস। সেই রূপ ফুটিয়ে তুলতে শুকনো মৌসুমে হাওরের বিভিন্ন নির্জন প্রান্তরে জেলা পুলিশের সহায়তায় ‘অস্থায়ী তাবু’ (Camping) স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ফলে বছরের সব ঋতুতেই কিশোরগঞ্জের হাওর থাকবে পর্যটনমুখর।​​জেলা পুলিশের এই যুগান্তকারী পরিবর্তন ও ভাবমূর্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন সর্বস্তরের জনপ্রতিনিধিরা।​কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান বলেন, "বর্ষার শুরুতে ডাকাতির খবরে আমরা শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু পুলিশ সুপারের দ্রুত পদক্ষেপ ও অভিযানে ডাকাতরা গ্রেপ্তার হওয়ায় এখন হাওরে শান্তির বাতাস বইছে। দর্শনার্থীরা পরম আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।"​বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. শরীফুল আলম জেলা পুলিশের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, "আইনশৃঙ্খলা রক্ষা আর পর্যটনবান্ধব পরিবেশ তৈরি—দুটি কাজই চমৎকারভাবে করা হয়েছে। কোনো পর্যটক যেন কিশোরগঞ্জ থেকে খারাপ অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে না যান, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে এই প্রয়াস অব্যাহত রাখা জরুরি।"​তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী জেলা পুলিশের মহাপরিকল্পনার প্রশংসা করে জানান, "হাওরের সার্বিক নিরাপত্তা ও পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের এই রুচিশীল পরিকল্পনার কথা শুনে হাওরের প্রতি নতুন করে আগ্রহ জন্মেছে। সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত পদক্ষেপে কিশোরগঞ্জের হাওর বিশ্বের অন্যতম প্রধান পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।"​জল, হাওয়া আর সুরক্ষার এমন অভূতপূর্ব মেলবন্ধনে কিশোরগঞ্জের হাওরে চলতি বছরে রেকর্ডসংখ্যক পর্যটকের পদচারণা ঘটেছে। পুলিশের তথ্য মতে, বিগত যেকোনো বছরের তুলনায় এবার প্রায় দ্বিগুণ দর্শনার্থী হাওরের রূপ আস্বাদন করতে এসেছেন। আশ্বিনের শেষ আলোয় রোদ-ছায়ার খেলা দেখতে তাই এখনো প্রতিদিন দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন হাজারো চঞ্চল প্রাণ। কিশোরগঞ্জের হাওর এখন আর ভয়ের কোনো জনপদ নয়, বরং পরম মমতায় ডানা মেলে অপেক্ষা করছে রূপপিপাসুদের স্বাগত জানাতে।tspashmainul70@gmail.com

সম্পর্কিত সংবাদ