বন ও পরিবেশ

হাওরের জলে ভাসা স্বপ্ন, ইটনার ভাসমান গ্রাম যেন নীল জলার স্বপ্নদীঘি

অসীম জলধি ভেঙে হঠাৎ চোখে পড়ে কচুরিপানার মতো ভেসে থাকা ছোট ছোট সবুজ দ্বীপ—যা প্রকৃতপক্ষে একেকটি ‘ভাসমান বাড়ি’ বা ‘ভাসমান গ্রাম’।

⎙ প্রিন্ট
হাওরের জলে ভাসা স্বপ্ন, ইটনার ভাসমান গ্রাম যেন নীল জলার স্বপ্নদীঘি
কিশোরগঞ্জের ইটনা হাওরের ভাসমান বাড়ি।
⌖ ইটনা
নীল দিগন্তের বিশালতা যেখানে জলরাশির সঙ্গে গাঢ় আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয়, সেখানেই শুরু হয় এক অদ্ভুত ও বিস্ময়কর রূপকথা। বর্ষা মৌসুমে চারদিকের উন্মুক্ত জলরাশি যখন দিগন্তরেখাকে স্পর্শ করে, তখন কিশোরগঞ্জ জেলার হাওরবেষ্টিত ইটনা উপজেলা রূপ নেয় এক বিশাল নীল সাগরে। আর সেই অসীম জলধি ভেঙে হঠাৎ চোখে পড়ে কচুরিপানার মতো ভেসে থাকা ছোট ছোট সবুজ দ্বীপ—যা প্রকৃতপক্ষে একেকটি ‘ভাসমান বাড়ি’ বা ‘ভাসমান গ্রাম’। এটি কোনো রূপকথার কল্পকাহিনি নয়, জল ও মানুষের রূপকথা দিয়ে বোনা জীবন্ত এক বাস্তবের গাথা। জলবায়ু পরিবর্তন, ভৌগোলিক বৈচিত্র্য আর টিকে থাকার অদম্য লড়াইয়ের ওপর দাঁড়িয়ে ইটনার হাওরবাসী বছরের পর বছর ধরে সৃষ্টি করে চলেছে এক অনন্য স্থাপত্যকলা ও জীবনশৈলী।​ইটনার হাওরাঞ্চলের নদী, বিল ও প্লাবনভূমির বিস্তীর্ণ জলরাশির মাঝে জেগে থাকা এই বাড়িগুলো কোনো সাধারণ বসতভিটা নয়। বর্ষাকালে নদী ও হাওরের পানি যখন ১০ থেকে ১৫ ফুট পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়, তখন হাওরের প্রতিটি ভিটা বা চালা জলবেষ্টিত হয়ে একেকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, বাড়িগুলো বুঝি জলের ওপর দিব্যি ভেসে আছে। ​বর্ষা মৌসুমে যখন পুরো ইটনা পানির নিচে তলিয়ে যায়, তখন শুকনো মৌসুমে দেখা যাওয়া মেঠো পথ, ফসলি জমি কিংবা গবাদিপশুর বিচরণক্ষেত্র—সবই বিলীন হয়ে যায় অসীম জলরাশিতে। এই সময় ধনু, বাউলাই ও মেঘনার শাখা-উপশাখা থেকে উঠে আসা বিশাল জলরাশির বুকে নৌকাই হয়ে ওঠে একমাত্র যান, আর জলই হয়ে দাঁড়ায় জীবনের একমাত্র ঠিকানা।​​হাওরের বুকে এই ভাসমান জীবনের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মেঘনা, ধনু ও বাউলাই নদীর পলি ও জলধারার গতিপথ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইটনার নিচু এলাকাগুলোতে মানুষের বসতি গড়ে উঠতে শুরু করে। ইটনার ধনপুর, মৃগা, জয়সিদ্ধি, ও এলংজুরি ইউনিয়নের বহু গ্রাম শত শত বছর ধরে এই প্রাকৃতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। বছরের ছয় মাস হাওরের মানুষ থাকে মাটির বুকে—ধান বোনে, ফসল কাটে, সবুজ মাঠের বুক চিরে হেঁটে বেড়ায়। আর বাকি ছয় মাস জলবায়ুর সঙ্গে সন্ধি করে জীবনযাপন করে জলের ওপর। এই বৈপরীত্যই ইটনার মানুষের জীবনকে অনন্য এক মাত্রা দিয়েছে।​​ইটনার হাওরে বাড়িঘর তৈরির পেছনে রয়েছে এক বিশেষ ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যবিদ্যা। হাওরের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো ‘আফাল’—বর্ষার বিশাল ঢেউ যা বাতাসের বেগে আছড়ে পড়ে ভিটার ওপর এবং ভিটার মাটি ধসিয়ে নিয়ে যায়। প্রথমত, বসতবাড়ি তৈরির আগে শুকনো মৌসুমে হাওরের নিচু মাটি থেকে ১০ থেকে ১৫ ফুট পর্যন্ত উঁচু ভিটা তৈরি করা হয়। দ্বিতীয়ত, ভিটার পাড় যেন ভেঙে না যায়, সেজন্য চারপাশে রোপণ করা হয় করচ ও হিজল গাছ। এই গাছগুলোর শিকড় জলের নিচে মাটিকে আঁকড়ে ধরে রাখে শৃঙ্খলের মতো। তৃতীয়ত, ভিটাকে সরাসরি ঢেউয়ের আঘাত থেকে বাঁচাতে বাঁশের তৈরি বিশেষ বেড়া (যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘চাটান’ বলা হয়) ও পাথরের বাঁধ তৈরি করা হয়। সর্বশেষে, ঘর নির্মাণে সাধারণত বাঁশ, ছন, টিন এবং বিশেষ ধরনের জলসহনশীল কাঠ ব্যবহার করা হয়, যা দীর্ঘসময় আর্দ্রতায় নষ্ট হয় না।​​ইটনার জয়সিদ্ধি ইউনিয়নের প্রবীণ বাসিন্দা কালা মিয়া (৬৮) হাওরের এই জীবনযাত্রার বাস্তব রূপ তুলে ধরে বলেন, ​" দূর থাইকা মানুষের কাছে মনে হয় আমরা পানির ওপরে ভাইসা সুখে আছি। কিন্তু ঢেউয়ের শব্দে রাত কাটানো কত যে কষ্টের, তা কেবল আমরাই বুঝি! বর্ষায় যখন বাতাসের লগে আফাল (উত্তাল ঢেউ) উঠে, তখন মনে হয় এই বুঝি বাড়িটা ভাসায়া নিয়া গেল। পোলাপানদের নৌকায় তুলতেও ভয় লাগে। তবে জলেই আমাদের জন্ম, জলেই মরন। কষ্টের মধ্যেও এই শান্ত জল আর খোলা বাতাসের মায়া ছাইড়া আমরা কোথাও যাইতে পারি না। "​​ভাসমান জীবনের দৈনন্দিন চিত্র যেমন কষ্টের, তেমনই তা অদ্ভুত এক সৌন্দর্যে ঘেরা। সকালে যখন উদীয়মান সূর্যের সোনালি রোদ্দুর হাওরের জলে আছড়ে পড়ে, তখন মনে হয় পুরো গ্রাম যেন এক জলছবির ক্যানভাস। ​এখানে হাঁস-মুরগি পালন, রান্নাবান্না থেকে শুরু করে শিশুদের খেলাধুলা—সবই চলে অল্প পরিধির কাঠের মাচা কিংবা ভিটার ওপর। শিশুদের স্কুলে যাওয়া-আসার একমাত্র মাধ্যম ডিঙি নৌকা। এমনকি অনেক গ্রাম রয়েছে যেখানে নৌকার ওপর ভাসমান ছোট বাজার বা সওদা বসে, যা হাওরের জীবনযাত্রার এক চমৎকার বৈচিত্র্য। আর সন্ধ্যায় যখন হাওরের বাতাস শান্ত হয়ে আসে, তখন কোনো দূরবর্তী নৌকা থেকে ভেসে আসে মরমী গান—“আমায় ভাসাইলি রে, আমায় ডুবাইলি রে...” অথবা " আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানিরে "--হাওরের নিস্তব্ধতা আর পানির ছলাচ্ছল শব্দের সঙ্গে মিশে এই সুর সৃষ্টি করে এক স্বর্গীয় আবহ।​ ভাসমান এই বাড়িগুলোর জীবন কেবল দূর থেকে দেখতে কাব্যিক, ভেতরের জীবনটা মোটেও সহজ নয়। ঝড়ো হাওয়ায় আফালের ভয়াল থাবায় প্রতিবছর বহু পরিবার তাদের ভিটা-মাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় হঠাৎ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে সময়মতো ইটনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা সদরে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। চারদিকে অফুরন্ত জল থাকা সত্ত্বেও পান করার মতো বিশুদ্ধ পানির চরম সংকট দেখা দেয়, কারণ বর্ষায় অধিকাংশ টিউবওয়েলই জলের নিচে তলিয়ে যায়। পাশাপাশি সোলার প্যানেল রাতে কিছুটা আলো দিলেও বর্ষাকালে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ রূপ ধারণ করে।​​হাওরের ভাসমান গ্রামগুলোর স্থায়িত্ব, সুরক্ষা এবং জনগণের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে ইটনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানান, ​" ইটনার ভাসমান গ্রামগুলো আমাদের এক অনন্য ভৌগোলিক সম্পদ এবং ঐতিহ্য। তবে বর্ষাকালে আফালের কারণে ভিটা ধস ও বিশুদ্ধ পানির সংকট এখানকার প্রধান চ্যালেঞ্জ। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণগ্রামে 'আফাল প্রতিরক্ষা বাঁধ' ও প্রাক-কংক্রিট ব্লক বসানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। পাশাপাশি জরুরি স্বাস্থ্যসেবার জন্য ভাসমান স্পিডবোট অ্যা্যাম্বুলেন্স এবং উঁচু সোলার সাব-মার্সিবল ওয়াটার পাম্প স্থাপনের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, যাতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষাই নয়, হাওরবাসীর জীবনযাত্রাও নিরাপদ ও উন্নত করা যায়। "​​সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইটনার এই ভাসমান গ্রামগুলো পর্যটকদের কাছে নতুন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। অলওয়েদার রোড নির্মাণের পর কিশোরগঞ্জ সদর কিংবা নিকলী হয়ে ইটনার দিকে পর্যটকদের ঢল নামে। নৌকায় চড়ে ভাসমান বাড়িঘরের জীবনযাত্রা প্রত্যক্ষ করা, সূর্যাস্তের সময় জলে লাল আভা ছড়ানো দৃশ্য উপভোগ করা এবং তাজা হাওরের মাছের স্বাদ নেওয়া—সব মিলিয়ে ইটনা এখন এক আন্তর্জাতিক রূপসী পর্যটন এলাকা।​পরিবেশবিদগণ মনে করেন, ​ইটনার ভাসমান বাড়িগুলোর ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে প্রয়োজন টেকসই পদক্ষেপ। কেবল বাঁশের চাটান দিয়ে আফাল রোখা সম্ভব নয়। সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে প্রতিটি ভিটার চারপাশে কংক্রিট ব্লক বা জিও-ব্যাগ বাঁধ দেওয়া জরুরি।  বর্ষাকালে জরুরি স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রতিটি ইউনিয়নে ভাসমান অ্যাম্বুলেন্স বা মোবাইল মেডিকেল টিম জোরদার করা প্রয়োজন। এছাড়া বিশুদ্ধ পানীয় জলের সংকট দূর করতে উঁচু স্থানে সোলার পাম্প ও ওয়াটার ট্যাংক স্থাপন করা যেতে পারে এবং স্থানীয়দের যুক্ত করে পরিবেশবান্ধব পর্যটন গড়ে তুললে এটি তাদের আয়ের স্থায়ী উৎস হতে পারে।​ইটনার এই ভাসমান বাড়িগুলো শুধু ইট-কাঠ বা বাঁশ-ছনের তৈরি কাঠামো নয়—এগুলো মানুষের অদম্য সাহসিকতা, সহনশীলতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে বাস করার এক মহাকাব্যিক নিদর্শন। ধনু ও বাউলাইয়ের জলধারায় ভেসে থাকা এই বসতিগুলো আমাদের শেখায় কীভাবে প্রতিকূলতার মাঝেও জীবনকে সুন্দর ও অর্থবহ করে তোলা যায়। জলের ওপর ভেসে থাকা এই রূপকথা যুগ যুগ ধরে বাঁচুক তার নিজস্ব সৌন্দর্যে, আর বেঁচে থাকুক ইটনার মানুষের অদম্য প্রাণশক্তি।

সম্পর্কিত সংবাদ