ঢাকা    মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সিন্ধু পানিচুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে চাপে ভারত


নিজস্ব প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২১ মে ২০২৬

সিন্ধু পানিচুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে চাপে ভারত

সিন্ধু পানিচুক্তি বা ইন্দাস ওয়াটার্স ট্রিটি (আইডব্লিউটি) ইস্যুতে আন্তর্জাতিক আদালতের সাম্প্রতিক রায় দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগভিত্তিক পার্মানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশন (পিসিএ) পাকিস্তানের আপত্তিকে আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করায় ইসলামাবাদের কূটনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের একতরফাভাবে চুক্তি স্থগিতের ঘোষণাও আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

পিসিএ শুক্রবার তাদের আগের অবস্থান বহাল রেখে জানায়, ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত ইন্দাস ওয়াটার্স ট্রিটি এখনো কার্যকর রয়েছে এবং ভারত একতরফাভাবে এটি স্থগিত করতে পারে না। আদালতের এ সিদ্ধান্ত মূলত ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের কিশেঙ্গাঙ্গা ও রাতল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে ভারতের ব্যবহৃত ‘পন্ডেজ’ ব্যবস্থা নিয়ে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের আপত্তির প্রেক্ষাপটে এসেছে।

পাকিস্তানের অভিযোগ, এসব প্রকল্প এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে ভারত প্রয়োজন অনুযায়ী সাময়িকভাবে পানির প্রবাহ আটকে রাখতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। বিশেষ করে গেটযুক্ত স্পিলওয়ে ও ‘পন্ডেজ’ ব্যবস্থার মাধ্যমে পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর ওপর ভারতের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বাড়ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছে ইসলামাবাদ।

‘পন্ডেজ’ বলতে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের চাহিদা অনুযায়ী অল্প পরিমাণ পানি সাময়িকভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থাকে বোঝায়। পাকিস্তানের মতে, এই অবকাঠামো চুক্তির সীমার বাইরে গিয়ে ভারতের জন্য অতিরিক্ত কৌশলগত সুবিধা তৈরি করছে।

গত বছরের এপ্রিলে ভারত সরকার ঘোষণা দেয়, তারা ইন্দাস ওয়াটার্স ট্রিটি স্থগিত করছে। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পাহেলগামে প্রাণঘাতী হামলার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানানো হয়েছিল। তবে আন্তর্জাতিক আদালতের সাম্প্রতিক রায়ে স্পষ্ট করা হয়েছে, কোনো পক্ষ একতরফাভাবে এই চুক্তি বাতিল বা স্থগিত করতে পারে না।

রায়ের পর পাকিস্তান সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানায়, আদালতের সিদ্ধান্ত তাদের দীর্ঘদিনের অবস্থানকে সমর্থন করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোয় ভারতের পানি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতার ওপর চুক্তিটি বাস্তব সীমাবদ্ধতা আরোপ করে।

অন্যদিকে ভারত এ রায় সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে দাবি করে, পিসিএ ‘অবৈধভাবে গঠিত তথাকথিত কোর্ট অব আরবিট্রেশন’ এবং ভারত কখনোই এর বৈধতা স্বীকার করেনি। দিল্লির ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের কোনো রায় বা সিদ্ধান্ত ভারতের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। একই সঙ্গে ভারত জানায়, চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত এখনো বহাল রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আদালতের রায় পাকিস্তানের জন্য কূটনৈতিক সাফল্য হলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা সীমিত। বোস্টনভিত্তিক পানি আইন ও নীতিবিষয়ক গবেষক ইরুম সাত্তার মনে করেন, আইনি ব্যাখ্যার দিক থেকে রায়টি যথার্থ হলেও ভারত-পাকিস্তানের বিদ্যমান রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে এর বাস্তব প্রয়োগ জটিল হয়ে উঠবে।

তার ভাষায়, “স্বল্প ও মধ্যম মেয়াদে ভারত সম্ভবত আগের পথেই এগোবে। ফলে পাকিস্তানকে নিজেদের আইনি দাবি কার্যকর করতে নতুন কৌশল খুঁজতে হবে।”

বর্তমানে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক তলানিতে অবস্থান করছে। গত বছরের মে মাসে সীমান্ত সংঘাতের পর দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। উভয় দেশই একে অপরের এয়ারলাইন্স চলাচলে বিধিনিষেধ বজায় রেখেছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের ডানপন্থি সংগঠন আরএসএসের সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবলে এবং দেশটির এক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার পাকিস্তানের সঙ্গে সংলাপের পক্ষে মন্তব্য পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, পানিবণ্টন ইস্যু শুধু পরিবেশ বা উন্নয়ন নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভারসাম্যের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।

বিষয় : ভারত পাকিস্তান

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬


সিন্ধু পানিচুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে চাপে ভারত

প্রকাশের তারিখ : ২১ মে ২০২৬

featured Image

সিন্ধু পানিচুক্তি বা ইন্দাস ওয়াটার্স ট্রিটি (আইডব্লিউটি) ইস্যুতে আন্তর্জাতিক আদালতের সাম্প্রতিক রায় দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগভিত্তিক পার্মানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশন (পিসিএ) পাকিস্তানের আপত্তিকে আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করায় ইসলামাবাদের কূটনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের একতরফাভাবে চুক্তি স্থগিতের ঘোষণাও আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

পিসিএ শুক্রবার তাদের আগের অবস্থান বহাল রেখে জানায়, ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত ইন্দাস ওয়াটার্স ট্রিটি এখনো কার্যকর রয়েছে এবং ভারত একতরফাভাবে এটি স্থগিত করতে পারে না। আদালতের এ সিদ্ধান্ত মূলত ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের কিশেঙ্গাঙ্গা ও রাতল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে ভারতের ব্যবহৃত ‘পন্ডেজ’ ব্যবস্থা নিয়ে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের আপত্তির প্রেক্ষাপটে এসেছে।

পাকিস্তানের অভিযোগ, এসব প্রকল্প এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে ভারত প্রয়োজন অনুযায়ী সাময়িকভাবে পানির প্রবাহ আটকে রাখতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। বিশেষ করে গেটযুক্ত স্পিলওয়ে ও ‘পন্ডেজ’ ব্যবস্থার মাধ্যমে পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর ওপর ভারতের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বাড়ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছে ইসলামাবাদ।

‘পন্ডেজ’ বলতে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের চাহিদা অনুযায়ী অল্প পরিমাণ পানি সাময়িকভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থাকে বোঝায়। পাকিস্তানের মতে, এই অবকাঠামো চুক্তির সীমার বাইরে গিয়ে ভারতের জন্য অতিরিক্ত কৌশলগত সুবিধা তৈরি করছে।

গত বছরের এপ্রিলে ভারত সরকার ঘোষণা দেয়, তারা ইন্দাস ওয়াটার্স ট্রিটি স্থগিত করছে। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পাহেলগামে প্রাণঘাতী হামলার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানানো হয়েছিল। তবে আন্তর্জাতিক আদালতের সাম্প্রতিক রায়ে স্পষ্ট করা হয়েছে, কোনো পক্ষ একতরফাভাবে এই চুক্তি বাতিল বা স্থগিত করতে পারে না।

রায়ের পর পাকিস্তান সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানায়, আদালতের সিদ্ধান্ত তাদের দীর্ঘদিনের অবস্থানকে সমর্থন করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোয় ভারতের পানি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতার ওপর চুক্তিটি বাস্তব সীমাবদ্ধতা আরোপ করে।

অন্যদিকে ভারত এ রায় সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে দাবি করে, পিসিএ ‘অবৈধভাবে গঠিত তথাকথিত কোর্ট অব আরবিট্রেশন’ এবং ভারত কখনোই এর বৈধতা স্বীকার করেনি। দিল্লির ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের কোনো রায় বা সিদ্ধান্ত ভারতের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। একই সঙ্গে ভারত জানায়, চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত এখনো বহাল রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আদালতের রায় পাকিস্তানের জন্য কূটনৈতিক সাফল্য হলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা সীমিত। বোস্টনভিত্তিক পানি আইন ও নীতিবিষয়ক গবেষক ইরুম সাত্তার মনে করেন, আইনি ব্যাখ্যার দিক থেকে রায়টি যথার্থ হলেও ভারত-পাকিস্তানের বিদ্যমান রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে এর বাস্তব প্রয়োগ জটিল হয়ে উঠবে।

তার ভাষায়, “স্বল্প ও মধ্যম মেয়াদে ভারত সম্ভবত আগের পথেই এগোবে। ফলে পাকিস্তানকে নিজেদের আইনি দাবি কার্যকর করতে নতুন কৌশল খুঁজতে হবে।”

বর্তমানে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক তলানিতে অবস্থান করছে। গত বছরের মে মাসে সীমান্ত সংঘাতের পর দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। উভয় দেশই একে অপরের এয়ারলাইন্স চলাচলে বিধিনিষেধ বজায় রেখেছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের ডানপন্থি সংগঠন আরএসএসের সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবলে এবং দেশটির এক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার পাকিস্তানের সঙ্গে সংলাপের পক্ষে মন্তব্য পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, পানিবণ্টন ইস্যু শুধু পরিবেশ বা উন্নয়ন নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভারসাম্যের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ