নাটোর জেলার লালপুর উপজেলা-এর গোপালপুর এলাকায় অবস্থিত নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস লিমিটেড-এ আজ পালিত হচ্ছে ঐতিহাসিক গণহত্যা দিবস ও শহীদ সাগর দিবস। ১৯৭১ সালের ৫ মে সংঘটিত নির্মম হত্যাযজ্ঞে শহীদদের স্মরণে প্রতিবছর এই দিনটি গভীর শ্রদ্ধা ও শোকের সঙ্গে পালন করা হয়।
দিনটি উপলক্ষে মিল কর্তৃপক্ষ শহীদ সাগর চত্বরে শহীদ বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা, আলোচনা সভা এবং দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে। অনুষ্ঠানে মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ফরিদ হোসেন ভূইয়া টুটুল সভাপতিত্ব করবেন। প্রধান অতিথি হিসেবে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। এছাড়াও স্থানীয় প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সিবিএ প্রতিনিধি এবং শহীদ পরিবারের সদস্যরা অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন।
১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, মেজর উইলিয়ামের নেতৃত্বে, নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল এলাকায় নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায়। প্রত্যক্ষদর্শী ও ইতিহাস অনুযায়ী, মিলের সব গেট বন্ধ করে শতাধিক মানুষকে আলাদা করে ১ নম্বর গেট সংলগ্ন পুকুরঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করা হয় এবং অনেকের মরদেহ পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়। এই পুকুরটি পরবর্তীতে শহীদদের স্মরণে নামকরণ করা হয় “শহীদ সাগর”।
স্বাধীনতার পর থেকে এই স্থানটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পুকুরের চারপাশে যেখানে মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েছিল, সেসব স্থান লাল রঙ দিয়ে চিহ্নিত করা আছে। স্থানীয়দের বর্ণনায়, সেই সময় পুকুরের পানি দীর্ঘদিন রক্তের মতো লাল হয়ে ছিল বলে স্মৃতিচারণ পাওয়া যায়।
স্থানীয় ইতিহাসে আরও জানা যায়, গোপালপুর রেলস্টেশনের নামকরণ নিয়ে একসময় জনমত ছিল “শহীদ আনছার নগর”। তবে ১৯৭৩ সালে তা পরিবর্তন করে আজিমনগর রেলস্টেশন নামকরণ করা হয়। একই বছরের ৫ মে শহীদ লে. এম.এ. আজিমের স্ত্রী শামসুন্নাহার আজিম শহীদ সাগর স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন করেন।
পরবর্তীতে ২০০০ সালে উদ্বোধন করা হয় শহীদ স্মৃতি জাদুঘর, যেখানে শহীদদের ব্যবহৃত পোশাক ও স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষিত আছে। বাংলাদেশ ডাক বিভাগ শহীদ আজিমের ছবি সম্বলিত স্মারক ডাকটিকিটও প্রকাশ করে। চিনিকলগুলোর শহীদ স্মৃতি হিসেবে ২০০০ সাল থেকে এই দিনটি নিয়মিতভাবে পালিত হচ্ছে।
এই গণহত্যায় মোট ৪২ জন শহীদের নাম স্মৃতিস্তম্ভে উৎকীর্ণ রয়েছে। একই দিনে গোপালপুর–লালপুর সড়কের বিভিন্ন স্থানে আরও কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ঘটে, যেখানে স্থানীয় শ্রমিক, চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষ প্রাণ হারান। শিমুলতলা ও গোপালপুর বাজার এলাকায় সংঘটিত সেই ঘটনাগুলো আজও স্থানীয় মানুষের মনে গভীর বেদনার স্মৃতি হয়ে আছে।
বর্তমানে গোপালপুর বাজার কড়ইতলায় নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ এবং শহীদ সাগর এলাকা এই অঞ্চলের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে ধারণ করে আছে। প্রতিবছর এই দিনে এলাকাজুড়ে নীরবতা, শ্রদ্ধা ও শোকের পরিবেশ বিরাজ করে।

শনিবার, ০৯ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ মে ২০২৬
নাটোর জেলার লালপুর উপজেলা-এর গোপালপুর এলাকায় অবস্থিত নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস লিমিটেড-এ আজ পালিত হচ্ছে ঐতিহাসিক গণহত্যা দিবস ও শহীদ সাগর দিবস। ১৯৭১ সালের ৫ মে সংঘটিত নির্মম হত্যাযজ্ঞে শহীদদের স্মরণে প্রতিবছর এই দিনটি গভীর শ্রদ্ধা ও শোকের সঙ্গে পালন করা হয়।
দিনটি উপলক্ষে মিল কর্তৃপক্ষ শহীদ সাগর চত্বরে শহীদ বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা, আলোচনা সভা এবং দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে। অনুষ্ঠানে মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ফরিদ হোসেন ভূইয়া টুটুল সভাপতিত্ব করবেন। প্রধান অতিথি হিসেবে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। এছাড়াও স্থানীয় প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সিবিএ প্রতিনিধি এবং শহীদ পরিবারের সদস্যরা অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন।
১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, মেজর উইলিয়ামের নেতৃত্বে, নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল এলাকায় নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায়। প্রত্যক্ষদর্শী ও ইতিহাস অনুযায়ী, মিলের সব গেট বন্ধ করে শতাধিক মানুষকে আলাদা করে ১ নম্বর গেট সংলগ্ন পুকুরঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করা হয় এবং অনেকের মরদেহ পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়। এই পুকুরটি পরবর্তীতে শহীদদের স্মরণে নামকরণ করা হয় “শহীদ সাগর”।
স্বাধীনতার পর থেকে এই স্থানটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পুকুরের চারপাশে যেখানে মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েছিল, সেসব স্থান লাল রঙ দিয়ে চিহ্নিত করা আছে। স্থানীয়দের বর্ণনায়, সেই সময় পুকুরের পানি দীর্ঘদিন রক্তের মতো লাল হয়ে ছিল বলে স্মৃতিচারণ পাওয়া যায়।
স্থানীয় ইতিহাসে আরও জানা যায়, গোপালপুর রেলস্টেশনের নামকরণ নিয়ে একসময় জনমত ছিল “শহীদ আনছার নগর”। তবে ১৯৭৩ সালে তা পরিবর্তন করে আজিমনগর রেলস্টেশন নামকরণ করা হয়। একই বছরের ৫ মে শহীদ লে. এম.এ. আজিমের স্ত্রী শামসুন্নাহার আজিম শহীদ সাগর স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন করেন।
পরবর্তীতে ২০০০ সালে উদ্বোধন করা হয় শহীদ স্মৃতি জাদুঘর, যেখানে শহীদদের ব্যবহৃত পোশাক ও স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষিত আছে। বাংলাদেশ ডাক বিভাগ শহীদ আজিমের ছবি সম্বলিত স্মারক ডাকটিকিটও প্রকাশ করে। চিনিকলগুলোর শহীদ স্মৃতি হিসেবে ২০০০ সাল থেকে এই দিনটি নিয়মিতভাবে পালিত হচ্ছে।
এই গণহত্যায় মোট ৪২ জন শহীদের নাম স্মৃতিস্তম্ভে উৎকীর্ণ রয়েছে। একই দিনে গোপালপুর–লালপুর সড়কের বিভিন্ন স্থানে আরও কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ঘটে, যেখানে স্থানীয় শ্রমিক, চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষ প্রাণ হারান। শিমুলতলা ও গোপালপুর বাজার এলাকায় সংঘটিত সেই ঘটনাগুলো আজও স্থানীয় মানুষের মনে গভীর বেদনার স্মৃতি হয়ে আছে।
বর্তমানে গোপালপুর বাজার কড়ইতলায় নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ এবং শহীদ সাগর এলাকা এই অঞ্চলের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে ধারণ করে আছে। প্রতিবছর এই দিনে এলাকাজুড়ে নীরবতা, শ্রদ্ধা ও শোকের পরিবেশ বিরাজ করে।

আপনার মতামত লিখুন