ঢাকা    শনিবার, ০২ মে ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে সন্তানকে বাঁচালেন পিতা: কিশোরগঞ্জের ভৈরবে রুদ্ধশ্বাস ঘটনা



ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে সন্তানকে বাঁচালেন পিতা: কিশোরগঞ্জের ভৈরবে রুদ্ধশ্বাস ঘটনা

কিশোরগঞ্জের ভৈরব রেলস্টেশনে ঘটে গেল এক অবিশ্বাস্য ও হৃদয়স্পর্শী ঘটনা, যেখানে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেড় বছর বয়সী সন্তানকে বাঁচালেন এক সাহসী পিতা। মুহূর্তের সিদ্ধান্ত, অটুট ভালোবাসা আর ভাগ্যের সহায়তায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলেন পিতা-পুত্র- যা দেখে হতবাক হয়ে পড়েন স্টেশনে উপস্থিত শত শত মানুষ।

মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) দুপুরে স্টেশনের ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মে এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার লোহাজুড়ি ইউনিয়নের চারকাউনিয়া গ্রামের প্রবাসী জহুরুল ইসলাম সুহান তার স্ত্রী সুমাইয়া এবং একমাত্র সন্তান ইয়ামিনকে নিয়ে ঢাকায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে ভৈরব স্টেশনে অপেক্ষা করছিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী তিতাস কমিউটার ট্রেনটি নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক ঘণ্টা দেরিতে স্টেশনে পৌঁছায়।

ট্রেন আসার পর হুড়োহুড়ির মধ্যে ওঠার চেষ্টা করলে হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে মা ও শিশু প্ল্যাটফর্ম ও ট্রেনের মাঝখানের সংকীর্ণ ফাঁকা স্থানে পড়ে যান। মা দ্রুত নিজেকে প্ল্যাটফর্মে তুলতে সক্ষম হলেও শিশুটি নিচেই রয়ে যায়। ঠিক সেই মুহূর্তে ট্রেন ছাড়ার সংকেত দেওয়া হলে পরিস্থিতি হয়ে ওঠে ভয়াবহ।

এ সময় শিশুটিকে রেললাইনে পড়ে থাকতে দেখে এক মুহূর্ত দেরি না করে বাবা জহুরুল ইসলাম সুহান নিচে ঝাঁপ দেন। তিনি সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে রেললাইনের পাশে নিথর হয়ে শুয়ে পড়েন। এরই মধ্যে ট্রেনের একের পর এক বগি তাদের ওপর দিয়ে চলে যায়। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজন আতঙ্কে চিৎকার করতে থাকেন, কেউ কেউ প্রার্থনায় মগ্ন হয়ে পড়েন।

ট্রেন চলে যাওয়ার পর দেখা যায়, পিতা ও সন্তান দুজনই অলৌকিকভাবে অক্ষত অবস্থায় রেললাইনে শুয়ে আছেন। দ্রুত স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যান। পরে প্রাথমিক চিকিৎসাও দেওয়া হয়।

ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই পিতার অসীম সাহসিকতা ও সন্তানের প্রতি তার গভীর ভালোবাসার প্রশংসা করেন। কেউ কেউ এটিকে “অলৌকিক রক্ষা” বলেও অভিহিত করছেন।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, জহুরুল ইসলাম সুহান দীর্ঘ ১১ বছর ধরে ওমানে কর্মরত। ছুটিতে দেশে এসে প্রায় তিন মাস পরিবারের সঙ্গে কাটানোর পর আবার কর্মস্থলে ফেরার উদ্দেশ্যে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। কিন্তু পথেই ঘটে যায় এই শিহরণ জাগানো ঘটনা।

শিশুটির দাদা দুলাল মিয়া বলেন, “আল্লাহর অশেষ রহমতে আমার ছেলে ও নাতি বেঁচে গেছে। এমন ঘটনা শুনে আমরা সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম।” দাদি রসোনা খাতুনও জানান, ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বাড়িতে মানুষের ভিড় লেগে যায় এবং তিনি এখনও ঘটনার ধাক্কা সামলে উঠতে পারেননি।

স্থানীয়রা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে বেঁচে ফেরা সত্যিই অবিশ্বাস্য। তারা একে মহান সৃষ্টিকর্তার বিশেষ কৃপা বলেই মনে করছেন।

এ বিষয়ে ভৈরব রেলওয়ে পুলিশের এসআই আফজাল হোসেন বলেন, অসতর্কতা ও তাড়াহুড়োর কারণেই এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। তবে পিতার দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সাহসিকতার কারণেই বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তিনি যাত্রীদের উদ্দেশ্যে সতর্ক হয়ে, ধীরস্থিরভাবে ট্রেনে ওঠানামা করার আহ্বান জানান।

ঘটনার পর জহুরুল ইসলাম সুহান নিজেও জানান, “ছেলেকে নিচে পড়ে থাকতে দেখে আর কিছু ভাবিনি। শুধু তাকে বাঁচানোর জন্য ঝাঁপ দিয়েছি। আল্লাহর রহমতে আমরা দুজনই ভালো আছি। সবার কাছে দোয়া চাই।”

এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল- একজন পিতার ভালোবাসা কতটা নিঃস্বার্থ, কতটা সাহসী হতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ০২ মে ২০২৬


ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে সন্তানকে বাঁচালেন পিতা: কিশোরগঞ্জের ভৈরবে রুদ্ধশ্বাস ঘটনা

প্রকাশের তারিখ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

কিশোরগঞ্জের ভৈরব রেলস্টেশনে ঘটে গেল এক অবিশ্বাস্য ও হৃদয়স্পর্শী ঘটনা, যেখানে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেড় বছর বয়সী সন্তানকে বাঁচালেন এক সাহসী পিতা। মুহূর্তের সিদ্ধান্ত, অটুট ভালোবাসা আর ভাগ্যের সহায়তায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলেন পিতা-পুত্র- যা দেখে হতবাক হয়ে পড়েন স্টেশনে উপস্থিত শত শত মানুষ।

মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) দুপুরে স্টেশনের ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মে এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার লোহাজুড়ি ইউনিয়নের চারকাউনিয়া গ্রামের প্রবাসী জহুরুল ইসলাম সুহান তার স্ত্রী সুমাইয়া এবং একমাত্র সন্তান ইয়ামিনকে নিয়ে ঢাকায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে ভৈরব স্টেশনে অপেক্ষা করছিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী তিতাস কমিউটার ট্রেনটি নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক ঘণ্টা দেরিতে স্টেশনে পৌঁছায়।

ট্রেন আসার পর হুড়োহুড়ির মধ্যে ওঠার চেষ্টা করলে হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে মা ও শিশু প্ল্যাটফর্ম ও ট্রেনের মাঝখানের সংকীর্ণ ফাঁকা স্থানে পড়ে যান। মা দ্রুত নিজেকে প্ল্যাটফর্মে তুলতে সক্ষম হলেও শিশুটি নিচেই রয়ে যায়। ঠিক সেই মুহূর্তে ট্রেন ছাড়ার সংকেত দেওয়া হলে পরিস্থিতি হয়ে ওঠে ভয়াবহ।

এ সময় শিশুটিকে রেললাইনে পড়ে থাকতে দেখে এক মুহূর্ত দেরি না করে বাবা জহুরুল ইসলাম সুহান নিচে ঝাঁপ দেন। তিনি সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে রেললাইনের পাশে নিথর হয়ে শুয়ে পড়েন। এরই মধ্যে ট্রেনের একের পর এক বগি তাদের ওপর দিয়ে চলে যায়। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজন আতঙ্কে চিৎকার করতে থাকেন, কেউ কেউ প্রার্থনায় মগ্ন হয়ে পড়েন।

ট্রেন চলে যাওয়ার পর দেখা যায়, পিতা ও সন্তান দুজনই অলৌকিকভাবে অক্ষত অবস্থায় রেললাইনে শুয়ে আছেন। দ্রুত স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যান। পরে প্রাথমিক চিকিৎসাও দেওয়া হয়।

ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই পিতার অসীম সাহসিকতা ও সন্তানের প্রতি তার গভীর ভালোবাসার প্রশংসা করেন। কেউ কেউ এটিকে “অলৌকিক রক্ষা” বলেও অভিহিত করছেন।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, জহুরুল ইসলাম সুহান দীর্ঘ ১১ বছর ধরে ওমানে কর্মরত। ছুটিতে দেশে এসে প্রায় তিন মাস পরিবারের সঙ্গে কাটানোর পর আবার কর্মস্থলে ফেরার উদ্দেশ্যে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। কিন্তু পথেই ঘটে যায় এই শিহরণ জাগানো ঘটনা।

শিশুটির দাদা দুলাল মিয়া বলেন, “আল্লাহর অশেষ রহমতে আমার ছেলে ও নাতি বেঁচে গেছে। এমন ঘটনা শুনে আমরা সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম।” দাদি রসোনা খাতুনও জানান, ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বাড়িতে মানুষের ভিড় লেগে যায় এবং তিনি এখনও ঘটনার ধাক্কা সামলে উঠতে পারেননি।

স্থানীয়রা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে বেঁচে ফেরা সত্যিই অবিশ্বাস্য। তারা একে মহান সৃষ্টিকর্তার বিশেষ কৃপা বলেই মনে করছেন।

এ বিষয়ে ভৈরব রেলওয়ে পুলিশের এসআই আফজাল হোসেন বলেন, অসতর্কতা ও তাড়াহুড়োর কারণেই এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। তবে পিতার দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সাহসিকতার কারণেই বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তিনি যাত্রীদের উদ্দেশ্যে সতর্ক হয়ে, ধীরস্থিরভাবে ট্রেনে ওঠানামা করার আহ্বান জানান।

ঘটনার পর জহুরুল ইসলাম সুহান নিজেও জানান, “ছেলেকে নিচে পড়ে থাকতে দেখে আর কিছু ভাবিনি। শুধু তাকে বাঁচানোর জন্য ঝাঁপ দিয়েছি। আল্লাহর রহমতে আমরা দুজনই ভালো আছি। সবার কাছে দোয়া চাই।”

এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল- একজন পিতার ভালোবাসা কতটা নিঃস্বার্থ, কতটা সাহসী হতে পারে।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০২৪১০৯১৭৩০
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: 01711-070054

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ