ঢাকা    বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

ধানের শীষের ছায়ায় ফাটল, হাতপাখার চ্যালেঞ্জ ও নীরব আওয়ামী ভোট



ধানের শীষের ছায়ায় ফাটল, হাতপাখার চ্যালেঞ্জ ও নীরব আওয়ামী ভোট
প্রার্থীদের কাছ থেকে সংগৃহীত


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বরগুনা-১ আসনে (বরগুনা সদর, আমতলী ও তালতলী) রাজনৈতিক উত্তাপ তীব্র হচ্ছে। শহর থেকে গ্রাম, হাটবাজার থেকে উপকূলীয় চরাঞ্চল—সবখানেই প্রার্থী ও সমর্থকদের সরব উপস্থিতি চোখে পড়ছে। তবে দৃশ্যমান এই উত্তাপের আড়ালে চলছে এক জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ, যেখানে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভাজন, ইসলামী আন্দোলনের সংগঠিত শক্তি এবং নীরব আওয়ামী ভোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


প্রার্থীদের অবস্থান বরগুনা-১ আসনে এবার চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মো. নজরুল ইসলাম মোল্লা (বিএনপি)- ধানের শীষ, মো. জাহাঙ্গীর হোসাইন (খেলাফত মজলিস, ১১ দলের জোট)- দেয়াল ঘড়ি, মাহমুদুল হোসাইন অলি উল্লাহ (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ)- হাতপাখা, মো. জামাল হোসাইন (জাতীয় পার্টি–জেপি)- সাইকেল।


বিএনপির শক্তি ও ভেতরের টানাপোড়েন নিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, দলীয় সাংগঠনিক শক্তি এবং বিপুল কর্মী-সমর্থকের ওপর ভর করে বিএনপি প্রার্থী নজরুল ইসলাম মোল্লা মাঠে জোরালো গণসংযোগ চালাচ্ছেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর বিএনপির ভোটব্যাংক আরও সংহত হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।


তবে একই সঙ্গে দলের ভেতরে চাপা ক্ষোভ ও বিভাজনের কথাও উঠে আসছে। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, অতীতে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর দমন-নিপীড়নে যুক্ত ব্যক্তিরা এখন ধানের শীষের পক্ষে সক্রিয় হয়ে উঠছেন। স্থানীয় ত্যাগী নেতাদের অভিযোগ, যারা একসময় দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, তারাই এখন নিজেদের বড় নেতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে—যা মাঠপর্যায়ে অস্বস্তি ও চাপ তৈরি করছে।


এ ছাড়া অতীতে বিএনপির নাম ব্যবহার করে কিছু গোষ্ঠীর অপকর্মের স্মৃতিও ভোটারদের মধ্যে আলোচিত হচ্ছে। নজরুল মোল্লার সম্ভাবনা বাড়ায় ওই গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।


ইসলামী আন্দোলনের হিসাব অনুযায়ী এবং অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাহমুদুল হোসাইন অলি উল্লাহ শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ধর্মভিত্তিক ভোটব্যাংক, শৃঙ্খলাবদ্ধ সংগঠন কাঠামো এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তার প্রচারণাকে জোরালো করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিনি যদি গ্রামীণ ও উপকূলীয় এলাকায় ভোট ধরে রাখতে পারেন, তাহলে ফলাফলের সমীকরণ নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে পারে।


অন্যান্য প্রার্থী ও ভোট ভাগাভাগি বিষয়ে খেলাফত মজলিসের মো. জাহাঙ্গীর হোসাইন এবং জাতীয় পার্টির মো. জামাল হোসাইন নিজ নিজ ভোটভিত্তি ধরে রাখতে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তারা প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী না হলেও ভোট ভাগাভাগিতে প্রভাব ফেলতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।


ভোটারদের আলোচনায় উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নদীভাঙন রোধ প্রধান ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব বিষয়ে বিএনপির প্রার্থী তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকলেও তালতলী উপজেলা শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত ফল নির্ধারণে ‘চাবিকাঠি’ হয়ে উঠতে পারে।


নীরব আওয়ামী ভোট ও গণভোটের প্রভাব নির্বাচনী মাঠে এক প্রার্থীর ব্যাজ লাগিয়ে অন্য প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। তবে সবচেয়ে অনিশ্চিত ও গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে দেখা হচ্ছে নীরব আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট। প্রকাশ্যে তারা সক্রিয় না হলেও শেষ মুহূর্তে তাদের ভোট প্রয়োগ ফলাফল পাল্টে দিতে পারে।


এ ছাড়া সরকারের আয়োজিত “হ্যাঁ ভোট” ও “না ভোট” সংক্রান্ত গণভোট নিয়েও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। এই বিষয়টি শেষ পর্যন্ত ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


বরগুনা-১ আসনের মোট ভোটার ৫ লাখ ১৯ হাজার ৪৬০ জন। পুরুষ ভোটার: ২,৫৯,০৯৮ জন, নারী ভোটার: ২,৬০,৩৫১ জন, তৃতীয় লিঙ্গ: ১১ জন, এ আসনে পুরুষ ভোটারের তুলনায় নারী ভোটার ১,২৫৩ জন বেশি।


বরগুনা-১ আসনের নির্বাচন কেবল দলীয় শক্তির লড়াই নয়; এটি ত্যাগী বনাম সুবিধাবাদী, প্রকাশ্য বনাম নীরব ভোট এবং তালতলী বনাম অন্যান্য উপজেলার ভোটের জটিল সমীকরণ। সব মিলিয়ে এই আসনের নির্বাচন হতে যাচ্ছে উত্তেজনাপূর্ণ, নাটকীয় এবং শেষ পর্যন্ত অনিশ্চিত- যেখানে বিএনপির অভ্যন্তরীণ ফাটল, ইসলামী আন্দোলনের প্রভাব ও নীরব আওয়ামী ভোটই চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণ করবে।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬


ধানের শীষের ছায়ায় ফাটল, হাতপাখার চ্যালেঞ্জ ও নীরব আওয়ামী ভোট

প্রকাশের তারিখ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বরগুনা-১ আসনে (বরগুনা সদর, আমতলী ও তালতলী) রাজনৈতিক উত্তাপ তীব্র হচ্ছে। শহর থেকে গ্রাম, হাটবাজার থেকে উপকূলীয় চরাঞ্চল—সবখানেই প্রার্থী ও সমর্থকদের সরব উপস্থিতি চোখে পড়ছে। তবে দৃশ্যমান এই উত্তাপের আড়ালে চলছে এক জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ, যেখানে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভাজন, ইসলামী আন্দোলনের সংগঠিত শক্তি এবং নীরব আওয়ামী ভোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


প্রার্থীদের অবস্থান বরগুনা-১ আসনে এবার চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মো. নজরুল ইসলাম মোল্লা (বিএনপি)- ধানের শীষ, মো. জাহাঙ্গীর হোসাইন (খেলাফত মজলিস, ১১ দলের জোট)- দেয়াল ঘড়ি, মাহমুদুল হোসাইন অলি উল্লাহ (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ)- হাতপাখা, মো. জামাল হোসাইন (জাতীয় পার্টি–জেপি)- সাইকেল।


বিএনপির শক্তি ও ভেতরের টানাপোড়েন নিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, দলীয় সাংগঠনিক শক্তি এবং বিপুল কর্মী-সমর্থকের ওপর ভর করে বিএনপি প্রার্থী নজরুল ইসলাম মোল্লা মাঠে জোরালো গণসংযোগ চালাচ্ছেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর বিএনপির ভোটব্যাংক আরও সংহত হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।


তবে একই সঙ্গে দলের ভেতরে চাপা ক্ষোভ ও বিভাজনের কথাও উঠে আসছে। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, অতীতে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর দমন-নিপীড়নে যুক্ত ব্যক্তিরা এখন ধানের শীষের পক্ষে সক্রিয় হয়ে উঠছেন। স্থানীয় ত্যাগী নেতাদের অভিযোগ, যারা একসময় দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, তারাই এখন নিজেদের বড় নেতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে—যা মাঠপর্যায়ে অস্বস্তি ও চাপ তৈরি করছে।


এ ছাড়া অতীতে বিএনপির নাম ব্যবহার করে কিছু গোষ্ঠীর অপকর্মের স্মৃতিও ভোটারদের মধ্যে আলোচিত হচ্ছে। নজরুল মোল্লার সম্ভাবনা বাড়ায় ওই গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।


ইসলামী আন্দোলনের হিসাব অনুযায়ী এবং অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাহমুদুল হোসাইন অলি উল্লাহ শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ধর্মভিত্তিক ভোটব্যাংক, শৃঙ্খলাবদ্ধ সংগঠন কাঠামো এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তার প্রচারণাকে জোরালো করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিনি যদি গ্রামীণ ও উপকূলীয় এলাকায় ভোট ধরে রাখতে পারেন, তাহলে ফলাফলের সমীকরণ নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে পারে।


অন্যান্য প্রার্থী ও ভোট ভাগাভাগি বিষয়ে খেলাফত মজলিসের মো. জাহাঙ্গীর হোসাইন এবং জাতীয় পার্টির মো. জামাল হোসাইন নিজ নিজ ভোটভিত্তি ধরে রাখতে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তারা প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী না হলেও ভোট ভাগাভাগিতে প্রভাব ফেলতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।


ভোটারদের আলোচনায় উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নদীভাঙন রোধ প্রধান ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব বিষয়ে বিএনপির প্রার্থী তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকলেও তালতলী উপজেলা শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত ফল নির্ধারণে ‘চাবিকাঠি’ হয়ে উঠতে পারে।


নীরব আওয়ামী ভোট ও গণভোটের প্রভাব নির্বাচনী মাঠে এক প্রার্থীর ব্যাজ লাগিয়ে অন্য প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। তবে সবচেয়ে অনিশ্চিত ও গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে দেখা হচ্ছে নীরব আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট। প্রকাশ্যে তারা সক্রিয় না হলেও শেষ মুহূর্তে তাদের ভোট প্রয়োগ ফলাফল পাল্টে দিতে পারে।


এ ছাড়া সরকারের আয়োজিত “হ্যাঁ ভোট” ও “না ভোট” সংক্রান্ত গণভোট নিয়েও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। এই বিষয়টি শেষ পর্যন্ত ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


বরগুনা-১ আসনের মোট ভোটার ৫ লাখ ১৯ হাজার ৪৬০ জন। পুরুষ ভোটার: ২,৫৯,০৯৮ জন, নারী ভোটার: ২,৬০,৩৫১ জন, তৃতীয় লিঙ্গ: ১১ জন, এ আসনে পুরুষ ভোটারের তুলনায় নারী ভোটার ১,২৫৩ জন বেশি।


বরগুনা-১ আসনের নির্বাচন কেবল দলীয় শক্তির লড়াই নয়; এটি ত্যাগী বনাম সুবিধাবাদী, প্রকাশ্য বনাম নীরব ভোট এবং তালতলী বনাম অন্যান্য উপজেলার ভোটের জটিল সমীকরণ। সব মিলিয়ে এই আসনের নির্বাচন হতে যাচ্ছে উত্তেজনাপূর্ণ, নাটকীয় এবং শেষ পর্যন্ত অনিশ্চিত- যেখানে বিএনপির অভ্যন্তরীণ ফাটল, ইসলামী আন্দোলনের প্রভাব ও নীরব আওয়ামী ভোটই চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণ করবে।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০২৪১০৯১৭৩০
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: 01711-070054

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ