দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, দক্ষতাভিত্তিক ও যুগোপযোগী করতে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে পাঠ্যবই, পাঠদান পদ্ধতি এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হবে। নতুন এই ব্যবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, সৃজনশীলতা এবং শিক্ষার্থীদের শারীরিক-মানসিক বিকাশে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্রে জানা গেছে, প্রথম ধাপে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য বর্তমান বইয়ের পাশাপাশি দুটি নতুন বই যুক্ত করা হবে। বই দুটি হলো ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ এবং ‘সোশ্যাল কালচার’। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব বইয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আনন্দমুখর পরিবেশে শেখানো, সামাজিক মূল্যবোধ, সংস্কৃতি চর্চা এবং বাস্তবজীবনমুখী জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে।
এছাড়া ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বইয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে। নতুন সংস্করণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিক্স, ডিজিটাল নিরাপত্তা, কোডিং এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি বিষয়ে অধ্যায় সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে শিক্ষার্থীরা বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।
নতুন শিক্ষাক্রমে খেলাধুলাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চতুর্থ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শারীরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এই বিষয়ের আওতায় শিক্ষার্থীদের ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, কারাতে, দাবা, সাঁতার ও অ্যাথলেটিক্স—এই সাতটি খেলার যেকোনো একটিতে নিয়মিত অংশ নিতে হবে।
তবে শারীরিক শিক্ষা বিষয়ে আগের মতো লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হবে না। শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ, দক্ষতা, নিয়মিত অনুশীলন এবং পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে বছরজুড়ে ধারাবাহিক মূল্যায়ন করা হবে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে পরীক্ষাভীতি কমবে এবং শিক্ষার্থীরা মাঠমুখী ও স্বাস্থ্যসচেতন হয়ে উঠবে।
সরকার তিন ধাপে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে। চলতি বছরে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। ২০২৭ সালে পাঠ্যবই সংশোধন, নতুন বই প্রণয়ন এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হবে। ২০২৮ সালে দেশব্যাপী নতুন শিক্ষাক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।
এই সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রায় ২০০ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে শিক্ষাবিদ, অভিজ্ঞ শিক্ষক, বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি অভিভাবক প্রতিনিধিদেরও অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বহুমাত্রিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হবে।
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় মুখস্থনির্ভরতা, পরীক্ষাকেন্দ্রিক চাপ এবং ব্যবহারিক দক্ষতার ঘাটতি ছিল। নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীরা শুধু বইভিত্তিক জ্ঞানে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং প্রযুক্তি, সমস্যা সমাধান, নেতৃত্ব, দলগত কাজ ও শারীরিক সক্ষমতায়ও এগিয়ে যাবে।
তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, নতুন শিক্ষাক্রম সফল করতে হলে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত অবকাঠামো, খেলার মাঠ, প্রযুক্তি সুবিধা এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় পরিকল্পনার সুফল পুরোপুরি পাওয়া কঠিন হতে পারে।
সব মিলিয়ে, শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের এই উদ্যোগকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিষয় : শিক্ষাক্রম

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ এপ্রিল ২০২৬
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, দক্ষতাভিত্তিক ও যুগোপযোগী করতে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে পাঠ্যবই, পাঠদান পদ্ধতি এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হবে। নতুন এই ব্যবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, সৃজনশীলতা এবং শিক্ষার্থীদের শারীরিক-মানসিক বিকাশে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্রে জানা গেছে, প্রথম ধাপে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য বর্তমান বইয়ের পাশাপাশি দুটি নতুন বই যুক্ত করা হবে। বই দুটি হলো ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ এবং ‘সোশ্যাল কালচার’। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব বইয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আনন্দমুখর পরিবেশে শেখানো, সামাজিক মূল্যবোধ, সংস্কৃতি চর্চা এবং বাস্তবজীবনমুখী জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে।
এছাড়া ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বইয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে। নতুন সংস্করণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিক্স, ডিজিটাল নিরাপত্তা, কোডিং এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি বিষয়ে অধ্যায় সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে শিক্ষার্থীরা বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।
নতুন শিক্ষাক্রমে খেলাধুলাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চতুর্থ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শারীরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এই বিষয়ের আওতায় শিক্ষার্থীদের ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, কারাতে, দাবা, সাঁতার ও অ্যাথলেটিক্স—এই সাতটি খেলার যেকোনো একটিতে নিয়মিত অংশ নিতে হবে।
তবে শারীরিক শিক্ষা বিষয়ে আগের মতো লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হবে না। শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ, দক্ষতা, নিয়মিত অনুশীলন এবং পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে বছরজুড়ে ধারাবাহিক মূল্যায়ন করা হবে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে পরীক্ষাভীতি কমবে এবং শিক্ষার্থীরা মাঠমুখী ও স্বাস্থ্যসচেতন হয়ে উঠবে।
সরকার তিন ধাপে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে। চলতি বছরে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। ২০২৭ সালে পাঠ্যবই সংশোধন, নতুন বই প্রণয়ন এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হবে। ২০২৮ সালে দেশব্যাপী নতুন শিক্ষাক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।
এই সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রায় ২০০ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে শিক্ষাবিদ, অভিজ্ঞ শিক্ষক, বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি অভিভাবক প্রতিনিধিদেরও অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বহুমাত্রিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হবে।
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় মুখস্থনির্ভরতা, পরীক্ষাকেন্দ্রিক চাপ এবং ব্যবহারিক দক্ষতার ঘাটতি ছিল। নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীরা শুধু বইভিত্তিক জ্ঞানে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং প্রযুক্তি, সমস্যা সমাধান, নেতৃত্ব, দলগত কাজ ও শারীরিক সক্ষমতায়ও এগিয়ে যাবে।
তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, নতুন শিক্ষাক্রম সফল করতে হলে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত অবকাঠামো, খেলার মাঠ, প্রযুক্তি সুবিধা এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় পরিকল্পনার সুফল পুরোপুরি পাওয়া কঠিন হতে পারে।
সব মিলিয়ে, শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের এই উদ্যোগকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন