ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটগ্রহণ শেষ হতেই আত্মবিশ্বাসী অবস্থান নিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার দাবি, প্রথম ধাপের ভোটের প্রবণতাই স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তৃণমূল কংগ্রেস জয়ের পথে এগিয়ে রয়েছে। একই সঙ্গে রাজ্যের নির্বাচনকে জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করে তিনি বলেছেন, তার লক্ষ্য শুধু কলকাতার ক্ষমতা ধরে রাখা নয়, দিল্লিতে বিজেপি সরকারের অবসান ঘটানো।
কলকাতার বউবাজার এলাকায় এক নির্বাচনী সমাবেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, মানুষের মনোভাব দেখে তার মনে হচ্ছে, এ পর্যন্ত হওয়া ভোটে তৃণমূল ইতোমধ্যেই জয়ের জায়গায় পৌঁছে গেছে। তিনি বলেন, তিনি কোনো চেয়ার চান না, কোনো পদেও আগ্রহী নন; তার একমাত্র লক্ষ্য দিল্লিতে বিজেপি সরকারকে সরানো।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মমতার এ বক্তব্য শুধু রাজ্য নির্বাচনের প্রচারকৌশল নয়, বরং জাতীয় বিরোধী রাজনীতিতে নেতৃত্বের বার্তাও বহন করে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিজেপিবিরোধী শক্তিগুলোকে এক ছাতার নিচে আনার সম্ভাব্য কেন্দ্রীয় মুখ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপনের কৌশল হিসেবেও এ বক্তব্য দেখা হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন বরাবরই জাতীয় রাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এটি শুধু একটি রাজ্যের ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং বিজেপির পূর্ব ভারতে বিস্তার কৌশল এবং তৃণমূলের আঞ্চলিক আধিপত্য ধরে রাখার পরীক্ষাও বটে। ফলে মমতার বক্তব্যে রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে জাতীয় বার্তাই বেশি স্পষ্ট হয়েছে।
এদিকে নির্বাচনী প্রচারে এবার নতুন মাত্রা যোগ করেছে ‘ঝালমুড়ি’ ও ‘মাছ’ প্রসঙ্গ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক নির্বাচনী ভাষণে ঝালমুড়ি খাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তৃণমূল কংগ্রেসের ‘ঝাল’ লাগার কথা বলেন। এর পাল্টা জবাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ঝালমুড়ির ঝাল খেতে বাঙালিরা অভ্যস্ত, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী কোনোদিন মাছ খেয়েছেন কি না, সেটাই প্রশ্ন।
তার এ মন্তব্য দ্রুত রাজনৈতিক প্রচারণার আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে সাংস্কৃতিক প্রতীক ব্যবহার নতুন কিছু নয়। মাছ, ঝালমুড়ি, বাংলা ভাষা, আঞ্চলিক পরিচয়—এসব বিষয়কে ব্যবহার করে ভোটারদের আবেগের সঙ্গে সংযোগ তৈরির চেষ্টা করছে রাজনৈতিক দলগুলো।
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত প্রথম ধাপে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ১৫২টি আসনে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। ভারতের নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, রাত ৮টা পর্যন্ত ভোটার উপস্থিতির হার ছিল ৯১ দশমিক ৮৩ শতাংশ, যা স্বাধীনতার পর সর্বোচ্চ বলে দাবি করা হয়েছে। চূড়ান্ত ফলাফল পরে প্রকাশ করা হবে।
জেলাভিত্তিক হিসাবে দক্ষিণ দিনাজপুরে সর্বোচ্চ ৯৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ ভোট পড়েছে। এরপর কুচবিহারে ৯৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং বীরভূমে ৯৩ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পড়েছে। প্রথম ধাপে ভোট হওয়া ১৬ জেলার প্রায় সবকটিতেই ভোটার উপস্থিতি ছিল ৮২ শতাংশের বেশি।
তবে ভোটের দিন সহিংসতার অভিযোগও উঠেছে। আসানসোল দক্ষিণ আসনে বিজেপি প্রার্থী অগ্নিমিত্রা পলের গাড়িতে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। কুমারগঞ্জে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু সরকার অভিযোগ করেছেন, তৃণমূল কর্মীরা তার ওপর হামলা চালিয়েছে এবং গাড়ি ভাঙচুর করেছে। এসব অভিযোগ ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
দ্বিতীয় ধাপে আগামী ২৯ এপ্রিল কলকাতা ও আশপাশের ১৪২টি আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ভোট গণনা হবে আগামী ৪ মে। প্রথম ধাপের রেকর্ড ভোটার উপস্থিতি ও রাজনৈতিক উত্তাপের পর দ্বিতীয় ধাপ ঘিরে এখনই বাড়ছে আগ্রহ।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আত্মবিশ্বাসী অবস্থান, বিজেপিবিরোধী জাতীয় বার্তা এবং সাংস্কৃতিক প্রতীকে ভর করা প্রচারণা—সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন এখন শুধু রাজ্য রাজনীতির লড়াই নয়, ভারতের বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণেরও কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
#আর
বিষয় : মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটগ্রহণ শেষ হতেই আত্মবিশ্বাসী অবস্থান নিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার দাবি, প্রথম ধাপের ভোটের প্রবণতাই স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তৃণমূল কংগ্রেস জয়ের পথে এগিয়ে রয়েছে। একই সঙ্গে রাজ্যের নির্বাচনকে জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করে তিনি বলেছেন, তার লক্ষ্য শুধু কলকাতার ক্ষমতা ধরে রাখা নয়, দিল্লিতে বিজেপি সরকারের অবসান ঘটানো।
কলকাতার বউবাজার এলাকায় এক নির্বাচনী সমাবেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, মানুষের মনোভাব দেখে তার মনে হচ্ছে, এ পর্যন্ত হওয়া ভোটে তৃণমূল ইতোমধ্যেই জয়ের জায়গায় পৌঁছে গেছে। তিনি বলেন, তিনি কোনো চেয়ার চান না, কোনো পদেও আগ্রহী নন; তার একমাত্র লক্ষ্য দিল্লিতে বিজেপি সরকারকে সরানো।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মমতার এ বক্তব্য শুধু রাজ্য নির্বাচনের প্রচারকৌশল নয়, বরং জাতীয় বিরোধী রাজনীতিতে নেতৃত্বের বার্তাও বহন করে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিজেপিবিরোধী শক্তিগুলোকে এক ছাতার নিচে আনার সম্ভাব্য কেন্দ্রীয় মুখ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপনের কৌশল হিসেবেও এ বক্তব্য দেখা হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন বরাবরই জাতীয় রাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এটি শুধু একটি রাজ্যের ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং বিজেপির পূর্ব ভারতে বিস্তার কৌশল এবং তৃণমূলের আঞ্চলিক আধিপত্য ধরে রাখার পরীক্ষাও বটে। ফলে মমতার বক্তব্যে রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে জাতীয় বার্তাই বেশি স্পষ্ট হয়েছে।
এদিকে নির্বাচনী প্রচারে এবার নতুন মাত্রা যোগ করেছে ‘ঝালমুড়ি’ ও ‘মাছ’ প্রসঙ্গ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক নির্বাচনী ভাষণে ঝালমুড়ি খাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তৃণমূল কংগ্রেসের ‘ঝাল’ লাগার কথা বলেন। এর পাল্টা জবাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ঝালমুড়ির ঝাল খেতে বাঙালিরা অভ্যস্ত, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী কোনোদিন মাছ খেয়েছেন কি না, সেটাই প্রশ্ন।
তার এ মন্তব্য দ্রুত রাজনৈতিক প্রচারণার আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে সাংস্কৃতিক প্রতীক ব্যবহার নতুন কিছু নয়। মাছ, ঝালমুড়ি, বাংলা ভাষা, আঞ্চলিক পরিচয়—এসব বিষয়কে ব্যবহার করে ভোটারদের আবেগের সঙ্গে সংযোগ তৈরির চেষ্টা করছে রাজনৈতিক দলগুলো।
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত প্রথম ধাপে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ১৫২টি আসনে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। ভারতের নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, রাত ৮টা পর্যন্ত ভোটার উপস্থিতির হার ছিল ৯১ দশমিক ৮৩ শতাংশ, যা স্বাধীনতার পর সর্বোচ্চ বলে দাবি করা হয়েছে। চূড়ান্ত ফলাফল পরে প্রকাশ করা হবে।
জেলাভিত্তিক হিসাবে দক্ষিণ দিনাজপুরে সর্বোচ্চ ৯৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ ভোট পড়েছে। এরপর কুচবিহারে ৯৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং বীরভূমে ৯৩ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পড়েছে। প্রথম ধাপে ভোট হওয়া ১৬ জেলার প্রায় সবকটিতেই ভোটার উপস্থিতি ছিল ৮২ শতাংশের বেশি।
তবে ভোটের দিন সহিংসতার অভিযোগও উঠেছে। আসানসোল দক্ষিণ আসনে বিজেপি প্রার্থী অগ্নিমিত্রা পলের গাড়িতে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। কুমারগঞ্জে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু সরকার অভিযোগ করেছেন, তৃণমূল কর্মীরা তার ওপর হামলা চালিয়েছে এবং গাড়ি ভাঙচুর করেছে। এসব অভিযোগ ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
দ্বিতীয় ধাপে আগামী ২৯ এপ্রিল কলকাতা ও আশপাশের ১৪২টি আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ভোট গণনা হবে আগামী ৪ মে। প্রথম ধাপের রেকর্ড ভোটার উপস্থিতি ও রাজনৈতিক উত্তাপের পর দ্বিতীয় ধাপ ঘিরে এখনই বাড়ছে আগ্রহ।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আত্মবিশ্বাসী অবস্থান, বিজেপিবিরোধী জাতীয় বার্তা এবং সাংস্কৃতিক প্রতীকে ভর করা প্রচারণা—সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন এখন শুধু রাজ্য রাজনীতির লড়াই নয়, ভারতের বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণেরও কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
#আর

আপনার মতামত লিখুন