ট্রাম্পকে নিয়ে আলোচনা এখন বিশ্বজুড়ে তুঙ্গে। সপ্তাহজুড়েই সংবাদমাধ্যম ও জনআলোচনার কেন্দ্রে তিনি। সাম্প্রতিক এক খবরে অনেকেই চমকে উঠেছেন। নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছেন, তাঁর কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে তাঁর ‘নিজস্ব নৈতিকতা’ দিয়ে। তাঁর ভাষায়, “আমার আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজন নেই। আমি মানুষের ক্ষতি করতে চাই না।”
এই বক্তব্য নতুন নয়, বরং ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। নিউইয়র্কেরই এক ঘটনা। সময়টা ১৯৩১ সালের ৭ মে। এক মার্কিন লেখকের বইয়ের শুরুতেই এসেছে সেই কাহিনি। একটি ভবন ঘিরে রেখেছিল কয়েকশ পুলিশ। ভেতরে অবস্থান করছিল ‘টু-গান ক্রোলি’—সব সময় দুইটি বন্দুক বহন করতেন বলে এই নাম। তাকে গ্রেপ্তারের পর তার ঘর থেকে একটি চিঠি উদ্ধার হয়, যেখানে লেখা ছিল— “আমার কোটের নিচে রয়েছে এক ক্লান্ত, অথচ দয়ালু হৃদয়; যে হৃদয় কারও ক্ষতি করে না।” অথচ গ্রেপ্তারের কিছু আগে লাইসেন্স দেখতে চাওয়ায় এক পুলিশ সদস্যকে গুলি করে হত্যা করেছিলেন এই ক্রোলি। যে মানুষ এমন হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে, সে-ই নিজেকে দয়ালু দাবি করেছিল।
প্রায় একশ বছর পর সেই একই দেশে এক প্রেসিডেন্ট বলছেন, “আমি কারও ক্ষতি করতে চাই না।” ক্ষমতার আসনে বসে নিজের স্বার্থে নিজস্ব নীতি-নৈতিকতা তৈরি করার ইতিহাস তাই নতুন নয়।
ক্ষমতার অপব্যবহারের নজির ছড়িয়ে আছে ইতিহাস, পুরাণ ও সাহিত্যে। দুই হাজার বছর আগের মনুসংহিতার সপ্তম অধ্যায়ে বলা হয়েছে— কর দিতে অক্ষম খেটে খাওয়া মানুষদের মাসে একদিন বিনা মজুরিতে রাজার কাজ করতে হবে। রাজ্যের কোনো ক্ষতি না হলেও এই জবরদস্তি চালু ছিল। অথচ আমাদের সংবিধানের ৩৪ অনুচ্ছেদে সব ধরনের জবরদস্তি শ্রম নিষিদ্ধ।
পুরাণে দেখি লক্ষ্মণরেখা অতিক্রম করায় সীতার অপহরণ। গ্রিক পুরাণে টাইটান যুদ্ধে সাহায্য করা প্রমিথিউসকেই জিউস কঠোর শাস্তি দিয়েছিলেন। ইতিহাস, লোককথা, রূপকথা—সব জায়গায় একই চিত্র: ক্ষমতাবানরা যতটুকু নিরাপদ মনে করে, ততটুকুই ক্ষমতার অপব্যবহার করে।
আমাদের সময়েও এর ব্যতিক্রম নেই। সংঘবদ্ধভাবে অন্যায় বাস্তবায়ন, এমনকি কবর থেকে লাশ তুলে ‘ক্ষমতাবানদের’ হাতে পুড়িয়ে ফেলার মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটেছে। এসব কাজের পেছনেও ছিল সেই তথাকথিত ‘নৈতিকতা’র দোহাই।
নিজেদের চারপাশে তাকালেই দেখা যাবে, আমরাও কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করছি—কথায়, আচরণে কিংবা কাজে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এফ রহমান হলের সামনে এক রাতের ঘটনা। রাত দেড়টার দিকে এক রিকশাচালক কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। এক যাত্রী ঘণ্টাখানেক ঘুরে ভাড়া দেওয়ার কথা বলে নেমে আর ফিরে আসেননি। সেই রিকশাচালক অবাক হয়ে প্রশ্ন করছিলেন—মানুষ কীভাবে এভাবে রক্ত-পানি করা টাকা মেরে দিতে পারে?
আজ আমরা অবাক হচ্ছি ট্রাম্প কীভাবে এমন সিদ্ধান্ত নেন। গ্রামের মানুষ অবাক হয়—সরকারি চাকরিজীবী বেতন পাওয়ার পরও কীভাবে ঘুষ নেয়। শিশু কাজের মেয়ে অবাক হয়—গৃহকর্ত্রী কীভাবে তার কোমল শরীরে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা দেয়। সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে নিজের ক্ষমতার সর্বোচ্চ অপব্যবহার করেছে।
ট্রাম্পও তাই করেছেন। তাঁর ক্ষমতার পরিসরে তিনি অপব্যবহার করেছেন। তিনি জানেন, কিছু করলে কেউ তাঁকে থামাতে পারবে না। পৃথিবীর অন্য রাষ্ট্রপ্রধানদের যদি সেই ক্ষমতা থাকত, তারা কি ভিন্ন কিছু করতেন—এই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের দেশেও চর দখল, জমি দখল, ভোটকেন্দ্র দখল, অবৈধ ক্ষমতা দখল—সবই ঘটে প্রত্যেকের ‘ধারণাগত সীমা’ অনুযায়ী। আমরা সবাই যেন চশমা ব্যবহার করি, কিন্তু আয়নায় তাকাই না। সমস্যাটা এখানেই।
সক্ষমতার সঙ্গে আপস করে আমরা চেতন বা অবচেতনভাবে নিজেদের নীতিহীন রাজত্বে একেকজন ‘ট্রাম্প’ হয়ে উঠি। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। দরকার আইনের যথাযথ প্রয়োগ। দরকার আত্মশুদ্ধি।
- মুহাম্মদ আবু সাঈদ
সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ জানুয়ারি ২০২৬
ট্রাম্পকে নিয়ে আলোচনা এখন বিশ্বজুড়ে তুঙ্গে। সপ্তাহজুড়েই সংবাদমাধ্যম ও জনআলোচনার কেন্দ্রে তিনি। সাম্প্রতিক এক খবরে অনেকেই চমকে উঠেছেন। নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছেন, তাঁর কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে তাঁর ‘নিজস্ব নৈতিকতা’ দিয়ে। তাঁর ভাষায়, “আমার আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজন নেই। আমি মানুষের ক্ষতি করতে চাই না।”
এই বক্তব্য নতুন নয়, বরং ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। নিউইয়র্কেরই এক ঘটনা। সময়টা ১৯৩১ সালের ৭ মে। এক মার্কিন লেখকের বইয়ের শুরুতেই এসেছে সেই কাহিনি। একটি ভবন ঘিরে রেখেছিল কয়েকশ পুলিশ। ভেতরে অবস্থান করছিল ‘টু-গান ক্রোলি’—সব সময় দুইটি বন্দুক বহন করতেন বলে এই নাম। তাকে গ্রেপ্তারের পর তার ঘর থেকে একটি চিঠি উদ্ধার হয়, যেখানে লেখা ছিল— “আমার কোটের নিচে রয়েছে এক ক্লান্ত, অথচ দয়ালু হৃদয়; যে হৃদয় কারও ক্ষতি করে না।” অথচ গ্রেপ্তারের কিছু আগে লাইসেন্স দেখতে চাওয়ায় এক পুলিশ সদস্যকে গুলি করে হত্যা করেছিলেন এই ক্রোলি। যে মানুষ এমন হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে, সে-ই নিজেকে দয়ালু দাবি করেছিল।
প্রায় একশ বছর পর সেই একই দেশে এক প্রেসিডেন্ট বলছেন, “আমি কারও ক্ষতি করতে চাই না।” ক্ষমতার আসনে বসে নিজের স্বার্থে নিজস্ব নীতি-নৈতিকতা তৈরি করার ইতিহাস তাই নতুন নয়।
ক্ষমতার অপব্যবহারের নজির ছড়িয়ে আছে ইতিহাস, পুরাণ ও সাহিত্যে। দুই হাজার বছর আগের মনুসংহিতার সপ্তম অধ্যায়ে বলা হয়েছে— কর দিতে অক্ষম খেটে খাওয়া মানুষদের মাসে একদিন বিনা মজুরিতে রাজার কাজ করতে হবে। রাজ্যের কোনো ক্ষতি না হলেও এই জবরদস্তি চালু ছিল। অথচ আমাদের সংবিধানের ৩৪ অনুচ্ছেদে সব ধরনের জবরদস্তি শ্রম নিষিদ্ধ।
পুরাণে দেখি লক্ষ্মণরেখা অতিক্রম করায় সীতার অপহরণ। গ্রিক পুরাণে টাইটান যুদ্ধে সাহায্য করা প্রমিথিউসকেই জিউস কঠোর শাস্তি দিয়েছিলেন। ইতিহাস, লোককথা, রূপকথা—সব জায়গায় একই চিত্র: ক্ষমতাবানরা যতটুকু নিরাপদ মনে করে, ততটুকুই ক্ষমতার অপব্যবহার করে।
আমাদের সময়েও এর ব্যতিক্রম নেই। সংঘবদ্ধভাবে অন্যায় বাস্তবায়ন, এমনকি কবর থেকে লাশ তুলে ‘ক্ষমতাবানদের’ হাতে পুড়িয়ে ফেলার মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটেছে। এসব কাজের পেছনেও ছিল সেই তথাকথিত ‘নৈতিকতা’র দোহাই।
নিজেদের চারপাশে তাকালেই দেখা যাবে, আমরাও কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করছি—কথায়, আচরণে কিংবা কাজে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এফ রহমান হলের সামনে এক রাতের ঘটনা। রাত দেড়টার দিকে এক রিকশাচালক কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। এক যাত্রী ঘণ্টাখানেক ঘুরে ভাড়া দেওয়ার কথা বলে নেমে আর ফিরে আসেননি। সেই রিকশাচালক অবাক হয়ে প্রশ্ন করছিলেন—মানুষ কীভাবে এভাবে রক্ত-পানি করা টাকা মেরে দিতে পারে?
আজ আমরা অবাক হচ্ছি ট্রাম্প কীভাবে এমন সিদ্ধান্ত নেন। গ্রামের মানুষ অবাক হয়—সরকারি চাকরিজীবী বেতন পাওয়ার পরও কীভাবে ঘুষ নেয়। শিশু কাজের মেয়ে অবাক হয়—গৃহকর্ত্রী কীভাবে তার কোমল শরীরে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা দেয়। সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে নিজের ক্ষমতার সর্বোচ্চ অপব্যবহার করেছে।
ট্রাম্পও তাই করেছেন। তাঁর ক্ষমতার পরিসরে তিনি অপব্যবহার করেছেন। তিনি জানেন, কিছু করলে কেউ তাঁকে থামাতে পারবে না। পৃথিবীর অন্য রাষ্ট্রপ্রধানদের যদি সেই ক্ষমতা থাকত, তারা কি ভিন্ন কিছু করতেন—এই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের দেশেও চর দখল, জমি দখল, ভোটকেন্দ্র দখল, অবৈধ ক্ষমতা দখল—সবই ঘটে প্রত্যেকের ‘ধারণাগত সীমা’ অনুযায়ী। আমরা সবাই যেন চশমা ব্যবহার করি, কিন্তু আয়নায় তাকাই না। সমস্যাটা এখানেই।
সক্ষমতার সঙ্গে আপস করে আমরা চেতন বা অবচেতনভাবে নিজেদের নীতিহীন রাজত্বে একেকজন ‘ট্রাম্প’ হয়ে উঠি। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। দরকার আইনের যথাযথ প্রয়োগ। দরকার আত্মশুদ্ধি।
- মুহাম্মদ আবু সাঈদ
সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার মতামত লিখুন