১৯৫২ সালে মাতৃভাষার জন্য এই ভূখণ্ডে রক্ত ঝরেছিল। ভাষার মর্যাদা রক্ষার ঐতিহাসিক সেই অধ্যায় আমাদের জাতির জন্য আজও গর্বের। কিন্তু সেই গৌরবময় অধ্যায়ের দেশে আজ অন্য এক মাতৃভাষা হারানোর সংকট দেখা দিয়েছে। বরগুনার তালতলী উপজেলার রাখাইন সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে তাদের নিজস্ব ভাষা টিকিয়ে রাখতে সংগ্রাম করছে, তবে বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
উপজেলায় বর্তমানে প্রায় ৫০০টি রাখাইন পরিবার ও প্রায় ৩ হাজার রাখাইন বসবাস করছেন। তবে মাতৃভাষার চর্চা দিন দিন কমে এসেছে। প্রবীণরা এখনও রাখাইন ভাষায় কথা বললেও শিশু ও কিশোররা বড় অংশ বাংলা ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। ঘরে, স্কুলে, বাজার প্রায় সবক্ষেত্রেই বাংলার প্রাধান্য। ফলে রাখাইন ভাষা এখন শুধু মৌখিক ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। লিখিত চর্চা প্রায় বিলুপ্ত।
রাখাইন উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মি. মংচিন থান জানান, আমরা রাখাইন ভাষায় কথা বলি, কিন্তু বর্তমান শিশুরা ঠিকভাবে বলতে পারে না। তারা ভাষা বুঝে, কিন্তু উত্তর দেয় বাংলায়। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। ভাষা শুধুমাত্র কথার মাধ্যমে সংরক্ষিত থাকলে তা আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছাবে না।
তিনি আরও বলেন, রাখাইন ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা বা পাঠ্যবইয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। শিশুরা শুরু থেকেই শিক্ষাগ্রহণ করছে বাংলায়। ফলে লিখিত চর্চা প্রায় শূন্য। এক সময় যে ভাষায় গল্প, গান ও ইতিহাস বয়ে যেত, তা আজ মুখের কথায় সীমাবদ্ধ।
প্রবীণ রাখাইন নেতা মি. মংচিন থান বলেন, আমাদের মাতৃভাষা হারানোর পথে। আমরা প্রবীণরা এখনও ভাষায় কথা বলি, কিন্তু নতুন প্রজন্ম বাংলা ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে। শিশু ও কিশোররা বুঝতে পারলেও সঠিকভাবে উত্তর দিতে পারে না। রাখাইন ভাষায় কোনো প্রাথমিক শিক্ষা বা পাঠ্যবই নেই। তাই লিখিত চর্চা প্রায় শূন্য। আমরা চাই সরকারি ও সামাজিক পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক, যাতে আমাদের মাতৃভাষা টিকে থাকে।
ভাষা হারানো মানে শুধু শব্দের মৃত্যু নয়, এটি একটি জাতির পরিচয়ও হারানো। তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, একটি ভাষা হারানো মানে শুধু কিছু শব্দের মৃত্যু নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়ও হারায়। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে রাখাইন ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রাখাইন ভাষা শিখবে না। এটি শুধু ভাষা হারানো নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ক্ষয়। ভাষার সংরক্ষণে স্থানীয় স্কুলে পাঠ্যক্রমে রাখাইন ভাষা অন্তর্ভুক্তি, গল্প, গান ও লোককথার প্রকাশ এবং কমিউনিটি হোল্ডে শিশুদের ভাষার সঙ্গে পরিচয় করানো জরুরি।
রাখাইন সম্প্রদায়ের প্রবীণরা বলছেন, যখন মাতৃভাষা হারাবে, তখন শুধু শব্দই নয়, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও পরিচয়ও হারাবে। আমরা চাই আগামী প্রজন্ম আমাদের ভাষা জানুক, শিখুক এবং ব্যবহার করুক।
এ পরিস্থিতিতে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে স্থানীয় স্কুল ও কমিউনিটি সেন্টারে ভাষা সংরক্ষণের জন্য কর্মশালা ও পাঠক্রম চালু করার প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। তবে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সংরক্ষণে স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়াই মূল চ্যালেঞ্জ। সরকারি, সামাজিক ও সম্প্রদায়িক উদ্যোগ একত্রিত হলে আমাদের মাতৃভাষা টিকে থাকবে।

বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
১৯৫২ সালে মাতৃভাষার জন্য এই ভূখণ্ডে রক্ত ঝরেছিল। ভাষার মর্যাদা রক্ষার ঐতিহাসিক সেই অধ্যায় আমাদের জাতির জন্য আজও গর্বের। কিন্তু সেই গৌরবময় অধ্যায়ের দেশে আজ অন্য এক মাতৃভাষা হারানোর সংকট দেখা দিয়েছে। বরগুনার তালতলী উপজেলার রাখাইন সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে তাদের নিজস্ব ভাষা টিকিয়ে রাখতে সংগ্রাম করছে, তবে বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
উপজেলায় বর্তমানে প্রায় ৫০০টি রাখাইন পরিবার ও প্রায় ৩ হাজার রাখাইন বসবাস করছেন। তবে মাতৃভাষার চর্চা দিন দিন কমে এসেছে। প্রবীণরা এখনও রাখাইন ভাষায় কথা বললেও শিশু ও কিশোররা বড় অংশ বাংলা ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। ঘরে, স্কুলে, বাজার প্রায় সবক্ষেত্রেই বাংলার প্রাধান্য। ফলে রাখাইন ভাষা এখন শুধু মৌখিক ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। লিখিত চর্চা প্রায় বিলুপ্ত।
রাখাইন উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মি. মংচিন থান জানান, আমরা রাখাইন ভাষায় কথা বলি, কিন্তু বর্তমান শিশুরা ঠিকভাবে বলতে পারে না। তারা ভাষা বুঝে, কিন্তু উত্তর দেয় বাংলায়। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। ভাষা শুধুমাত্র কথার মাধ্যমে সংরক্ষিত থাকলে তা আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছাবে না।
তিনি আরও বলেন, রাখাইন ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা বা পাঠ্যবইয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। শিশুরা শুরু থেকেই শিক্ষাগ্রহণ করছে বাংলায়। ফলে লিখিত চর্চা প্রায় শূন্য। এক সময় যে ভাষায় গল্প, গান ও ইতিহাস বয়ে যেত, তা আজ মুখের কথায় সীমাবদ্ধ।
প্রবীণ রাখাইন নেতা মি. মংচিন থান বলেন, আমাদের মাতৃভাষা হারানোর পথে। আমরা প্রবীণরা এখনও ভাষায় কথা বলি, কিন্তু নতুন প্রজন্ম বাংলা ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে। শিশু ও কিশোররা বুঝতে পারলেও সঠিকভাবে উত্তর দিতে পারে না। রাখাইন ভাষায় কোনো প্রাথমিক শিক্ষা বা পাঠ্যবই নেই। তাই লিখিত চর্চা প্রায় শূন্য। আমরা চাই সরকারি ও সামাজিক পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক, যাতে আমাদের মাতৃভাষা টিকে থাকে।
ভাষা হারানো মানে শুধু শব্দের মৃত্যু নয়, এটি একটি জাতির পরিচয়ও হারানো। তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, একটি ভাষা হারানো মানে শুধু কিছু শব্দের মৃত্যু নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়ও হারায়। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে রাখাইন ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রাখাইন ভাষা শিখবে না। এটি শুধু ভাষা হারানো নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ক্ষয়। ভাষার সংরক্ষণে স্থানীয় স্কুলে পাঠ্যক্রমে রাখাইন ভাষা অন্তর্ভুক্তি, গল্প, গান ও লোককথার প্রকাশ এবং কমিউনিটি হোল্ডে শিশুদের ভাষার সঙ্গে পরিচয় করানো জরুরি।
রাখাইন সম্প্রদায়ের প্রবীণরা বলছেন, যখন মাতৃভাষা হারাবে, তখন শুধু শব্দই নয়, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও পরিচয়ও হারাবে। আমরা চাই আগামী প্রজন্ম আমাদের ভাষা জানুক, শিখুক এবং ব্যবহার করুক।
এ পরিস্থিতিতে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে স্থানীয় স্কুল ও কমিউনিটি সেন্টারে ভাষা সংরক্ষণের জন্য কর্মশালা ও পাঠক্রম চালু করার প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। তবে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সংরক্ষণে স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়াই মূল চ্যালেঞ্জ। সরকারি, সামাজিক ও সম্প্রদায়িক উদ্যোগ একত্রিত হলে আমাদের মাতৃভাষা টিকে থাকবে।

আপনার মতামত লিখুন