ক্ষুদ্র ঋণের কিস্তি আর চড়া সুদের নির্মম চাপে পিষ্ট হয়ে অবশেষে মৃত্যুর অন্ধকার গলিকেই বেছে নিলেন হনুফা বেগম (৪৫) নামের এক গৃহবধূ। রোববার (২৩ অগাস্ট ) সকালে কিশোরগঞ্জের শিল্প ও বন্দরনগরী ভৈরব পৌরসভার ভৈরবপুর উত্তরপাড়া এলাকায় এই মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে। বসতঘরের সিলিং ফ্যানের সাথে গামছা পেঁচিয়ে নিজ জীবনাবসান ঘটান তিনি। নিহত হনুফা বেগম ওই এলাকার রিকশা গ্যারেজ মেকার আক্রাম হোসেনের স্ত্রী।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, দিনমজুর স্বামী আক্রাম হোসেনের স্বল্প আয় দিয়ে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানোই যেখানে কঠিন ছিল, সেখানে পরিবারের অভাব-অনটন দূর করতে ও সংসারের চাকা সচল রাখতে হনুফা বেগম একাধিক এনজিও ও স্থানীয় দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নেন। কিন্তু প্রতিনিয়ত নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি আর আয়-ব্যয়ের অসঙ্গতির কারণে প্রতি সপ্তাহে এবং মাসে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা তার জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।ঘটনার আগের দিনগুলোতে কিস্তি আদায়কারীদের ক্রমাগত চাপ, অপমান ও লোকলজ্জার ভয়ে মানসিকভাবে একবারে ভেঙে পড়েছিলেন হনুফা বেগম। রোববার সকালে পরিবারের অন্য সদস্যরা ঘরের বাইরে থাকলে মানসিক যন্ত্রণা সইতে না পেরে নিজ কক্ষে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন তিনি। অনেকক্ষণ কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে স্বজনরা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন এবং সিলিং ফ্যানের সাথে তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান।
সংবাদ পেয়ে ভৈরব থানা পুলিশের একটি টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এই বিষয়ে ভৈরব থানার পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) হাফিজুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, পুলিশ খবর পেয়ে ভৈরবপুর উত্তরপাড়া এলাকার বসতবাড়ির একটি বন্ধ কক্ষ থেকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গামছা পেঁচানো অবস্থায় হনুফা বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে। পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কিশোরগঞ্জ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে প্রেরণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। প্রাথমিক তদন্তে ঋণের কিস্তির চাপেই এই আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবে ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন ও তদন্তের পর প্রকৃত কারণ পুরোপুরি স্পষ্ট হবে।
ঘটনার পর থেকে ভৈরবপুর উত্তরপাড়া এলাকায় নেমে এসেছে এক বিষাদময় নীরবতা। স্ত্রী হারিয়ে দিশেহারা স্বামী আক্রাম হোসেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, "সংসার চালানোর জন্যই ঋণ নিতে হয়েছিল। কিন্তু ঋণের সুদের বোঝা যে আমার স্ত্রীর প্রাণ কেড়ে নেবে, তা কখনো ভাবিনি। পাওনাদারদের কথার আঘাত আর চাপ ও আর নিতে পারছিল না।" হনুফা বেগমের এমন করুণ পরিণতি পুরো এলাকাবাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। স্থানীয় প্রতিবেশীদের মতে, এনজিওর সুদের হার এবং এলাকাভিত্তিক অননুমোদিত দাদন ব্যবসার নির্মম জাঁতাকলে পড়ে আজ একের পর এক নিম্নেবিত্ত পরিবার নিঃস্ব হচ্ছে।
ভৈরবের এই ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন আত্মহত্যা নয়, বরং এটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর চড়া সুদের অনিয়ন্ত্রিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপের এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি। ক্ষুদ্র ঋণের কিস্তির চাপে পড়ে সাধারণ মানুষের আত্মাহুতির ঘটনা দেশে নতুন নয়। এনজিও ও স্থানীয় দাদন ব্যবসায়ীদের কিস্তি আদায়ের অমানবিক চাপ অনেক সময়ই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোকে চরম মানসিক ট্রমার দিকে ঠেলে দেয়।
বিশেষজ্ঞ ও সচেতন নাগরিকদের মতে, প্রান্তিক পর্যায়ে ঋণের সহজলভ্যতা থাকলেও তা পরিশোধের সঠিক আর্থিক পথ বা সুরক্ষা কৌশল না থাকায় নিঃস্ব হচ্ছে বহু পরিবার। কিস্তি আদায়ে আরো মানবিক আচরণ এবং স্থানীয় অননুমোদিত চড়া সুদের দাদন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
নিহত হনুফা বেগমের মর্মান্তিক বিদায় যেন আরো একবার আঙুল তুলে দেখিয়ে দিল—আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থসংস্থানের প্রক্রিয়ায় মানবিকতার অভাব কতটা গভীরে পৌঁছেছে। এ বিষয়ে থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ আগস্ট ২০২৬
ক্ষুদ্র ঋণের কিস্তি আর চড়া সুদের নির্মম চাপে পিষ্ট হয়ে অবশেষে মৃত্যুর অন্ধকার গলিকেই বেছে নিলেন হনুফা বেগম (৪৫) নামের এক গৃহবধূ। রোববার (২৩ অগাস্ট ) সকালে কিশোরগঞ্জের শিল্প ও বন্দরনগরী ভৈরব পৌরসভার ভৈরবপুর উত্তরপাড়া এলাকায় এই মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে। বসতঘরের সিলিং ফ্যানের সাথে গামছা পেঁচিয়ে নিজ জীবনাবসান ঘটান তিনি। নিহত হনুফা বেগম ওই এলাকার রিকশা গ্যারেজ মেকার আক্রাম হোসেনের স্ত্রী।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, দিনমজুর স্বামী আক্রাম হোসেনের স্বল্প আয় দিয়ে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানোই যেখানে কঠিন ছিল, সেখানে পরিবারের অভাব-অনটন দূর করতে ও সংসারের চাকা সচল রাখতে হনুফা বেগম একাধিক এনজিও ও স্থানীয় দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নেন। কিন্তু প্রতিনিয়ত নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি আর আয়-ব্যয়ের অসঙ্গতির কারণে প্রতি সপ্তাহে এবং মাসে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা তার জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।ঘটনার আগের দিনগুলোতে কিস্তি আদায়কারীদের ক্রমাগত চাপ, অপমান ও লোকলজ্জার ভয়ে মানসিকভাবে একবারে ভেঙে পড়েছিলেন হনুফা বেগম। রোববার সকালে পরিবারের অন্য সদস্যরা ঘরের বাইরে থাকলে মানসিক যন্ত্রণা সইতে না পেরে নিজ কক্ষে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন তিনি। অনেকক্ষণ কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে স্বজনরা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন এবং সিলিং ফ্যানের সাথে তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান।
সংবাদ পেয়ে ভৈরব থানা পুলিশের একটি টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এই বিষয়ে ভৈরব থানার পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) হাফিজুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, পুলিশ খবর পেয়ে ভৈরবপুর উত্তরপাড়া এলাকার বসতবাড়ির একটি বন্ধ কক্ষ থেকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গামছা পেঁচানো অবস্থায় হনুফা বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে। পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কিশোরগঞ্জ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে প্রেরণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। প্রাথমিক তদন্তে ঋণের কিস্তির চাপেই এই আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবে ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন ও তদন্তের পর প্রকৃত কারণ পুরোপুরি স্পষ্ট হবে।
ঘটনার পর থেকে ভৈরবপুর উত্তরপাড়া এলাকায় নেমে এসেছে এক বিষাদময় নীরবতা। স্ত্রী হারিয়ে দিশেহারা স্বামী আক্রাম হোসেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, "সংসার চালানোর জন্যই ঋণ নিতে হয়েছিল। কিন্তু ঋণের সুদের বোঝা যে আমার স্ত্রীর প্রাণ কেড়ে নেবে, তা কখনো ভাবিনি। পাওনাদারদের কথার আঘাত আর চাপ ও আর নিতে পারছিল না।" হনুফা বেগমের এমন করুণ পরিণতি পুরো এলাকাবাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। স্থানীয় প্রতিবেশীদের মতে, এনজিওর সুদের হার এবং এলাকাভিত্তিক অননুমোদিত দাদন ব্যবসার নির্মম জাঁতাকলে পড়ে আজ একের পর এক নিম্নেবিত্ত পরিবার নিঃস্ব হচ্ছে।
ভৈরবের এই ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন আত্মহত্যা নয়, বরং এটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর চড়া সুদের অনিয়ন্ত্রিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপের এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি। ক্ষুদ্র ঋণের কিস্তির চাপে পড়ে সাধারণ মানুষের আত্মাহুতির ঘটনা দেশে নতুন নয়। এনজিও ও স্থানীয় দাদন ব্যবসায়ীদের কিস্তি আদায়ের অমানবিক চাপ অনেক সময়ই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোকে চরম মানসিক ট্রমার দিকে ঠেলে দেয়।
বিশেষজ্ঞ ও সচেতন নাগরিকদের মতে, প্রান্তিক পর্যায়ে ঋণের সহজলভ্যতা থাকলেও তা পরিশোধের সঠিক আর্থিক পথ বা সুরক্ষা কৌশল না থাকায় নিঃস্ব হচ্ছে বহু পরিবার। কিস্তি আদায়ে আরো মানবিক আচরণ এবং স্থানীয় অননুমোদিত চড়া সুদের দাদন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
নিহত হনুফা বেগমের মর্মান্তিক বিদায় যেন আরো একবার আঙুল তুলে দেখিয়ে দিল—আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থসংস্থানের প্রক্রিয়ায় মানবিকতার অভাব কতটা গভীরে পৌঁছেছে। এ বিষয়ে থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

আপনার মতামত লিখুন